Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৪ মে, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৩ মে, ২০১৯ ২৩:৩১

চিকিৎসা নিতে রোগীর ঢল বিদেশে

রেকর্ড সংখ্যক যাচ্ছেন ভারতে, এরপর সিঙ্গাপুর-ব্যাংকক

নিজস্ব প্রতিবেদক

চিকিৎসা নিতে রোগীর ঢল বিদেশে

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রোগে আক্রান্ত মানুষ চিকিৎসা নিতে পাড়ি জমাচ্ছেন বিদেশে। প্রতি বছর রেকর্ড পরিমাণ রোগী যাচ্ছেন ভারতে। এর কারণ হিসেবে বাংলাদেশে চিকিৎসাসেবার অপ্রতুলতা, ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতার অভাব এবং আস্থাহীনতাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। উচ্চবিত্তরা সিঙ্গাপুর, ব্যাংককে আর মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্তরা যাচ্ছেন ভারতে। প্রতি বছর প্রায় তিন  লাখ রোগী বিভিন্ন দেশে সেবা গ্রহণ করায় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশ। প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে বাংলাদেশের চিকিৎসাসেবা খাত। এর মধ্যে প্রায় দুই লাখ রোগী চিকিৎসা নিয়ে থাকেন ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের স্বনামধন্য হাসপাতালগুলোতে। মেডিকেল ট্যুরিজমের বাজার সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা করেছে ভারতের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এফআইসিসিআই)। ২০১৫ সালের তথ্যের ভিত্তিতে তারা দেখিয়েছে, প্রতি বছর তিন লাখের বেশি বাংলাদেশি চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন। এদের বেশির ভাগেরই গন্তব্য ভারত। পাশাপাশি থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায়ও যাচ্ছেন অনেকে। মালয়েশিয়ায় প্রতি বছর চিকিৎসা নিতে যাওয়া বাংলাদেশির সংখ্যা ২৫-৩০ হাজার। এরা যাচ্ছেন মূলত ক্যান্সার, চোখ, দাঁত, কিডনি প্রতিস্থাপন, হৃদরোগ ও কসমেটিক সার্জারির জন্য। ভারতে যাওয়া বাংলাদেশির সংখ্যা দুই লাখের কাছাকাছি। দেশটির ডিরেক্টরেট জেনারেল অব কমার্শিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিকসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরেই চিকিৎসার জন্য ভারতে পাড়ি জমান ১ লাখ ৬৫ হাজার বাংলাদেশি। মেডিকেল ট্যুরিজম থেকে ভারতের আয়ের প্রায় অর্ধেক জোগান দিচ্ছেন বাংলাদেশিরা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাংলাদেশি রোগীরা ভারতে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ব্যয় করেছেন ৩৪ কোটি ৩৫ লাখ ডলার।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ভারতে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীদের মধ্যে কলকাতা, চেন্নাই, দিল্লি, মুম্বাই এবং ব্যাঙ্গালুরুর বিভিন্ন হাসপাতালে অধিকাংশ রোগী সেবা নিয়ে থাকেন। বাংলাদেশ থেকে চেন্নাই ও কলকাতায় বাংলাদেশি রোগীদের জন্য রয়েছে আলাদা আবাসিক হোটেল, লজ, রেস্তোরাঁ। অনেক সময় চিকিৎসার প্রয়োজনে মাসের পর মাস থাকতে হয় সেখানে। মেডিকেল ট্যুরিজমকে আকর্ষণীয় করে তুলতে বসবাস, রান্নার প্রয়োজনীয় উপকরণসহ ভাড়া দেওয়া হচ্ছে বাসা। রোগীদের সুবিধার্থে গড়ে উঠেছে প্যাথলজি। ভারতের পরেই চিকিৎসা নিতে ব্যাংকক ও সিঙ্গাপুরে পাড়ি জমাচ্ছে মানুষ। ইদানীং মালয়েশিয়া এবং চীনেও যাচ্ছেন অনেকে। ব্যাংককের বামরুন গ্রাদ হাসপাতাল, সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ ও ন্যাশনাল ইউনিভারসিটি হাসপাতালে বাংলাদেশিদের জন্য রয়েছে আলাদা ডেস্ক। শুধু তাই নয়, রোগী এবং তার আত্মীয়স্বজনদের সুবিধার জন্য বাংলায় কথা বলতে পারেন এমন কাউকে অভ্যর্থনাকারীর দায়িত্বে রাখা হয়েছে। বামরুন গ্রাদ হাসপাতাল ও ন্যাশনাল ইউনিভারসিটি হাসপাতালে অধিকাংশ রোগীই নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য যান। মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত বেশির ভাগ রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে যান। এ হাসপাতালগুলোর আশপাশে বাঙালিদের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে আলাদা রেস্তোরাঁ, হোটেল এবং লজ। মেডিকেল ট্যুরিজমকে ঘিরে বেশ ভালো একটা আয়ের উৎস তৈরি হয়েছে এ এলাকায়।

রোগী এবং স্বজনদের নিয়মিত যাতায়াতের কারণে এ রুটগুলোতে বিমানসেবাও বাড়ানো হয়েছে। প্রায় অধিকাংশ এয়ারলাইন্স কোম্পানিরই ফ্লাইট রয়েছে কলকাতা, ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর রুটে। সম্প্রতি ভারতের চেন্নাই এবং দিল্লিগামী রোগীদের জন্য ফ্লাইট চালু হয়েছে। কলকাতাতেও রয়েছে অনেকগুলো ফ্লাইট। এ ছাড়া সড়ক পথে এবং রেলপথে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ চিকিৎসা নিতে ভারতে পাড়ি জমাচ্ছেন। জানা গেছে, ব্যাংককে প্রায় প্রতি সপ্তাহে ২২টি ফ্লাইট চলাচল করে। এর মধ্যে বাংলাদেশ বিমানের ৭টি, থাই এয়ারওয়েজের ১১টি এবং অন্যান্য এয়ারলাইন্সের বেশ কিছু ফ্লাইট রয়েছে। সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট রয়েছে ১১টি, কলকাতায় সপ্তাহে যাতায়াত করে প্রায় ১৪টি ফ্লাইট। এর পাশাপাশি অন্যান্য এয়ারলাইন্স তো রয়েছেই। সম্প্রতি ঢাকা-চেন্নাই রুটে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করেছে ইউএস বাংলা। আজ থেকে ঢাকা-দিল্লি রুটে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করবে বাংলাদেশ বিমান। মেডিকেল ট্যুরিজমের বাজার, কারা যাচ্ছে, কারা তাদের আকৃষ্ট করছে, তা নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে নানা গবেষণা হয়েছে। এ ধরনের একটি গবেষণা করেছেন ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিকসের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাহবুব আলী ও অস্ট্রেলিয়ার সেন্ট্রাল কুইন্সল্যান্ড ইউনিভারসিটির শিক্ষক ড. অনীতা মাধেকার। গবেষণায় তারা বাংলাদেশি রোগীদের বিদেশমুখিতার গতিপ্রকৃতি বোঝার চেষ্টা করেছেন। দেশীয় চিকিৎসাসেবা বাদ দিয়ে কেন তারা বিদেশমুখী হচ্ছেন, চেষ্টা করেছেন তার কারণ খোঁজার।

বাংলাদেশ থেকে মেডিকেল ট্যুরিজম নিয়ে এক দশক ধরেই কাজ করছেন এ দুই গবেষক। প্রথম পর্যায়ে তারা ভারতে চিকিৎসা নিয়ে ফেরা ছয়টি বিভাগ ও দুটি জেলার ১ হাজার ২৮২ জনের ওপর একটি জরিপ চালান। এদের তথ্য সংগ্রহ করেন ২০১০ সালের এপ্রিল থেকে ২০১২ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত। দ্বিতীয় পর্যায়ে থাইল্যান্ডে চিকিৎসা নেওয়া ১১৩ জনের ওপর ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত আরেকটি জরিপ চালান তারা। উভয় জরিপের ফলাফলেই চিকিৎসক ও নার্সদের প্রতি আস্থার সংকট বিদেশমুখিতার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

প্রথম পর্যায়ের জরিপে অংশগ্রহণকারীদের কাছে বিদেশে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে প্রায় ২৬ শতাংশ চিকিৎসকের অদক্ষতার কথা জানান। নার্সের অদক্ষতাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন ১২ শতাংশ। অপর্যাপ্ত হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, রোগীর নিরাপত্তা, উচ্চব্যয়, ভুল চিকিৎসা, নিম্নমানের ওষুধ ও আধুনিক যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতার কথাও অনেকে বলেন। তবে তাদের সংখ্যাটা নগণ্য।

রোগীর সর্বোত্তম সেবা ও নিরাপত্তা হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার প্রধান কাজ। তবে বাংলাদেশের অনেক হাসপাতালে রোগীদের সেবার চেয়ে ভোগান্তিই পোহাতে হয় বেশি। প্রয়োজন না থাকলেও দীর্ঘ সময় রাখা হয় আইসিইউতে। এর ওপর লাইসেন্সবিহীন নামসর্বস্ব হাসপাতালে অপচিকিৎসা তো রয়েছেই। হৃদরোগের রোগীদের হার্টের রিং পরাতে অপেক্ষা করতে হয় কয়েক মাস, কিডনি, লিভার প্রতিস্থাপনে রয়েছে নানা জটিলতা। সরকারি হাসপাতালে শয্যা সংকট, বেসরকারি হাসপাতালের লম্বা সিরিয়াল এবং অব্যবস্থাপনা রোগীদের বিদেশমুখী হতে বাধ্য করে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।


আপনার মন্তব্য