প্রকাশ : সোমবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ২৩:৪৯

তিনবার গুলিবিদ্ধ হয়েও পিছিয়ে যাইনি

ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর বীরউত্তম

তিনবার গুলিবিদ্ধ হয়েও পিছিয়ে যাইনি

কবি হেলাল হাফিজ লিখেছেন, ‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।’ আমি তখন তরুণ।

পাকিস্তানিদের নির্যাতনের নির্মমতা, বীভৎসতা আমাকে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য তাড়িত করেছে। আমি তখন পাকিস্তান আর্মিতে ক্যাপ্টেন পদে কর্মরত ছিলাম। পশ্চিম পাকিস্তানের খাড়িয়া ক্যান্টনমেন্ট ছিল আমার কর্মস্থল। ২৫ মার্চের ভয়াবহ ঘটনার খবর ক্যান্টনমেন্ট থেকে পেতাম না। আত্মীয়-স্বজনের চিঠি থেকে কিছুটা আভাস পেতাম। আমাকে একদিন বলা হলো ক্যান্টনমেন্টে সিনিয়র অফিসার আসবে তাকে রেলস্টেশন থেকে নিয়ে আসতে হবে। স্টেশনে অপেক্ষা করছি, এ সময় দেখি বোরকা পরিহিত দুজন নারী কাঁদছে। তাদের কান্নার সুর শুনে মনে হলো বাঙালি মেয়ে। আমি তখন জিজ্ঞেস করলাম আপনারা কাঁদছেন কেন? ওনারা বললেন, আমরা বাঙালি হিন্দু মেয়ে। আমাদের বোরকা পরিয়ে ঢাকা থেকে নিয়ে এসেছে যাতে কেউ না চেনে। একজনের নাম ছিল ¯িœগ্ধা, আরেকজনের স্বর্ণা। কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ওনারা জানতেন না। তৎকালীন পূর্ব বাংলার এ পরিস্থিতি আমার আর অজানা থাকল না। ক্যান্টনমেন্টে ফিরে আমার দুই বন্ধুর সঙ্গে পরামর্শ করলাম যে, এখানে আর চাকরি করা ঠিক না। দেশমাতৃকার টানে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণের মনস্থির করলাম। ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ছুটি ছিল। আমরা তিন বন্ধু ওইদিন শিয়ালকোট ক্যান্টনমেন্টে আসলাম। সেখান থেকে রাতে নদী-নালা পার হয়ে প্রায় ২৮ মাইল হেঁটে ভারত সীমান্তে পৌঁছালাম। জম্মু ক্যান্টনমেন্টে ভারতীয় সেনারা আমাদের গ্রহণ করল। এরপর ২১ আগস্ট কলকাতার মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এমএজি ওসমানীর অফিসে দেখা করলাম। তিনি আমাকে মুক্তিযুদ্ধের ৯ নম্বর সেক্টরে মেজর জলিলের ওখানে পোস্টিং করলেন। মেজর জলিল আমাকে পোস্টিং দিলেন বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলের সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে। ৬০ ছাত্র, কয়েকজন যুবক এবং সাবেক কয়েকজন সেনাসদস্য নিয়ে আমি ২৪ আগস্ট পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার হাসনাবাদ ক্যাম্প থেকে বাংলাদেশে আসলাম। ২৬ আগস্ট আসলাম উজিরপুরের একটা গ্রামে। আমাদের আসার খবর ততক্ষণে পাকিস্তানিদের কাছে পৌঁছে গেছে। তারা বরিশালের নদী পথে গানবোট, আকাশ থেকে উড়োজাহাজ দিয়ে আক্রমণ শুরু করল। আমরা তখন রকেট লঞ্চার ও গ্রেনেড দিয়ে আক্রমণ প্রতিহত করলাম। আমাদের আক্রমণে পাকিস্তানিদের দুটি গানবোট ডুবে গেল, বাকি দুটি পালিয়ে গেল। শত শত রাজাকারসহ লোকাল ছয়টি লঞ্চ ডুবে গেল। তারা নদীতে মারা পড়ল। ওই যুদ্ধে আমরা বিজয়ী হলাম। বরিশালের পানির কারণে ওদের গানবোটগুলো তীরে ভিড়তে পাড়েনি। আমরা কাছাকাছি আসলেই তীব্র আক্রমণ করেছি। এ যুদ্ধের খবর বিশ্বব্যাপী প্রচার হয়েছিল। আমরা বরিশাল এলাকায় বাঙালি সেনাসদস্য, ছাত্র, যুবকদের নিয়ে থানা কমিটি করলাম। বরিশাল অঞ্চলে গেরিলা বাহিনী গড়ে তোলা হলো। পাকিস্তান সেনাবাহিনী গেরিলা বাহিনীর আক্রমণে বের হতে পারত না। বরিশাল ক্যাডেট কলেজে পাকিস্তান বাহিনীর শক্তিশালী দুর্গ ছিল। অক্টোবরে আমরা ক্যাডেট কলেজ আক্রমণ করলাম। যুদ্ধের এক পর্যায়ে আমি গুলিবিদ্ধ হলাম। তখন আমরা ফিরে আসি। আমরা নলছিটি থানার চাঁচৈড়ে যুদ্ধ করলাম। আমার এক সময়ের শিক্ষক মেজর নাদির পারভেজের নেতৃত্বে পাকিস্তানি বাহিনী প্রায় হাজারখানেক সৈন্য, রাজাকাররা আমাদের দিকে তীব্র আক্রমণ করল। উড়োজাহাজ, গানবোট এবং স্থলপথে আক্রমণ শুরু করল। এভাবে আক্রমণ করবে আমরা ভাবতে পারিনি। আমার সঙ্গে ৩০০ সৈনিক ছিল। কিন্তু তারা খুব সাহসী ছিল। আমাদের যা আছে তাই নিয়ে অ্যাম্বুশ শুরু করলাম। তখন পাকিস্তানিরা ঝালকাঠির দিক থেকে এগিয়ে আসতে শুরু করল। পাকিস্তানিরা একটি বাড়িতে একত্রিত হয়ে আক্রমণের পরিকল্পনা করছিল। আমার এক সৈনিক দ্বীনের হাতে একটা মর্টার ছিল। আমরা মর্টার দিয়ে আক্রমণ করলে বহু পাকিস্তানি সৈন্য হতাহত হয়েছিল। বাকি সব বিভক্ত হয়ে আমাদের ওপর চড়াও হলো। কিন্তু আমাদের প্রস্তুতির কারণে আমরা বিজয়ী হয়েছিলাম। আমাদের তিনজন সৈনিক শহীদ হয়েছিলেন। আমাদের আক্রমণে পুরো ছয়টি থানা দখল করে থাকা পাকিস্তানিরা একদিনে আত্মসমর্পণ করেছিল। ৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ৬ নম্বর পাকিস্তান পাঞ্জাব রেজিমেন্টের সৈন্যরা স্টিমারে ঢাকার দিকে পলায়ন করছিল। তখন আমরা রকেট লঞ্চার দিয়ে আক্রমণ করে স্টিমার ডুবিয়ে দিই। সেখানে অধিকাংশ মারা গিয়েছিল। বরিশালে ভারতের সঙ্গে কোনো সীমান্ত ছিল না। এজন্য ওখানে থেকেই যুদ্ধ করতে হতো। শত্রুর পাশে থেকে ওদের অস্ত্র দখল করে যুদ্ধ করতে হতো। নিয়মিত অস্ত্র সরবরাহ পাওয়া কঠিন ছিল। নদীপথে কিছু কিছু আসত। অন্য জায়গায় সবাই সীমান্ত থেকে এসে অপারেশন চালিয়ে আবার সীমান্তে ফেরত যেত। কিন্তু বরিশাল অঞ্চলে সে সুযোগ ছিল না। যুদ্ধে তিনবার গুলিবিদ্ধ হয়েছি কিন্তু পিছিয়ে যাইনি। লেখক : মুক্তিযুদ্ধে ৯ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার। অনুলেখক : জয়শ্রী ভাদুড়ী


আপনার মন্তব্য