শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৭ এপ্রিল, ২০২০ ০০:১৩

দ্বিগুণ হারে বাড়ছে সংক্রমণ

এক দিনে ৩৫ জনসহ মোট আক্রান্ত ১২৩, দুদক পরিচালকসহ আরও ৩ মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক

দ্বিগুণ হারে বাড়ছে সংক্রমণ

দেশে দ্বিগুণ হারে বাড়ছে করোনাভাইরাস সংক্রমণ। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। গতকাল এক দিনেই নতুন ৩৫ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়েছে। গত ৮ মার্চ দেশে প্রথমবারের মতো কারও দেহে সংক্রমণ ধরা পড়ার ৩০ দিনের মাথায় প্রাদুর্ভাবের শুরু দেখা যাচ্ছে। গত ২ এপ্রিল আক্রান্ত হন ২ জন, পরদিন ৩ এপ্রিল আক্রান্ত হন ৫ জন, ৪ এপ্রিল আক্রান্ত ৯ জন, ৫ এপ্রিল নতুন সংক্রমণ হয় ১৮ জনের দেহে এবং সর্বশেষ গতকাল ৬ এপ্রিল তা দ্বিগুণ হয়ে আক্রান্ত হন ৩৫ জন। এ নিয়ে দেশে ভাইরাসটিতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৩ জনে। গতকাল আক্রান্ত রোগীর মধ্যে আরও ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একজন পরিচালক ও নারায়ণগঞ্জের ২ জন মারা গেছেন। ফলে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ জনে। এদিকে করোনাভাইরাস এখন পর্যন্ত দেশের ১৫ জেলায় বিস্তৃত হয়েছে। ঢাকার অধিবাসীরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। এর পরই স্থান করে নিয়েছে নারায়ণগঞ্জ। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীতে ৬৪ জন, ঢাকার বিভিন্ন উপজেলায় ৪ জন,  নারায়ণগঞ্জে ২৩ জন, মাদারীপুরে ১১ জন, চট্টগ্রামে ২ জন, গাইবান্ধায় ৫ জন, চুয়াডাঙ্গায় ১ জন, কুমিল্লায় ১ জন, কক্সবাজারে ১ জন, গাজীপুরে ১ জন, জামালপুরে ৩ জন, মৌলভীবাজারে ১ জন, নরসিংদীতে ১ জন, রংপুরে ১ জন, শরীয়তপুরে ১ জন ও সিলেটে ১ জন আক্রান্ত রয়েছেন।

গত ৮ মার্চ দেশে প্রথমবারের মতো কারও দেহে সংক্রমণ ধরা পড়ে। গতকাল এক দিনে মৃত্যু হয়েছে ৩ জনের এবং আক্রান্তের সর্বোচ্চ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৫ জনে। আক্রান্তদের মধ্যে মোট ৩৩ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। এ ছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় ৭০৯ জনকে হোম কোয়ারেন্টাইনে এবং ৩০ জনকে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে নেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত দেশে ৬৬ হাজার ৫১১ জনকে হোম কোয়ারেন্টাইনে এবং ২৯৯ জনকে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। সর্বমোট ৬৬ হাজার ৮১০ জনকে কোয়ারেন্টাইনে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় ২৩ জনকে আইসোলেশনে নেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত মোট ৪৪৩ জনকে আইসোলেশনে নেওয়া হয়। অনেককে ছাড়পত্র দেওয়ায় বর্তমানে ১০৭ জন আইসোলেশনে রয়েছেন।

গতকাল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের সর্বশেষ পরিস্থিতি জানাতে অনলাইন ব্রিফিংয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, নতুন আক্রান্ত ৩৫ জনের মধ্যে ১১ জনের বয়স ৪১ থেকে ৫০ বছর, এরপর ৬ জন ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সী। এলাকাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেশে শনাক্তকৃত মোট ১২৩ জন করোনা রোগীর মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক ৬৪ জন রাজধানী ঢাকার। এ পর্যন্ত সারা দেশ থেকে ৪ হাজার ১১ জন ব্যক্তির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে, যার মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ৪৬৮টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এ নমুনার সবগুলোই পরীক্ষা করা হয়েছে বলে জানান তিনি। আবুল কালাম আজাদ বলেন, বাংলাদেশের ১৫টি জেলায় কেইস পেয়েছি। যেখানে একাধিক ব্যক্তি আছেন এবং এক জায়গার মধ্যে সীমাবদ্ধ আছেন সেসব জায়গাকে আমরা ক্লাস্টার বলছি। এ ধরনের ব্যবস্থা (ক্লাস্টার) হতে পারে ঢাকা মহানগরী, নারায়ণগঞ্জ, মাদারীপুর, গাইবান্ধায়। আইইডিসিআর পরিচালক মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা গতকাল ব্রিফিংয়ে বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় যাদের সংক্রমণ আমরা নিশ্চিত করতে পেরেছি তাদের ১২ জন নারায়ণগঞ্জের। নারায়ণগঞ্জে ক্লাস্টার হিসেবে চিহ্নিত করেছি, সেখানে বেশ কিছু কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে, যাতে ওখান থেকে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে না পড়ে। পরবর্তীতে রয়েছে মাদারীপুর এলাকা। নারায়ণগঞ্জের দুই রোগীই হাসপাতালে আসার কিছুক্ষণ পর মারা যান বলে জানান ফ্লোরা। তিনি জানান, নারায়ণগঞ্জের যে দুজন মারা গেছেন, সঙ্গে সঙ্গেই তাদের কন্টাক্ট ট্রেসিং শুরু করেছে আইইডিসিআর। এ পর্যন্ত তাদের কন্টাক্টে যতজন পাওয়া গেছে তাদের সবাইকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, পুরো নারায়ণগঞ্জকে হটস্পট হিসেবে আইডেন্টিফাই করে সেখানে কোয়ারেন্টাইন কার্যক্রমকে আরও বেশি শক্তিশালী করার জন্য আমরা বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছি। ওখানে প্রশাসন আমাদের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। রোগী যখন চিহ্নিত হয় তখন থেকেই আমরা কোয়ারেন্টাইন কার্যক্রম শুরু করি। রোগী জীবিত না মৃত সেটা কিন্তু বিবেচনার বিষয় নয়। কারণ কোয়ারেন্টাইন করা হয় যাতে সংক্রমণ ছড়িয়ে না পড়ে। সেব্রিনা ফ্লোরা জানান, নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ১২৩ জনের গত ২৪ ঘণ্টায় সে ৩৫ জন আক্রান্ত রোগীর কন্টাক্ট ট্রেসিং চলছে। এদের কারও কন্টাক্ট ট্রেসিং কমপ্লিট হয়ে যায়নি। যারা মিসিং কন্টাক্ট তাদের নাম তালিকাভুক্ত থাকে। ১২৩ জনের মধ্যে বিভিন্ন রকমের কন্টাক্টের সংখ্যা রয়েছে। কন্টাক্ট ট্রেসিং প্রক্রিয়াটি কিন্তু খুব সহজ নয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আমরা সব কন্টাক্টকে ট্রেস করতে পারি। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে যেটা হয়... কেউ যদি গণমাধ্যমের চলাফেরা করে থাকেন সেই মুহূর্তে অথবা এমন কোনো অনুষ্ঠানে গেছেন যেখানে বড় সমাবেশ ছিল সেক্ষেত্রে কিছু মিসিং কন্টাক্ট থাকে। আমাদের হিসাবের মধ্যে মিসিং কন্টাক্ট কতজন সেটাও আমরা তালিকাভুক্ত করে সে এলাকাটিও কনটেইনমেন্টের মধ্যে নিয়ে আসি। ক্লাস্টার এলাকার বিষয়ে ফ্লোরা বলেন, যদি কোথাও একই জায়গায় কম দূরত্বের মধ্যে একাধিক রোগী থাকে তখনই আমরা সেটাকে ক্লাস্টার হিসেবে আইডেন্টিফাই করে ইনভেস্টিগেশন করে থাকি।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত দুদক কর্মকর্তার মৃত্যু : নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একজন পরিচালক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। ওই দুদক কর্মকর্তা গত আট দিন ধরে রাজধানীর কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। গতকাল সকালে সেখানে তার মৃত্যু হয় বলে হাসপাতালের সমন্বয়ক ডা. শিহাব উদ্দিন জানান। তিনি বলেন, রাত সোয়া ২টার দিকে তার প্রেসার নেমে আসে। আমাদের দিক থেকে সব ধরনের চেষ্টা করা হয়েছে। আনফরচুনেটলি তার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়। সাড়ে ৭টায় মারা যান তিনি। ২২তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ওই কর্মকর্তা ২০১৬ সাল থেকে দুদকে প্রেষণে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তার মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। জনপ্রশাসন সচিব শেখ ইউসুফ হারুনও ওই দুদক কর্মকর্তার মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসের ফেসবুক পেজেও শোক প্রকাশ করে বার্তা দেওয়া হয়েছে। কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালের একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা জানান, করোনাভাইরাস পজিটিভ আসায় গত ৩০ মার্চ ওই দুদক কর্মকর্তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে নেওয়া হয়েছিল নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে। ওই দুদক কর্মকর্তা স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন। তার পরিবারের সদস্যরা বাসাতেই আছেন বলে ওই হাসপাতাল কর্মকর্তারা জানান। দুদকের একজন কর্মকর্তা জানান, সর্বশেষ গত ২৪ মার্চ দুদকের প্রধান কার্যালয়ে অফিস করেন করোনাভাইরাসে মারা যাওয়া ওই পরিচালক। ওই কর্মকর্তার কাছাকাছি থেকে কাজ করেছেন এমন ১২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন।

বিভিন্ন স্থানে ভবন লকডাউন : করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে ঢাকার কয়েকটি ভবন লকডাউন করেছে পুলিশ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) নির্দেশে ভবনগুলো লকডাউন করা হয়েছে। এর মধ্যে ওয়ারী এলাকার একটি ভবনে এক বৃদ্ধ মারা গেছেন। আইইডিসিআরের সদস্যরা এসে তার নমুনা নিয়ে গেছেন। সতর্কতার অংশ হিসেবে ওই এলাকায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। খুব প্রয়োজন ছাড়া কাউকে বাড়ির বাইরেও বেরোতে দেওয়া হচ্ছে না। মৃত ওই ব্যক্তির বাসা ওয়ারীর র‌্যাঙ্কিন স্ট্রিটে। এ ছাড়া মিরপুর-১ নম্বরের তানিন গলির ২৫ পরিবার লকডাউন করা হয়েছে। এ ছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিচালক সেন্ট্রাল রোডের যে বাড়িতে থাকতেন সেখানেও সাধারণ মানুষের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। অন্যদিকে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কিনা, তা জানতে কুমিল্লা নগরের পশ্চিম বাগিচাগাঁও রেলস্টেশন এলাকার এক যুবকের (২১) রক্তের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এরপর ওই যুবক যে ভবনে থাকেন, সেই ভবন লকডাউন করা হয়েছে। ওই ভবনে ১৫টি পরিবার বাস করে। কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার ইলিয়টগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের ভেলানগর গ্রামের ছয়টি পরিবারকে রবিবার রাত ১০টা থেকে লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। করোনা সংক্রমণ রোধে মানিকগঞ্জে যাওয়া তাবলিগ জামাতের ৫৪ জন মুসল্লিসহ ৫৭ জনকে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। রবিবার রাতে ৪৯ জন ও গতকাল আটজনকে মানিকগঞ্জ পৌর শহরের কেওয়ারজানী এলাকায় অবস্থিত আঞ্চলিক জনসংখ্যা প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে তাদের কোয়ারেন্টাইন করা হয়। চট্টগ্রামে করোনাভাইরাসে প্রথম আক্রান্ত বৃদ্ধের ছেলেও এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এ ঘটনায় নগরের খুলশীতে ওই যুবকের কর্মস্থল ‘দি বাস্কেট’ নামের একটি সুপারশপ লকডাউন করেছে প্রশাসন। এ ছাড়া ওই সুপারশপে কর্মরত মালিক, কর্মচারীসহ ৭৪ জনকে হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়েছে।

রাতে নারায়ণগঞ্জে আরও এক মৃত্যু : গতকাল নারায়ণগঞ্জ শহরের ১৮ নম্বর শীতলক্ষ্যা এলাকার ফারুক নামের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে তিনি ঢাকার কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর