Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২২ জুলাই, ২০১৯ ২৩:৫০

গুজব ছড়িয়ে হত্যা চলছেই

ধামরাইয়ে নিহত ২ জন, মাদারীপুরে প্রতিবন্ধী নারীকে গাছে বেঁধে পিটুনি, রাজশাহীতে ৫ এনজিও কর্মী, কুষ্টিয়ায় বেড়াতে আসা বৃদ্ধা, বগুড়ায় শিক্ষার্থী, মৌলভীবাজারে প্রেমপত্র দিতে গিয়ে গণপিটুনির শিকার, নাটোর নীলফামারী সুনামগঞ্জেও ছেলেধরা গুজব ছড়িয়ে হামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক

গুজব ছড়িয়ে হত্যা চলছেই
ছেলেধরা সন্দেহে মাদারীপুরে মানসিক ভারসাম্যহীন নারীকে গাছে বেঁধে মারধর করা হয় -বাংলাদেশ প্রতিদিন

‘ছেলেধরা’ গুজব ছড়িয়ে হত্যাকা- চলছেই। জনমনে আতঙ্ক কাটছে না। ছেলেধরা সন্দেহে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গণপিটুনি দিয়ে নির্মম হত্যাকা- নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। একেকটি ঘটনা আঘাত হেনেছে সচেতন মানুষের বিবেকের দরজায়। কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না ‘ছেলেধরা’ গুজব। গতকালও ঢাকার ধামরাইয়ে গণপিটুনিতে ঘটেছে দুটি নির্মম মৃত্যুর ঘটনা। গত ১৩ দিনে সারা দেশে ১২ জন নিহত ও আহত হয়েছেন ৬৬ জন।

গত শনিবার পুলিশ সদর দফতর থেকে বিশেষ গণবিজ্ঞপ্তি দেওয়ার পর গতকাল পুলিশ সুপারসহ বিভিন্ন ইউনিট-প্রধানের কাছে পাঠানো হয়েছে বিশেষ সতর্কবার্তা। তবে পুলিশ বলছে, একটি কুচক্রী মহল দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে।পুলিশ সদর দফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) সোহেল রানা বলেন, ‘পুলিশ সামগ্রিক বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। সমগ্র ইউনিটকে এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কেউ যাতে আইন নিজের হাতে তুলে না নেন এ ব্যাপারে আমাদের বার্তা খুব পরিষ্কার। কারণ, প্রতিটি ঘটনা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।’ কোনো বিষয়ে সন্দেহ হলে ‘৯৯৯’-এ ফোন দিয়ে পুলিশের সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যানুযায়ী, ঢাকার ধামরাইয়ের রোয়াইল ইউনিয়নের কৃষ্ণনগর গ্রামের ওমানপ্রবাসী যুবক আবুল কালামকে গত রবিবার গভীর রাতে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে ছেলেধরা অপবাদ দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। একই কায়দায় একই ইউনিয়নের আঠিমাইটান গ্রামের আবদুর রহমানের ছেলে শরীফুল ইসলামকে পিটিয়ে হত্যা করে অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তরা। পুলিশ লাশ দুটি গতকাল উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠিয়েছে এবং আবুল কালাম হত্যার ঘটনায় ছয়জনকে গ্রেফতার করেছে।

জানা গেছে, ধামরাইয়ের কৃষ্ণনগর গ্রামের ফজল হকের ছেলে ওমানপ্রবাসী আবুল কালাম (২৭) ছয় মাস আগে দেশে আসেন। এরপর একই গ্রামের সাইফুল ইসলামের স্ত্রী রোজিনার প্রেমে পড়েন এবং ধীরে ধীরে পরকীয়া সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিষয়টি টের পেয়ে সাইফুল ইসলাম ও তোফাজ্জল নামে দুই যুবক গত রবিবার রাত ১১টার দিকে আবুল কালামকে ডেকে নেন। বাড়িতে নেওয়ার পরই ছেলেধরা ও ডাকাত বলে তাকে কয়েকজন মিলে বেধড়ক পেটান। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। নিহত আবুল কালামের বাবা ফজর আলী বাদী হয়ে নয়জনকে আসামি করে ধামরাই থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। ধামরাই থানার ওসি দীপক চন্দ্র সাহা জানান, হত্যার ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে এবং ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পলাতক আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।

রাজশাহী : রাজশাহীর চারঘাটে ছেলেধরা সন্দেহে গণধোলাই দিয়ে এনজিওর পাঁচ কর্মীকে পুলিশে দিয়েছে এলাকাবাসী। উদ্ধারকৃতরা আদ-দীন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের কর্মী বলে জানান পুলিশকে। গতকাল দুপুর ১টার দিকে উপজেলার রাওথা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। চারঘাট মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম জানান, উদ্ধারকৃতরা হলেন গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার ঝাকরপুর গ্রামের হাফিজুর রহমান (৪২), আবুল হোসেন (৪০) ও রেজাউল করিম (৩৮) এবং ঢাকার লালবাগ থানার কাইয়ুম আলী (৩৯) ও আবুল কালাম। মৌলভীবাজার : কুলাউরায় বন্ধুর প্রেমিকার কাছে প্রেমপত্র ও মোবাইল ফোন সেট দিতে গিয়ে বসন্ত শব্দকর (২৪) নামে এক যুবক ছেলেধরা সন্দেহে গণধোলাইয়ের শিকার হয়েছেন। রবিবার সন্ধ্যায় কুলাউড়ার হাজীপুর ইউনিয়নের পীরেরবাজার এলাকার খাতাইরপার গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

জানা গেছে, বসন্ত বন্ধুর প্রেমে সহায়তা করার জন্য ওই তরুণীর বাড়ি আসেন। এ সময় স্থানীয় লোকজন অপরিচিত যুবককে এলাকায় দেখে ছেলেধরা সন্দেহে বসন্তকে গণধোলাই দেয়। পরে পীরেরবাজার এলাকার কয়েকজন ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসী উত্তেজিত জনতার হাত থেকে বসন্তকে আটকে রেখে কুলাউড়া থানা পুলিশকে খবর দেয়। খবর পেয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে এসে জিজ্ঞাসাবাদ করে। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলাজুড়ে ছেলেধরা আতঙ্ক বিরাজ করছে। এ গুজবে কান না দেওয়ার জন্য জনগণের মধ্যে সচেতনতার লক্ষ্যে পৌর শহর ও নয়টি ইউনিয়নে মাইকিং হয়। বলা হয়, পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা ও রক্ত লাগবে এটি একটি গুজব। এ ছাড়া ছেলেধরা সন্দেহ হলে কাউকে গণপিটুনি না দিয়ে স্থানীয় চেয়ারম্যান, মেম্বার বা পুলিশকে খবর দিতে বলা হয়। মাদারীপুর : ছেলেধরা সন্দেহে মাদারীপুর সদর উপজেলার ধুরাইল ইউনিয়নের বৈরাগীর বাজার এলাকায় মানসিক ভারসাম্যহীন এক নারীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সদর উপজেলার বৈরাগীর বাজারে গতকাল সকালে এক মানসিক ভারসাম্যহীন নারীকে ঘুরতে দেখে ছেলেধরা সন্দেহে আটক করা হয়। পরে একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে শারীরিক নির্যাতন করা হয়। পুলিশে খবর দিলে পুলিশ গিয়ে ওই নারীকে উদ্ধার করে।

নীলফামারী : নীলফামারীর সৈয়দপুরে ছেলেধরা সন্দেহে নারীসহ চারজনকে পুলিশে দিয়েছেন স্থানীয়রা। তারা হলেন দিনাজপুরের আবদুল মালেক, নীলফামারীর হেলাল হোসেন, গাইবান্ধার আবদুল গফুর ও বরিশালের মেরিয়ান। তবে এরা মানসিক ভারসাম্যহীন বলে জানা গেছে।

নাটোর : নাটোরের সিংড়ায় ছেলেধরা সন্দেহে আলী আহমদ নামে এক যুবককে গণপিটুনির পর পুলিশে দিয়েছে এলাকাবাসী। রবিবার সন্ধ্যা ৭টায় সিংড়া পৌর শহরের মহেশচন্দ্রপুরে এ ঘটনা ঘটে। আটক যুবক পরশুরামপুর উপজেলার বেরাবাড়িয়া গ্রামের মৃত নছের আলীর ছেলে। স্থানীয় বাজারের দুটি শিশুকে ওই যুবক তার ব্যাগ থেকে চকলেট বা বিস্কুট দিতে চাইলে এলাকাবাসীর ছেলেধরা সন্দেহ হয়। পরে তাকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে দেওয়া হয়।

কুষ্টিয়া : কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে আসা হাসিনা খাতুন (৬০) নামে এক মানসিক ভারসাম্যহীন নারীকে ছেলেধরা সন্দেহে পিটিয়েছে এলাকাবাসী। গতকাল সকাল ৯টার দিকে উপজেলার থানাপাড়ায় এ ঘটনা ঘটে। ওই নারীর বাড়ি ময়মনসিংহে। মারধরের পর পুলিশ তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেছে।

সুনামগঞ্জ : জেলার বিভিন্ন স্থানে ছেলেধরা সন্দেহে পিটুনি খেয়েছেন নিরপরাধ তিন মানসিক প্রতিবন্ধী। শনিবার রাত ১০টা থেকে রবিবার বিকাল ৫টার মধ্যে জেলার তাহিরপুর, ছাতক ও জামালগঞ্জে মারধরের শিকার হন হতভাগ্য এসব মানসিক প্রতিবন্ধী।

বগুড়া : গাবতলীতে ছেলেধরা সন্দেহে ৪ যুবককে গণপিটুনি দিয়ে তাদের ব্যবহৃত পিকআপ ভ্যান আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছে জনতা। গতকাল উপজেলার দুর্গাহাটা ইউনিয়ন পরিষদের পূর্বপাশে স্কুলের সামনে এ ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ওই চার যুবককে উদ্ধার করে। এ সময় জনতার ইট পাটকেলে ৪ পুলিশ সদস্য আহত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে দেয় এবং ১৫ জনকে আটক করে। জানা যায়, ৪ যুবক বিকাল ৩টায় দুর্গাহাটা মাদ্রাসা ও ইউনিয়ন পরিষদের পূর্বপাশে একটি কেজি স্কুলের সামনে ঘোরাঘুরি করছিল। স্থানীয় লোকজন জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা এলোমেলো কথা বলে। তখন লোকজন ওই ৪ যুবককে ছেলেধরা সন্দেহে মারপিট শুরু করে। এছাড়া শেরপুরে ছেলেধরা গুজব রটিয়ে বাবুল হোসেন (১৮) নামে অনার্স পড়–য়া এক শিক্ষার্থীকে গণপিটুনি দেওয়া হয়েছে। রবিবার সন্ধ্যায় উপজেলার শাহবন্দেগী ইউনিয়নের শেরুয়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

খবর পেয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। বাবুল উপজেলার বিশালপুর ইউনিয়নের পানিসারা গ্রামের আবুল কাশেমের ছেলে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর