বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের রক্ষণশীল বৈশিষ্ট্যের বাইরে প্রথম অভিনয় করেছিলেন অলিভিয়া। নায়ক ওয়াসিমের সঙ্গে তাঁর জুটি তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। তাঁর অভিনীত শেষ চলচ্চিত্র ‘দুশমনি’। মুক্তি না পাওয়া চলচ্চিত্রের মধ্যে আছে ‘মেলট্রেন’, ‘প্রেম তুই সর্বনাশী’। ৫৩টি ছবিতে অভিনয় করে দর্শকপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা অবস্থায়ই চলচ্চিত্র ছেড়ে যাওয়া এই অভিনেত্রীর কথা তুলে ধরেছেন- আলাউদ্দীন মাজিদ
যেভাবে সুরাইয়া হলেন
অভিনেত্রী অলিভিয়া দুই যুগেরও বেশি সময় চলচ্চিত্রে নেই। ফিল্মের লোকজনের সঙ্গেও তাঁর নেই কোনো যোগাযোগ। এমনকি সংবাদকর্মীদেরও দেখা দেন না, কথাও বলেন না। খুব কাছের মানুষ ছাড়া অন্য কেউ তাঁর ছায়াও মাড়াতে পারেন না। এ যেন ওপার বাংলার কিংবদন্তি অভিনেত্রী প্রয়াত সুচিত্রা সেনের পথ ধরে হাঁটা। কিন্তু কেন? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সম্প্রতি পাওয়া গেছে একটি সূত্রের কিছু তথ্য। সূত্রটির দাবি, অলিভিয়ার বয়স হয়েছে। তাই শরীর-স্বাস্থ্য তেমন ভালো নেই। বিশেষ করে কয়েক বছর আগে তাঁর মেরুদণ্ডে একটি অস্ত্রোপচার হয়েছিল। এরপর থেকে প্রায়ই পিঠের ব্যথায় কাতর থাকেন তিনি। সূত্রটির আরও দাবি, প্রথম স্বামী চিত্রপরিচালক এস এম শফির মৃত্যুর পর চলচ্চিত্র ত্যাগ করেন অলিভিয়া। চলচ্চিত্রকার এস এম শফিকে ভালোবেসে ১৯৭২ সালে বিয়ে করেছিলেন এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। ১৯৯৫ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান শফি। এরপর শোকাহত অলিভিয়া চলচ্চিত্র জগৎ ত্যাগ করেন। পরে বিয়ে করেন ফতুল্লার মুনলাইট টেক্সটাইল মিলের কর্ণধার হাসানকে। বর্তমানে বসবাস করছেন বনানীর ডিওএইচএসের বাড়িতে। সূত্র জানায়, দ্বিতীয় বিয়ের পর মুখ্যত তিনি অনেকটা গৃহবন্দি জীবন যাপন করতে বাধ্য হন। তাঁর বর্তমান স্বামী চান না অলিভিয়া চলচ্চিত্র জগৎ, সাংবাদিক কিংবা বাইরের কোনো মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন। এ কারণে অনেকটা হতাশ অলিভিয়া বেশ কয়েকবার নাকি স্বামীর বাড়ি ছেড়ে ভাইয়ের বাড়ি চলে গিয়েছিলেন। তাঁর ভাই বুঝিয়ে-শুনিয়ে আবার তাঁকে স্বামীর ঘরে পাঠিয়ে দেন। সূত্র আরও জানায়, তাঁর দ্বিতীয় স্বামী বিয়ের পর অলিভিয়ার নাম পরিবর্তন করে রাখেন সুরাইয়া।
ববিতা ও শবনম কী বলেন?
অভিনেত্রী অলিভিয়ার ঘনিষ্ঠদের মধ্যে অন্যতম অভিনেত্রী ববিতা বলেন, ‘আমার সঙ্গে প্রায়ই দেখা হতো তাঁর। অভিনেত্রী হিসেবে যেমন, বাস্তবেও অসাধারণ ভালো মনের মানুষ অলিভিয়া।’ ববিতা বলেন, একবার অলিভিয়া বলেছিলেন, ‘ফিল্মে যোগ দিয়েছিলাম নেহাতই শখের বশে। ৫৩টির মতো ছবিতে নায়িকা হিসেবে অভিনয় করেছি। ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম চিত্রপরিচালক এস এম শফিকে। যদিও আমাদের সন্তানাদি ছিল না, তবু সুখী হতে পেরেছিলাম। স্বামীর মৃত্যুতে ভেঙে পড়ি। সেই শোকে একদিন চলচ্চিত্র জগৎ ছেড়ে দিলাম...।’ ববিতা বলেন, ‘আমি ঢাকার বনানীর একটি পারলারে যেতাম। সেখানেই বছর তিন-চারেক আগে তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। এখন পর্যন্ত ওটাই শেষ দেখা। আমাকে দেখে সালাম করেছিলেন। জড়িয়ে ধরেছিলেন। কিছু সময় কথা হয়। কিন্তু কোথায় থাকেন, সে বিষয়ে কিছুই জানতে চাইনি। ব্যক্তিগত বিষয়ে তিনিও কথা বলতে চাননি। আমার যত দূর মনে পড়ে, শফি ভাইয়ের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর নিজেকে পুরোপুরি গুটিয়ে নেন। সবার থেকে আলাদা হয়ে যান।’ কয়েক বছর আগে ঢাকার বারিধারার একটি পার্কে হঠাৎ অলিভিয়ার সঙ্গে দেখা হয় বরেণ্য অভিনয় শিল্পী শবনমের। সেই অভিজ্ঞতা এভাবেই বর্ণনা করলেন তিনি, ‘কয়েক বছর আগে আমার সঙ্গে রাজধানীর বারিধারা পার্কে দেখা হয়েছিল। তখন কথা হয়। যখন অলিভিয়ার সঙ্গে দেখা হয়েছিল, তখন পার্কে হাঁটতে এসেছিলেন। তারপর থেকে তাঁর দেখা আর পাইনি কোনো দিন।’
যেভাবে চলচ্চিত্রে
খ্রিস্টান মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে অলিভিয়া গোমেজের জন্ম ১৯৫৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি করাচিতে। মা-বাবার আদি নিবাস ভারতের গোয়ায়। ছোটবেলায় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে লেখাপড়া করেন। ১৪ বছর বয়সে মডেলিং শুরু করেন। অলিভিয়া পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় এসে হোটেল পূর্বাণীতে রিসিপশনিস্ট পদে চাকরি করেন কিছুদিন। চাকরিরত অবস্থায় কয়েকটি বিজ্ঞাপনে কাজ করেন। ১৩-১৪ বছর বয়স থেকে মডেলিং করা শুরু করেন। একটা চাকরি প্রয়োজন ছিল বলেই পূর্বাণী হোটেলের রিসিপশনিস্ট হয়েছিলেন। হোটেল পূর্বাণীতে একবার প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এস এম শফি এলেন। তিনি অলিভিয়াকে দেখে বললেন, ‘ফিল্মে অভিনয় করবে নাকি’। কথাটা শুনে অলিভিয়া ভাবলেন, এত দিনের চাওয়া-পাওয়া তাহলে এবার পূর্ণ হবে। ১৯৭২ সালে শুরু হলো অলিভিয়াকে নিয়ে শফির ‘ছন্দ হারিয়ে গেল’ ছবির কাজ। এরপর টাকার খেলা, মাসুদ রানা, সেয়ানা, দি রেইন, বাহাদুর ছবিতে অভিনয় করলেন।
ছবিগুলো নির্মিত হয় ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৬ সালের মধ্যে। তখন অলিভিয়ার অসম্ভব খ্যাতি। যখন যেখানে গেছেন সেখানেই জনতার ভিড় উপচে পড়ত। ‘ছন্দ হারিয়ে গেল’ ছবিতে অভিনয়ের আগে প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ এবং বেবী ইসলামের ‘সংগীতা’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করার কথা ছিল তাঁর। ৫৩টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন এই জননন্দিত অভিনেত্রী। ১৯৭৬ সালে মুক্তি পাওয়া এই জুটির ‘দি রেইন’ ছবিটি দেশে-বিদেশে ব্যাপক সাড়া জাগায়। অলিভিয়ার স্বামী এস এম শফি তাঁর গ্ল্যামার এবং যৌন আবেদনকে ব্যবহার করতে কার্পণ্য করেননি। তবে অলিভিয়া শক্তিশালী অভিনয়ের পরিচয় দেন ‘যাদুর বাঁশী’ ছবিতে। ‘টাকার খেলা’, ‘বাহাদুর’ ও ‘দি রেইন’ ছবি তিনটি করার পর অলিভিয়া ঢাকা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে আবেদনময়ী নায়িকা হিসেবে পরিচিতি পেলেন। ‘বাহাদুর’ ছবিতে অলিভিয়া এতটা খোলামেলা হলেন, তাঁকে অনেক কটুকথা শুনতে হয়েছে। ১৯৭৬ সালে ‘দি রেইন’ ছবিতে অভিনয় করে অসম্ভব খ্যাতি পেলেন তিনি। চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল অলিভিয়া নামটি।
কলকাতায় উত্তম কুমারের বিপরীতে
অলিভিয়া কলকাতার ছবিতে অভিনয় করার সৌভাগ্য অর্জন করেন। ছবির নাম ‘বহ্নিশিখা’। ছবিটির নায়ক ছিলেন উত্তম কুমার। ১৯৭৬ সালের সিনেমা ‘বহ্নিশিখা’। নীহার রঞ্জন গুপ্তের গল্প অবলম্বনে নির্মিত সিনেমায় উত্তম কুমারের সঙ্গে ছিলেন সুপ্রিয়া দেবী ও রঞ্জিত মল্লিক। সিনেমায় উত্তম কুমারের নায়িকা ছিলেন অলিভিয়া।