শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ২৩:৪৪

অর্থমন্ত্রীর অসন্তোষ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পারফরম্যান্সে

ডাকঘর সঞ্চয় সুদ আগের হারেই

মানিক মুনতাসির

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ আদায়, সেবার মান বৃদ্ধি, গ্রাহকদের আমানতের সুরক্ষা, ঋণ প্রদানে অনিয়ম-দুর্নীতি কমিয়ে আনাসহ সার্বিক কার্যক্রমের বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোকে খেলাপি ঋণ আদায়ে আরও মনোযোগী হওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। এ ছাড়া শেয়ারবাজারে শেয়ার অফলোডের যে প্রক্রিয়া চলছে তা ঘোষিত সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন করার তাগিদও দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। গতকাল সচিবালয়ে নিজ দফতরে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চেয়ারম্যানদের নিয়ে দীর্ঘ সময় রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন তিনি। বৈঠকে এ নির্দেশনা দিয়েছেন বলে সভায় উপস্থিত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। বৈঠকের একটি সূত্র জানায়, অর্থমন্ত্রীর প্রারম্ভিক বক্তব্যের পর প্রক্রিয়াধীন থাকা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরেশন গঠনের বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে সভায়। খেলাপি ঋণ আদায়ে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরেশন গঠনের সিদ্ধান্ত সব এমডি ও চেয়ারম্যান স্বাগত জানিয়েছেন। তবে এটা কোন প্রক্রিয়ায় কাজ করবে, কী ধরনের কাজ করবে, খেলাপিদের সম্পদ ক্রোক করার ক্ষমতা দেওয়া হবে কিনাÑ এসব বিষয় আরও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা। যেসব ব্যাংক খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যর্থ হবে, তা আদায়ের ভার দেওয়া হবে সরকারের প্রস্তাবিত নতুন সংস্থা ‘অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরেশন’কে। সরকারের বিশেষায়িত এই আর্থিক প্রতিষ্ঠান খেলাপি ঋণ আদায়ে সম্ভব সব ধরনের ক্ষমতা পাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজন মনে করলে ঋণখেলাপির ব্যাবসাপ্রতিষ্ঠানও বিক্রি করে দিতে পারবে কিংবা লিজ দিতে পারবে। ঋণখেলাপির স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি দখল, পরিচালনা পর্ষদ পরিবর্তন, ঋণ পুনর্গঠনও করতে পারবে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক মিলে ‘বাংলাদেশ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরেশন আইন, ২০২০’ নামে একটি আইনের খসড়াও ইতিমধ্যে চূড়ান্ত করেছে। সূত্র জানায়, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে একটি শক্তিশালী ব্যাংকিং কমিশন গঠন করা হচ্ছে। কোনো অর্থনীতিবিদকে এ কমিশনের প্রধান করা হতে পারে। গতকালের বৈঠকে এ বিষয়েও আলোচনা করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকিং কমিশনের কার্যক্রম বা কার্যপরিধি কী হবে- সে বিষয়েও আলোকপাত করা হয়। একটি সূত্র জানায়, বৈঠকে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীরা নিজ নিজ ব্যাংকের গত ছয় মাসের সার্বিক পারফরম্যান্সের প্রতিবেদন তুলে ধরেন। এতে দেখা যায়, গত ছয় মাসে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ কমলেও তা আশানুরূপ নয়। ব্যাংকগুলোর ঋণ অবলোপন ও সরকারের দেওয়া সুবিধা ২ শতাংশ পরিশোধ করে ঋণ নিয়মিত করার কারণে খেলাপি ঋণ আদায়ে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকের খেলাপি ঋণের স্থিতি ছিল ৪৩ হাজার ৩১৩ কোটি টাকা। গত বছরের জুনে যা ছিল ৫৩ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা। ছয় মাসে এসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণ কমেছে মাত্র ১০ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা। নানা ধরনের সুবিধা দেওয়ার পরও খেলাপি ঋণ আশানুরূপ না কমায় নির্বাহী ও চেয়ারম্যানদের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী। এ সময় তাদের ব্যাংকের সেবার মান বৃদ্ধি, খেলাপি ঋণ সহনীয় পর্যায়ে নিতে আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের নির্দেশনা দেন তিনি। রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের শীর্ষে আছে জনতা ব্যাংক। এর পরে ক্রমান্বয়ে রয়েছে সোনালী, বেসিক, অগ্রণী, রূপালী ও বিডিবিএল।

জনতা : গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা। গত বছরের জুন শেষে ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণের স্থিতি ছিল ২০ হাজার ৯৯৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমেছে ৬ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা।

সোনালী : গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা। গত বছরের জুন শেষে ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণের স্থিতি ছিল ১২ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসে সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমেছে ১ হাজার ৯১২ কোটি টাকা।

বেসিক : গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৫০৮ কোটি টাকা। গত বছরের জুন শেষে ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণের স্থিতি ছিল ৯ হাজার ১১৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসে বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমেছে ১ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা।

অগ্রণী : গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের স্থিতি ছিল ৬ হাজার কোটি টাকা। গত বছরের জুন শেষে ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণের স্থিতি ছিল ৬ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসে অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমেছে ১৪৭ কোটি টাকা।

রূপালী : গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ২২৬ কোটি টাকা। গত বছরের জুন শেষে ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণের স্থিতি ছিল ৪ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসে রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমেছে ১৫৪ কোটি টাকা।

বিডিবিএল : গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের স্থিতি ছিল ৭৬৪ কোটি টাকা। গত বছরের জুন শেষে ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণের স্থিতি ছিল ৯০১ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসে বিডিবিএলের খেলাপি ঋণ কমেছে ১৩৭ কোটি টাকা।

ঋণ অবলোপন ও খেলাপি ঋণের ২ শতাংশ নগদ জমা দিয়ে খেলাপি ঋণ নিয়মিতকরণের সুযোগ দিয়ে এখনো আশানুরূপ সাড়া মেলেনি। তবে আশ্যব্যঞ্জক দিক হলো, পুরো ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ডিসেম্বর-২০১৯ শেষে ৯৪ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে; যা আগের ত্রৈমাসিক হিসাবে ছিল ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংক খাতের মোট ঋণের বিপরীতে ১০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ।

ডাকঘর সঞ্চয়ে মুনাফা ১৭ মার্চ থেকে আগের মতো : অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, অটোমেশনের শর্তে আগামী ১৭ মার্চ থেকে ডাকঘর সঞ্চয় স্কিমের সুদের হার আগের মতো ১১ দশমিক ২৮-এ আবারও ফিরে যাবে। এ সিদ্ধান্ত প্রথম পর্যায়ে বাস্তবায়ন হবে জেলা পর্যায়ে, এরপর উপজেলা পর্যায়ে। সঞ্চয়পত্রের অর্ধেক আমরা অটোমেশন করে    ফেলেছি। সঞ্চয়পত্র ব্যাংক ও পোস্ট অফিস থেকে পাওয়া যায়। ব্যাংকের মাধ্যমে সঞ্চয়পত্র কেনার ক্ষেত্রে পুরোটাই অটোমেশন হয়েছে। অপব্যবহার  রোধ করতেই অটোমেশন করা হয়েছে। অটোমেশন করা না হলে এ স্কিমটা যাদের জন্য করা হয়েছিল তারা পাচ্ছিল না। যাদের পাওয়ার কথা ছিল না তারা এ সুবিধা নিয়ে নিচ্ছিল। এতে আমাদের উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছিল না।’ গতকাল সচিবালয়ে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত্র মন্ত্রিসভা কমিটির  বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের কাছে অর্থমন্ত্রী এ সব কথা বলেন। গণমাধ্যমের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমার মনে হয় আমাদের আরও চিন্তা করে মতামতগুলো প্রচার করা উচিত। বলে দেওয়া হলো ব্যাংক কমিশন গঠন করা হয়ে গেছে। কমিশনের  চেয়ারম্যানের নামও বলে দেওয়া হলো, এগুলো তো ঠিক নয়। এভাবে একটার পর একটা জটিলতা চলছে। ব্যাংক কমিশন করব, অবশ্যই করব, তবে সময় লাগবে। ব্যাংকিং খাতের চলমান পরিস্থিতির প্রতিবাদে বাম দলগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেছে বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকে বামদল যাবে, বামদলের তো টাকা-পয়সার দরকার নেই। ওরা ওখানে যাবে কেন? তিনি বলেন, ব্যাংক থেকে সঞ্চয়পত্র কেনার ক্ষেত্রে লিমিট বাড়ানো হয়েছে। পেনশনারদের আরও বেশি করা হয়েছে। এখন যে সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে মনে হয় না কারও এর চেয়ে বেশি প্রয়োজন আছে। ডাকঘর সঞ্চয় স্কিমে বিনিয়োগসীমাও রয়েছে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত। যারা গ্রামের মানুষ শহরে আসতে পারে না, এদের জন্য এটা যথেষ্ট।’ ডাকঘর সঞ্চয় স্কিমের সুদহার কমানোর কারণ উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যখন দেখলাম সবাই চলে যাচ্ছে পোস্ট অফিসে, বন্ধ করব কীভাবে, বন্ধ করতে হলে বলতে হবে ইন্টারেস্ট নেই। যদি একবার কিনে ফেলে তাহলে তো করার কিছু নেই। অটোমেশন শেষ হলে এটার জন্য যা প্রযোজ্য তা পাবেন। উদ্দেশ্য হচ্ছে ৩০ লাখ যা ৩০ লাখই থাকবে এবং ওখানে যদি ইন্টারেস্ট ১১ পার্সেন্ট থাকে এখানে ১১ পার্সেন্ট থাকবে না কেন। ১৭ মার্চ অটোমেশন শেষ হলে আগের সুদের হারে চলে যাবে। দীর্ঘদিন যেসব সমস্যা হয়েছিল সেসব জায়গায় শৃঙ্খলা নিয়ে আসা হচ্ছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, অটোমেশন সব জায়গায় করে ফেলতে পারলে, আগে  থেকে নীতি নির্ধারণ করলে অনেক ভালো কাজ হতো। ডাকঘর অটোমেশন হওয়ার পর গ্রাহকদের টিআইএন ও আইডি নম্বর নেওয়া হবে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা জানতে চাই কারা কেনে যাতে করে অপব্যবহার না হয়। পোস্ট অফিসে যে ৩০ লাখ আছে সেখানে লাগবে। তবে প্রথম ২ লাখ পর্যন্ত আমরা কিছু চাইব না এদের কোনো রকম টিআইএন জমা দিতে হবে না। কিন্তু ইন্টারেস্ট ১১ পার্সেন্ট পাবে। এদিকে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানো হয়নি জানিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছে জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতর। সংস্থাটি বলেছে, সঞ্চয়পত্র বা সঞ্চয় স্কিমসমূহের মুনাফার হার কমানো হয়নি। জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতর সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগকারী বা জনসাধারণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে অঙ্গীকারবদ্ধ।  সঞ্চয়পত্রসমূহের মুনাফার হার ৫ বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্র ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ, ৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র ১১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ, পরিবার সঞ্চয়পত্র ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ ও পেনশন সঞ্চয়পত্র ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ পূর্বের ন্যায় বলবৎ রয়েছে। গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো ব্যাখ্যায় এ তথ্য জানিয়েছে জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতর। সংস্থাটির মহাপরিচালক স্বাক্ষরিত ব্যাখ্যায় বলা হয়, সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে মুনাফার হার কমানোর বিষয়ে যেসব সংবাদ পরিবেশন করা হয়েছে তা অসঙ্গতিপূর্ণ। বিনিয়োগ উৎসাহিত করার জন্য সব ব্যাংক ঋণের সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার সরকারি অনুশাসনের ধারাবাহিকতায় ১৩ ফেব্রুয়ারি অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের নিয়ন্ত্রণাধীন ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক- সাধারণ হিসাব এবং ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক-মেয়াদি হিসাবের মুনাফার হার হ্রাসপূর্বক পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর