শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১২ ডিসেম্বর, ২০১৯ ২৩:৩৪

কেরানীগঞ্জে আগুনে ১৩ জনের মৃত্যু, বাকিরাও সংকটাপন্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক

কেরানীগঞ্জে আগুনে ১৩ জনের মৃত্যু, বাকিরাও সংকটাপন্ন
কেরানীগঞ্জে আগুনে মৃতদের স্বজনের আহাজারি

স্বজন হারানোর বিলাপে শেষ মুহূর্তের স্মৃতিগুলো যেন তাদের ঘুরেফিরেই তাড়া করছে। ঢাকার কেরানীগঞ্জে প্লাস্টিক কারখানায় অগ্নিকান্ডে প্রিয়জনের লাশ নিতে মর্গে আসেন কারও মা, বাবা, ভাই, স্ত্রী ও সন্তানরা। প্রিয়জন হারানোর শোকে হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। কান্নার তখন রোল পড়ে যায়। হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে সেখানকার বাতাস। অন্যদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের সামনে স্বজনদের ভিড়। যারা বেঁচে আছেন তাদের জন্য চলছে প্রার্থনা। নিজেদের ধরে রাখতে পারছেন না অনেকেই। এই বুঝি কোনো খারাপ সংবাদ শুনতে হবে। কারণ বুধবার রাতে দগ্ধদের বার্ন ইউনিটে ভর্তির পর থেকে একে একে নিভে যেতে থাকে প্রাণপ্রদীপ।

দগ্ধ ৩৪ জনের মধ্যে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এরই মধ্যে। বাকিদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। এর মধ্যে ১০ জনকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়েছে। প্রত্যেকের শ্বাসনালি পুড়ে গেছে।

ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের প্লাস্টিক কারখানায় অগ্নিকান্ডে দগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩-তে। এদের একজনের অগ্নিদগ্ধ লাশ ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয়। বাকিরা ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। বুধবার রাত থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত ঢামেকের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে তাদের মৃত্যু হয়। পরে লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়।

চিকিৎসকরা বলছেন, দগ্ধ অন্যদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। কারও কারও শতভাগ পুড়েছে, কারও ৭০-৯০ শতাংশ, কারও ৬০-৭০ শতাংশ পর্যন্ত। প্রত্যেকের শ্বাসনালি পুড়েছে। দগ্ধ প্রত্যেকের চিকিৎসার দায়িত্ব সরকার নিয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

অগ্নিকান্ডে দগ্ধ আটজন ভর্তি আছেন ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। আর ১০ জনকে নেওয়া হয়েছে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে।

নিহতরা হলেন- আলম, তার বড় ভাই আবদুর রাজ্জাক, ইমরান, ফয়সাল, রায়হান, বাবলু, সালাউদ্দীন, খালেদ, সুজন, জিনারুল, ওমর ফারুক ও জাহাঙ্গীর। এরা হাসপাতালে মারা গেছেন। আর ঘটনাস্থলে মারা যান মাহবুব নামে একজন।

দগ্ধরা হলেন- আসাদ, জিহান, দুর্জয়, বশির, আসলাম, সোহাগ, শহীদুল, মেহেদী, সুমন, মোস্তাকিম, জাকির, শওকত, আবু সাঈদ, ফয়সাল-২, সাজিদ, ফিরোজ, লাল মিয়া, মফিজ, সাজু মিয়া ও সিরাজ।

গতকাল শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সমন্বয়কারী ডা. সামন্তলাল সেন সাংবাদিকদের বলেন, কেরানীগঞ্জের প্লাস্টিক কারখানায় অগ্নিকান্ডে দগ্ধ ভর্তি কারও অবস্থা আশঙ্কামুক্ত নয়। সবার শ্বাসনালি পোড়া। চাকরিজীবনে এমন ভয়াবহ পোড়া রোগী দেখেননি বলে জানান তিনি।

বুধবার বিকালে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়ার হিজলতলায় প্রাইম প্লেট অ্যান্ড প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামে একটি কারখানায় ভয়াবহ আগুন লাগার ঘটনা  ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই একজন নিহত এবং ৩৪ জন দগ্ধ হন।

জানা গেছে, কারখানাটিতে বিরিয়ানির প্লেট, প্যাকেট ও একবার ব্যবহার উপযোগী (ওয়ান টাইম ইউজ) গ্লাস তৈরি করা হতো। পুরান ঢাকার ওয়ারী এলাকার ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম কারখানাটির মালিক। কারখানায় কর্মী প্রায় ২০০ জন। যেখানে আগুন লাগে সেখানে কর্মরত ছিলেন ৮০ জন। তাৎক্ষণিকভাবে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ধারণা করেন, গ্যাস বিস্ফোরিত হয়ে আগুন লাগতে পারে।

এর আগে চলতি বছর ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় আগুন লেগে ৭০ জনের মৃত্যু হয়।

মর্গে মারা যাওয়া আলমের স্ত্রী রুমা বেগম বলেন, কারখানার কাছেই তাদের বাসা। শরীরে আগুন লাগার পর দৌড়ে বাসায় আসেন আলম। ‘পানি, পানি’ বলে চিৎকার করছিলেন। তিনি ও স্বজনরা পানি দিয়ে গায়ের আগুন নেভান। পরে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আলম ভোরের দিকে মারা যান। তার বড় ভাই আবদুর রাজ্জাক মারা যান দুপুরে।

ঢামেক বার্ন ও প্লাস্টিক ইউনিটে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে দ্বিতীয় তলায় আফরোজা বেগম ও তার বড় ছেলে সোহান মিয়া অপেক্ষা করছেন। আফরোজা বেগম তখনো তার দগ্ধ ছোট ছেলে সাজু মিয়ার মুখ দেখতে পারেননি। তিনি শুধু জানেন তার সাজুকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে। ঠিক কোন জায়গায়, কীভাবে রাখা হয়েছে তা তিনি জানেন না। আফরোজা একা নন। বুধবার রাত থেকে গতকাল দুপুর পর্যন্ত আগুনে পোড়া মানুষগুলোর স্বজনদের প্রায় প্রত্যেকের একই অবস্থা। কেউ চিৎকার করে কাঁদছেন, কেউ কাঁদছেন ডুকরে।

আইসিইউর সামনে শাহানাজ বেগম নামে এমন একজনের সঙ্গে কথা হয়। তার স্বামী সিরাজ ওই কারখানায় গত নভেম্বর থেকে কাজ করছিলেন। তাদের তিন ছেলে, এক মেয়ে। কারখানার পাশেই তাদের বাসা। বুধবার বিকালে আসরের নামাজের জন্য বাসায় যান সিরাজ। নামাজ শেষে বাসা থেকে বের হতেই বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হয়ে আগুন তাদের বাসার গেটের সামনে চলে আসে। এতে সিরাজের পুরো মুখ, দুই হাত ও দুই পা পুড়ে যায়। দগ্ধ সাজু মিয়ার বড় ভাই সোহান মিয়া এ প্রতিবেদককে জানান, তিনি একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন। আর তার ভাই সাজু সাত দিন আগে ওই কারখানায় কাজে লাগেন। এই কয়েক দিনে আরও দুই দফা ছোটখাটো আগুন লাগে সেখানে। কারখানাটিতে প্রায় সময়ই আগুন লাগার ঘটনা ঘটত। শ্রমিকরা নিজেরাই তা নিভিয়ে ফেলতেন। বুধবার বিকালেও আগুন তারা নিজেরা নেভাতে যান। এর কিছু সময় পরই আগুন গ্যাসের লাইনে লেগে যায়। মুহূর্তেই বিস্ফোরিত হয়ে আগুন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

এদিকে গতকাল সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান ফায়ার সার্ভিসের চার সদস্যের একটি তদন্ত দল। এ সময় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-পরিচালক আবুল হোসেন জানান, আবাসিক এলাকায় কারখানা করা হয়েছে। কারখানার নিরাপত্তা রক্ষায় যা যা থাকা উচিত, যে পরিবেশ রাখা উচিত, তা এখানে ছিল না।

দগ্ধদের সবার অবস্থা খারাপ : গতকাল ঢামেক হাসপাতালে দগ্ধদের দেখতে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। খোঁজখবর নেওয়ার পর সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘ঘটনা খুবই দুঃখজনক। কেরানীগঞ্জের ঘটনায় যে রোগীগুলো হাসপাতালে এসেছেন, তাদের সবার অবস্থা খারাপ। হাসপাতালের চিকিৎসক-নার্সসহ স্টাফরা অনেক কষ্ট করেছেন। প্রধানমন্ত্রী সার্বক্ষণিক খবর রাখছেন। সরকারি খরচে তাদের চিকিৎসার নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। অনেক কারখানা আছে, যারা নিয়মকানুন মেনে কাজ করে না। অনেক জায়গায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকতে পারে না। এ বিষয়ে মালিকদের সতর্ক থাকতে হবে। তাদের উদাসীনতায়ই এসব আগুনের ঘটনা ঘটে।’

এর আগে গতকাল সকালে অগ্নিদগ্ধদের দেখতে যান ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান। হতাহতদের চিকিৎসার সব ব্যয় সরকার বহন করবে বলে জানান তিনি।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর