শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩ এপ্রিল, ২০২০ ২৩:৩৪

সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা সংকট অব্যাহত

হাসপাতালে মিলছে না সেবা, চিকিৎসা না পেয়ে রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ, রোগী ফিরে গেলে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা : স্বাস্থ্যমন্ত্রী

জয়শ্রী ভাদুড়ী

সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা সংকট অব্যাহত

বেশ কিছুদিন ধরেই টাইফয়েড জ্বরে ভুগছিলেন নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা সামছুল আলম ভুঁইয়া। গত বুধবার হঠাৎ জ্বরের সঙ্গে শ্বাসকষ্ট শুরু হলে নারায়ণগঞ্জের ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে নিয়ে যান স্বজনরা। কিন্তু হাসপাতালের মূল ফটকে টানানো রয়েছে জ্বর, শ্বাসকষ্টের কোনো রোগীকে সেবা দেওয়া হবে না। এরপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েও কোনো ব্যবস্থা হয়নি রোগী ভর্তির। সারা দিন রোগী নিয়ে ঘুরে সন্ধ্যা ৬টার দিকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করতে পারেন তার স্বজনরা।

এ ভোগান্তি শুধু একজনের নয়, দেশের অধিকাংশ হাসপাতালেই সেবা পাচ্ছে না রোগীরা। করোনাভাইরাসের প্রভাব পড়েছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে। এ ভাইরাসের উপসর্গের সঙ্গে মিল না থাকলেও রোগী ভর্তি অথবা চিকিৎসাসেবা দিতে অনীহা প্রকাশ করছেন চিকিৎসক, নার্স ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। অন্য কোনো রোগের চিকিৎসা করাতে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ রোগীরা। হৃদ কিংবা কিডনি রোগে ভুগলেও মিলছে না চিকিৎসা। এমন পরিস্থিতিতে অনেক রোগী এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছোটাছুটি করেই প্রাণ হারাচ্ছেন। বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও প্রাইভেট চেম্বারগুলো থেকে রোগীরা সেবা না পেয়ে ফিরে গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।

রোগীর স্বজন বি এম শফিক আহমেদ বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে রোগী নিয়ে গিয়ে দারোয়ান ছাড়া কথা বলার মতো কোনো মানুষ পাইনি। সারা দিন ঘুরে বিকাল ৫টায় কুর্মিটোলা হাসপাতালে এলে প্রায় দেড় ঘণ্টা পর তারা ভর্তি নিতে রাজি হয়। নার্স-ওয়ার্ডবয় কেউ কাছে  আসে না। আমাদের দিয়েই নার্সের কাজ করিয়েছে। তারা যতটা সম্ভব দূরে থেকে নির্দেশনা দিয়েছে। ৩০ মার্চ চার হাসপাতাল ঘুরে সেবা না পেয়ে মুক্তিযোদ্ধা মো. আলমাস উদ্দিন (৬৮) মারা গেছেন। আলমাস উদ্দিনের বড় ছেলে আরিফ হাসান অভিযোগ করেন, গত শনিবার ভোরে তার বাবা রাজধানীর বাসাবোর নিজ বাসায় ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। এরপর তাকে বারডেম হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, পপুলার হাসপাতাল ও কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে নেওয়া হলে করোনা আক্রান্ত সন্দেহে কোনো হাসপাতালই ভর্তি করতে রাজি হয়নি। পরে রাত ১২টায় মুগদা হাসপাতালে ভর্তি করা সম্ভব হলেও ততক্ষণে তার শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি ঘটে। এ অবস্থায় রবিবার সকালে সেখানেই মারা যান তার বাবা। মৃত্যুর পর ডেথ সার্টিফিকেটেও ‘ব্রেন স্ট্রোকে মৃত্যু’ উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানান আরিফ। এ ঘটনায় বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সাবেক যুগ্মমহাসচিব সফিকুল বাহার মজুমদার টিপু বলেন, অসুস্থতা নিয়ে হাসপাতালে গিয়ে রোগীরা সেবা পাচ্ছে না। মুক্তিযুদ্ধের দামাল যোদ্ধা আলমাস হাসপাতালের দ্বারে দ্বারে ঘুরে মারা গেলেন। তার ছেলেমেয়ে অসুস্থ বাবাকে নিয়ে ১৬ ঘণ্টা অ্যাম্বুলেন্সে ঘুরে কোনো হাসপাতালে ভর্তি করতে পারেননি। এ ঘটনায় আমরা ব্যথিত। মানুষকে সেবা দেওয়া চিকিৎসকের মৌলিক দায়িত্ব। করোনা ছাড়া অন্য রোগেও তো মানুষ আক্রান্ত হতে পারে।

খুলনায় চারটি হাসপাতাল ঘুরেও চিকিৎসা না পেয়ে রিফাত নামে এক স্কুলছাত্রের মৃত্যুর অভিযোগ পাওয়া গেছে। লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত রিফাত নগরীর খালিশপুর হাউজিংয়ে ১ নম্বর বিহারি ক্যাম্পের বাসিন্দা পাটকল শ্রমিক মো. কাশেমের ছেলে। সে খালিশপুর ওব্যাট প্রাইমারি স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র ছিল। রিফাতের পরিবার জানায়, রিফাত অনেক দিন থেকেই অসুস্থ। গত মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটার দিকে সে আরও অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসক নেই বলে সেখানে তার ভর্তি নেওয়া হয়নি। এরপর আরেক হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেও তাকে ভর্তি নেওয়া হয়নি। এরপর অবস্থার অবনতি হলে রিফাতকে খালিশপুর ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেও তাকে ভর্তি নেওয়া হয়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রিফাতকে গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেয়। গাজী মেডিকেলে নেওয়া হলে তারা জানায়, চিকিৎসক নেই। তাই রোগী ভর্তি করা যাবে না। হাসপাতালে হাসপাতালে ভর্তির জন্য ঘুরতে ঘুরতে সন্ধ্যায় রিফাত মারা যায়।

গত বুধবার ছয়টি হাসপাতাল ঘুরে মাকে বাঁচাতে পারেননি সন্তানরা। চিকিৎসা না পেয়ে সন্তানদের চোখের সামনে মারা গেছেন অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক মাহমুদা খানম (৭২)। ওই শিক্ষকের ছেলে সৈয়দ শাহীন বলেন, ‘ছয়টি হাসপাতালে গিয়েছি, কোনো হাসপাতালই চিকিৎসা দেয়নি মাকে। দীর্ঘদিন শ্বাসকষ্টের রোগী ছিলেন তিনি। সকালে হঠাৎ শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে মাকে নিয়ে এ্যাপোলো হাসপাতালে যাই। সেখানে অনেক অনুরোধ করার পর অক্সিজেন দেন তারা। কিন্তু কোনো আইসিইউর ব্যবস্থা হয়নি। এভাবে দিন গড়িয়ে রাত ৮টা। অবশেষে মগবাজারের রাশমনো হাসপাতাল জানায় আইসিইউ খালি আছে। হাসপাতালে পৌঁছানোর পরও গড়িমসি। ফেলে রাখা হয় ঘণ্টাখানেক। শেষ পর্যন্ত বিনা চিকিৎসাতেই মারা যান মা।’

বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক বন্ধ থাকলে ‘ব্যবস্থা’ : বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও প্রাইভেট চেম্বারগুলো থেকে রোগীরা সেবা না পেয়ে ফিরে গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সতর্ক করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিয়মিত অনলাইন ব্রিফিংয়ে যুক্ত হয়ে তিনি এ হুঁশিয়ারি দেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘প্রাইভেট হাসপাতাল কাজ কম করছে। ক্লিনিক ও চেম্বারগুলো অনেকাংশে বন্ধ আছে। আমরা সামাজিক মাধ্যমে জানতে পারছি, নিজেরাও দেখতে পাচ্ছি। এ সময়ে আপনাদের পিছপা হওয়াটা যুক্তিসংগত নয়। মানুষের পাশে দাঁড়ান, মানুষকে সেবা দিন। আমরা কিন্তু এটা লক্ষ্য করছি। পরবর্তীকালে যা যা ব্যবস্থা নেওয়ার আমরা সেসব নিতে পিছপা হব না।’


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর