শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২ জুন, ২০২০ ০০:১০

লিবিয়ায় পাচারে টার্গেট ছিল টাইলস শ্রমিকরা হোতা গ্রেফতার

নিজস্ব প্রতিবেদক

লিবিয়ায় পাচারে টার্গেট ছিল টাইলস শ্রমিকরা হোতা গ্রেফতার
হাজী কামাল

পাচারকারী চক্র লিবিয়া পাঠাতে এদেশের টাইলস শ্রমিকদের টার্গেট করত। আর সেখানে পাঠাতে চক্রটি তিন ধাপে কাজ করত। এভাবেই লিবিয়ায় পাচারকারী সিন্ডিকেটের গুলিতে নিহত ২৬ বাংলাদেশিকে পাঠানো হয়েছিল। তাদের হত্যার ঘটনায় পাচারকারী চক্রের অন্যতম হোতা কামাল হোসেন ওরফে হাজী কামালকে (৫৫) গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। এ সময় তার কাছ থেকে পাসপোর্ট জব্দ করা হয়। তাকে গ্রেফতারের পরই সে সব তথ্য জানতে পেরেছে র‌্যাব। জানা গেছে, কামাল একাই নিহত কয়েকজনকে লিবিয়া পাচার করেছিল।

গতকাল সকালে র‌্যাব-৩ এর একটি দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রাজধানীর শাহজাদপুরের খিলবাড়ীর টেক থেকে তাকে গ্রেফতার করে। তার গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ায়। এ ছাড়াও সে একজন টাইলস্ কনট্রাক্টর। গত ২৮ মে রাত ৯টার দিকে লিবিয়ার মিজদা শহরে ২৬ বাংলাদেশিসহ মোট ৩০ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। হত্যার শিকার বাকিরা আফ্রিকান। গতকাল দুপুরে নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-৩ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল রকিবুল হাসান জানান, কামাল মিথ্যা আশ্বাসে বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রলোভন দেখিয়ে গত ১০ বছর ধরে পাচার করে আসছে। তার চক্রটি তিন ধাপে কাজ করত। বিদেশ যেতে ইচ্ছুক, বাংলাদেশ থেকে লিবিয়া পাঠানো এবং লিবিয়া থেকে ইউরোপে পাঠানো। এ কয়েকটি ধাপে তারা কাজ করত। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, চক্রটির দেশীয় এজেন্টরা প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্বল্প আয়ের মানুষদের অল্প খরচে উন্নত দেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে আকৃষ্ট করত। এ ক্ষেত্রে পাসপোর্ট তৈরি, ভিসা সংগ্রহ, টিকিট কেনা ইত্যাদি কাজ এই সিন্ডিকেটের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন করা হতো। পরে তাদের এককালীন বা ধাপে ধাপে কিস্তি নির্ধারণ করে ইউরোপের পথে পাড়ি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সিন্ডিকেটের সদস্যরা প্রার্থীদের সামর্থ্য অনুযায়ী ধাপ নির্বাচন করত। ইউরোপ যাওয়ার জন্য তারা ৭-৮ লাখ টাকার অধিক অর্থ নিয়ে থাকে। লিবিয়ায় যাওয়ার আগে নিত ৪-৫ লাখ টাকা। যাওয়ার পর আরও আড়াই কিংবা ৩ লাখ টাকা নিত তাদের আত্মীয়দের কাছ থেকে। লিবিয়ায় পাঠানোর ক্ষেত্রে এই চক্রের সদস্যরা বেশ কয়েকটি রুট ব্যবহার করে থাকে। রুটগুলো তারা সুযোগ-সুবিধা অনুযায়ী মাঝে মধ্যে পরিবর্তন অথবা নতুন রুট নির্ধারণ করে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে তারা বাংলাদেশ-কলকাতা-মুম্বাই-দুবাই-মিসর-বেনগাজী-ত্রিপলী এরপর লিবিয়া- এসব রুট ব্যবহার করেছে। দুবাই থেকে বেনগাজীতে পাঠানোর জন্য সেখান থেকে এজেন্টরা ‘মরাকাপা’ নামে একটি ডকুমেন্ট পাঠায়। ওই ডকুমেন্টসহ বিদেশি এজেন্ট তাদেরকে মিসর ট্রানজিট নিয়ে বেনগাজী লিবিয়ায় পাঠায়। বেনগাজীতে বাংলাদেশি এজেন্ট তাদের বেনগাজী থেকে ত্রিপলীতে স্থানান্তর করে। ত্রিপলীতে পৌঁছানোর পর  সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশি কয়েকজন এজেন্ট তাদের গ্রহণ করে। তাদের ত্রিপলীতে বেশ কয়েকদিন অবস্থান করানো হয়। এরপর ত্রিপলীতে অবস্থানকালীন সময়ে এজেন্টদের এ দেশের প্রতিনিধির মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে। টাকা আদায়ের পর ত্রিপলীর বন্দর এলাকায় একটি সিন্ডিকেটের কাছে ইউরোপে পাচারের জন্য হস্তান্তর করা হয়। এ সিন্ডিকেট সমুদ্রপথে অতিক্রম করার জন্য নৌ-যান চালনা এবং দিক নির্ণয়যন্ত্র পরিচালনাসহ আনুষঙ্গিক বিষয়ের ওপর নানা ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। এরপর একটি নির্দিষ্ট দিনে ভোর রাতে একসঙ্গে কয়েকটি নৌযান লিবিয়া হয়ে তিউনেশিয়া উপকূলীয় চ্যানেলের হয়ে ইউরোপের পথে রওনা দেয়। র‌্যাব জানায়, কামাল অবৈধভাবে লিবিয়াতে প্রায় ৪০০ বাংলাদেশিকে পাঠিয়েছে। সে টাইলস শ্রমিকদের লিবিয়ায় গিয়ে প্রতিদিন ৫-৬ হাজার টাকা আয় করার প্রলোভন দেখাত। বলত- লিবিয়াতে টাইলস মিন্ত্রিদের অনেক চাহিদা। 

মাদারীপুরে ৩ মামলা, গ্রেফতার ২ : মাদারীপুর প্রতিনিধি জানান, লিবিয়ায় মানব পাচারের ঘটনায় মাদারীপুরে ৩টি মামলা দায়ের করেছে ৩ নিহতের পরিবার। ৩ মামলায় ১৪জনকে আসামি করা হয়েছে। এই ঘটনায় দুজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। মাদারীপুরের রাজৈরে লিবিয়ায় নিহত জুয়েলের বাবা রাজ্জাক হাওলাদার বাদী হয়ে দালাল জুলহাস সরদারসহ ৪ জনের নামে মানব পাচার আইনে মামলা করেছে রাজৈর থানায়। এছাড়াও রাজৈর থানার বদরপাশা ইউনিয়নের নিহত রহিম খালাসীর ভাই আবু সাইদ খালাসী বাদী হয়ে রাজৈর থানায় আরও একটি মামলা দায়ের করেছে। এই মামলা জুলহাস সরদারসহ ৭জনকে আসামি করা হয়েছে। এদিকে একই ঘটনায় লিবিয়ায় নিহত ও মানব পাচারের শিকার মাদারীপুর সদর উপজেলার দুধখালী ইউনিয়নের মো.শামিমের বাবা আবদুল হালিম মিয়া বাদী হয়ে গত রবিবার মাদারীপুর সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করে। এই মামলায় দালাল নজরুল ইসলামসহ তিনজনকে আসামী করা হয়েছে। এই ঘটনায় রাতেই মামলার আসামী দিনা বেগমকে গ্রেফতার করা হয়েছে। দিনা বেগম মানবপাচার মামলার এজাহারভুক্ত আসামী এবং দালাল নজরুল ইসলামের স্ত্রী। রাজৈর থানার ওসি শওকত জাহান বলেন, মানব পাচারের ঘটনায় রাজৈর থানায় দুটি মামলা দায়ের করেছে নিহতের পরিবার। দালাল জুলহাস দুটি মামলারই আসামি। একটি মামলায় ৭জন ও অপর মামলায় ৪জনকে আসামি করা হয়েছে। এদের মধ্যে জুলহাস করোনা পজেটিভ হওয়ায় পুলিশি হেফাজতে মাদারীপুর সদর  হাসপাতালের আইসোলেশনে ভর্তি রয়েছে। মাদারীপুর সদর থানার ওসি কামরুল ইসলাম মিয়া জানান, মানব পাচারের ঘটনায় মাদারীপুর সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই মামলায় দিনা বেগম নামে এক আসামীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

ভৈরবে আটক বাচ্চু পাঁচ দিনের রিমান্ডে : কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি জানান,  লিবিয়ায় গুলিতে কিশোরগঞ্জের ভৈরবের আরও দুইজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর আগে তারা নিখোঁজের তালিকায় ছিলেন। তারা হলেন শম্ভুপুর গ্রামের মামুন মিয়া (২৬) ও আকবর নগর গ্রামের মাহবুবুর রহমান (২১)। এ নিয়ে এ ঘটনায় ভৈরবের সাতজন নিহত হয়েছেন। ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লুবনা ফারজানা বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, এখন পর্যন্ত নিহত সাতজনের তালিকা পেয়েছি। এ ঘটনায় গত রবিবার নিহত আকাশের বড় ভাই মোবারক হোসেন বাদী হয়ে সাতজনকে আসামি করে মানব পাচার, মুক্তিপণ, মারধর, হত্যাসহ সংশ্লিষ্ট ধারায় একটি মামলাটি দায়ের করেছেন। মামলায় মানবপাচারকারী দালাল ভৈরবের তানজিরুলসহ অজ্ঞাত ৭/৮ জনকে আসামী করা হয়েছে। এদিকে, বিদেশ পাঠানো ও লিবিয়ায় নিহত হওয়ার ঘটনাটি তদন্ত করতে ঢাকা থেকে পরিদর্শক মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে সিআইডির একটি দল শনিবার রাতে ভৈরব থানায় এসে তদন্ত শুরু করেন। এ সময় ভৈরবের শ্রীনগর গ্রামের মানব পাচারকারী দালাল তানজিরুলের বড় ভাই বাচ্চু মিলিটারীকে আটক করে। গতকাল সোমবার তাকে কিশোরগঞ্জ আদালতে হাজির করে সাতদিনের রিমান্ডের আবেদন করলে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রফিকুল বারী পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ভৈরব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহিন মিয়া জানান, লিবিয়ার ঘটনায় মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনের ৬/৭/৮/১০ ধারাসহ ৩২৬/৩০২/৩০৭/৩৪ ধারায় থানায় মামলা হয়েছে। পুলিশের হেড কোয়ার্টার ঘটনাটি সিআইডি, ডিবি, পুলিশসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের দিয়ে মনিটরিং ও তদন্ত করছে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর