বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় নদনদীতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নৌকায় ভেসে জীবন কাটাচ্ছে মান্তা সম্প্রদায়। নৌকাতেই জন্মাচ্ছে এ সম্প্রদায়ের শিশু, সেখানেই বেড়ে উঠছে, একসময় নৌকাতেই ঘটছে জীবনের সমাপ্তি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙন বেড়ে যাওয়ায় প্রতি বছর হাজারো পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়ে যোগ হচ্ছে এই ভাসমান জীবনে। স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় এ মানুষগুলো রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সুযোগসুবিধা থেকেও বঞ্চিত। নেই শিক্ষার আলো, নেই প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থাটুকুও।
মান্তা শব্দটি বার্মিজ মান্তাং থেকে এসেছে। মিয়ানমারে এই নামে নদীতে বাস করা একটি উপজাতি গোষ্ঠী রয়েছে। তবে বাংলাদেশের মান্তারা সেই সম্প্রদায়ের নয় বলে দাবি তাদের। তারা বলছেন, একসময় তাদের পূর্বপুরুষেরও ভিটেমাটি ছিল। নদী ভাঙনের কারণে তারা বাস্তুভিটা হারিয়ে আজ নদীতে আশ্রয় নিয়েছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম নদীতে বসবাস করায় লোকমুখে মান্তা হিসেবে তাদের পরিচয় প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। বরিশাল-পটুয়াখালীর বিভিন্ন নদনদীতে এ সম্প্রদায়ের দেখা মেলে। এসব নদীতে ২০-৫০টি পরিবার একত্রে নৌকায় ভেসে ভেসে কাটিয়ে দিচ্ছে জীবন। বরিশালের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেন এ সম্প্রদায়ের লোকেরা। প্রতিটা দলে একজন করে সরদার আছেন, যিনি ওই দলের নেতৃত্ব দেন। সব পরিবারের ভালোমন্দ দেখভাল করেন।
সম্প্রতি বরিশালে দেখা মেলে নদীতে ভাসমান এমন একটি মান্তা গ্রামের। নৌকার ভিতরেই থালা-বাসন, চুলা, হাঁস-মুরগি, কাঁথা-বালিশ। সেখানকার দলপতি মো. জসিম সরদার জানান, ১৭৮টি পরিবারের নেতৃত্ব ও ভালো-মন্দ দেখভাল করেন তিনি। তাদের লোকসংখ্যা প্রায় ৬০০। তিনি বলেন, আমাদের নৌকাতেই জন্ম, নৌকাতেই মৃত্যু। এই সম্প্রদায়ের ৯০ ভাগ লোকই নৌকায় বসবাস করে। কারও কোনো জমিজমা নেই। ১০ ভাগ লোক নৌকা থেকে স্থলে গিয়ে বিভিন্ন কাজ করে খায়। আমাদের থাকা, খাওয়া, ঘুম সবই নদীর ভিতরে। স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় তাদের নেই জাতীয় পরিচয়পত্র। মৃত্যু হলে কবর দেওয়ার জন্য সাড়ে তিন হাত জায়গা চেয়ে নিতে হয়।
একসময় কৃষি ও মাছ ধরে জীবিকানির্বাহ করত মান্তা সম্প্রদায়। নদী তীরবর্তী এলাকায় ছিল তাদের বসতভিটা। নদী ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে ক্রমেই তাদের বসতি হতে শুরু করে নৌকায়। বিভিন্ন জরিপের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে এই সম্প্রদায়ের অন্তত ৩ লাখ মানুষ পার করছে ভাসমান জীবন। নদীতেই হচ্ছে সন্তানের বিয়েশাদি। সেখানেই জন্ম নিচ্ছে নতুন প্রজন্ম। অশিক্ষা নিয়ে বেড়ে উঠছে শিশু। বড় হয়ে বাবা-মায়ের উত্তরাধিকার হিসেবে মাছ ধরা পেশাকে বেছে নিচ্ছে।
সেন্টার ফর ক্লাইমেট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিস (সিইজিআইএস) ঈঊএওঝ-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৩ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে যমুনা, গঙ্গা ও পদ্মা নদীর ভাঙনে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর ভূমি নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমি নদী আত্মসাৎ করে। জেনেভাভিত্তিক একটি সংস্থার হিসাবে ২০২৩ সালে বিশ্বে ২ কোটি ৬০ লাখ মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তার মধ্যে ১৮ লাখই বাংলাদেশে। বাস্তুচ্যুতির অন্যতম কারণ নদী ভাঙন। জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে ভারী বৃষ্টিপাত, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস। এতে বাড়ছে নদীভাঙন। আবার প্রতিবেশী দেশ ভারত উজানে আন্তসীমান্ত নদীতে একাধিক বাঁধ দিয়ে পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করার কারণেও বাংলাদেশে নদীভাঙন বাড়ছে। বর্ষায় হঠাৎ বাঁধ খুলে দেওয়ায় তলিয়ে যাচ্ছে পুরো দেশ। এসব কারণে উদ্বাস্তু হচ্ছে অসংখ্য পরিবার। সরকারি-বেসরকারি তথ্যানুযায়ী, বছরে প্রায় ২৫ হাজার মানুষের বাস্তুচ্যুতি ঘটছে প্রাকৃতিক দুর্যোগে। এসব মানুষের একটা অংশের স্থান হয় বিভিন্ন শহরের বস্তিতে। অনেকের ঠাঁই হয় নৌকায়।
নদীভাঙনের কবলে পড়ে দীর্ঘদিন ধরেই মান্তা সম্প্রদায় সম্পূর্ণ ভূমিহীন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাদের এই শেকড়হীন জীবনে কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে স্থায়ী ঠিকানার ব্যবস্থা করেনি। বাংলাদেশের নাগরিক হলেও নেই পরিচয়পত্র। ২০২২ সালে কিছু মান্তা পরিবারকে আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে স্থায়ী ঠিকানা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হলেও সেই উদ্যোগ আর বেশিদূর এগোয়নি।
মমতাজ বেগমের পরিবার ২০ বছরের বেশি সময় ধরে নৌকায় বসবাস করছেন। বৈঠা টানতে টানতে মমতাজ বেগম এখন দক্ষ মাঝি। তিনি জানান, ঢেউয়ে নৌকা যখন দোল খায়, তখন আর ঘুম আসে না। ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোন এলে সবচেয়ে বিপদে থাকতে হয়। তখন আশ্রয় কেন্দ্রে গিয়ে আশ্রয় নিলেও অনেক নৌকা ভেঙে যায়। হারিয়ে যায়। সহায়-সম্বল শেষ হয়ে যায়।
জসিম সরদার আফসোস করে বলেন, মাছ ধরাই তাদের একমাত্র পেশা। অন্য কাজ জানা নেই। কিন্তু নদীতে আর আগের মতো মাছ নেই। পুরো পরিবার নিয়ে ১২-১৩ ঘণ্টা মাছ ধরে কোনোদিন এক দেড় হাজার টাকা হয়, কোনোদিন হয় ২০০-৩০০। কোনোদিন হয় না। খেয়ে না খেয়ে দিন পার হচ্ছে। অন্য কাজের অভিজ্ঞতা নেই। যদি কারও অভিজ্ঞতা থাকে, তবুও ঠিকানা না থাকায় কেউ কাজে নেয় না। এই সম্প্রদায়ের শিশুরাও শিক্ষার বাইরে। তারা বাবা-মার সঙ্গে সারা দিন মাছ ধরে কাটায়।
এদিকে, শিক্ষার আলো থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত মান্তা সম্প্রদায়ের শিশুরা। কখনো কখনো স্থানীয় এনজিওগুলো বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও তা স্থায়ী হয়নি। পটুয়াখালীর চরে একটি ভাসমান স্কুল চালু হলেও চার বছরের মাথায় ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে হঠাৎ তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। সরকারিভাবেও নেই কোনো উদ্যোগ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশ যখন এলডিসি উত্তরণের কথা ভাবছে, তখন মান্তা সম্প্রদায় যেন প্রদীপের নিচে অন্ধকার হিসেবে রয়ে গেছে। বাংলাদেশে নদীভাঙনের কারণে প্রতিবছর প্রায় ২৫ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ সংকট আরও বাড়ছে। মান্তা সম্প্রদায়ের মতো নদীভিত্তিক জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। তারা বলছেন, বাংলাদেশের নদীমাতৃক জীবনের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি মান্তা সম্প্রদায়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ও নদীভাঙনের কারণে তারা আজ টিকে থাকার লড়াইয়ে হিমশিম খাচ্ছে। সঠিক নীতি ও সরকারি উদ্যোগের মাধ্যমেই কেবল এই ভাসমান মানুষদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।