শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৩ জুলাই, ২০২০ ০০:১৫

জেকেজির ডা. সাবরিনা গ্রেফতার

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট থেকে সাময়িক বরখাস্ত, স্বাস্থ্য অধিদফতরের ডিজিকে শোকজ, তদন্ত শুরু

নিজস্ব প্রতিবেদক

জেকেজির ডা. সাবরিনা গ্রেফতার
ডা. সাবরিনাকে গতকাল আটক করে পুলিশ -বাংলাদেশ প্রতিদিন

পুলিশের জেরায় ডা. সাবরিনার সাফ জবাব- আমি কখনোই জেকেজি হেলথ কেয়ারের চেয়ারম্যান না। তদন্তকারী পুলিশের তখন পাল্টা প্রশ্ন, কয়েক দিন আগেই তো আপনাকে চেয়ারম্যান পদ থেকে বহিষ্কার করা হলো। তাছাড়া আপনি তিতুমীর কলেজের ঘটনায় দাঁড়িয়ে জেকেজির চেয়ারম্যান হিসেবে কথা বললেন, সেটা কী ছিল? এমন প্রশ্নের জবাবে আটকে যান ডা. সাবরিনা। স্বাস্থ্য অধিদফতরে দাপট নিয়ে চলা এই চিকিৎসকের কণ্ঠ ছোট হয়ে আসে। মাথা নিচু করে থাকে। পুলিশ যা বোঝার বুঝে নেয়। জেরা শেষে পুলিশের এক কর্মকর্তা তাকে বললেন, আপনাকে গ্রেফতার করা হলো।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র এসব তথ্য দিয়ে বলেছে, ডা. সাবরিনার কাছ থেকে জালিয়াতির নানা গল্প শুনে পুলিশ কর্মকর্তারা হতবাক। তাকে আজ আদালতে পাঠিয়ে রিমান্ডের আবেদন করবে পুলিশ।

তেজগাঁও বিভাগীয় উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) কার্যালয়ে গতকাল ডেকে নিয়ে করোনাভাইরাসের সনদ জালিয়াতির বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর অবশেষে গ্রেফতার করা হয় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের আলোচিত চিকিৎসক ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরীকে। গ্রেফতারের পরই তাকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। সরকারি চাকরি করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকা এবং অর্থ আত্মসাতের মতো শাস্তিযোগ্য অপরাধে অভিযুক্ত হওয়ায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তাকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেয়। এর আগে করোনার রিপোর্ট জালিয়াতির কারণে সাবরিনা চৌধুরীর স্বামী জেকেজি হেলথ কেয়ারের প্রধান নির্বাহী আরিফ চৌধুরীসহ ছয়জনকে গ্রেফতার করে ডিএমপির তেজগাঁও ডিভিশন। তারা এখন কারাগারে। পুলিশি তদন্তে তাদের ভুয়া রিপোর্ট প্রদানের সত্যতাও মিলেছে। এমনকি জালিয়াতির কাজে সংশ্লিষ্টতা মিলেছে ডা. সাবরিনা চৌধুরীর।

তেজগাঁও বিভাগীয় উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডা. সাবরিনাকে ডাকা হয়েছিল দুপুরে। কয়েক ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। জিজ্ঞাসাবাদে জেকেজির কর্মকান্ড ও তার কর্মকান্ড নিয়ে আরও কিছু প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। আমরা মনে করি, যে কোম্পানি মানুষের ক্ষতি করছে, যারা করোনা নেগেটিভকে পজিটিভ আর পজিটিভকে নেগেটিভ বানাচ্ছে, মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে, বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করছে- সেই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে আমরা তাকে গ্রেফতার করি। ডিসি বলেন, যেহেতু তিনি (ডা. সাবরিনা) একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, তিনি কোনোভাবেই একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান থাকতে পারেন না। আবার চেয়ারম্যান থাকাকালীন সেই কোম্পানির মুখপাত্র হিসেবে বক্তব্য দিতে পারেন না। তিনি যেহেতু ফেসবুকেও জেকেজির পক্ষে স্টেটমেন্ট দিয়েছেন তাই জেকেজির কর্মকান্ডের দায়-দায়িত্ব তিনি এড়াতে পারেন না। তাকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। ডিসি হারুন বলেন, তার বিরুদ্ধে আমরা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছিলাম। তদন্ত কর্মকর্তা গ্রেফতারের জন্য একটু সময় নিয়েছিলেন। যেহেতু সাবরিনা চৌধুরী একজন ডাক্তার, একজন সরকারি কর্মকর্তা, সে কারণে তাকে গ্রেফতারে একটু বিলম্ব হলো। রবিবার দুপুর সোয়া ১টায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তেজগাঁও বিভাগীয় উপ-পুলিশ (ডিসি) কার্যালয়ে আনা হয়। জিজ্ঞাসাবাদ করেন জেকেজির প্রতারণা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, ডিসিসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। দুই ঘণ্টা পর বিকাল সোয়া ৩টার দিকে তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।

ডা. সাবরিনা চৌধুরী পেশায় একজন হৃদরোগ সার্জন। টেলিভিশনেও পরিচিত মুখ। টকশোতে স্বাস্থ্যবিষয়ক আলোচনায় নিয়মিত অংশ নিতেন। দিতেন সুস্থ থাকার নানা টিপস। সবকিছু ছাড়িয়ে ভয়ঙ্কর এক প্রতারণার অভিযোগে এখন তিনি আলোচনায়। খলনায়ক তার স্বামী আরিফ চৌধুরী। যার চতুর্থ স্ত্রী হিসেবেই সাবরিনা পরিচিত। আরিফের দুই স্ত্রী থাকেন রাশিয়া ও লন্ডনে। আরেক স্ত্রী দেশেই থাকেন। স্ত্রীর অধিকার পাওয়ার জন্য স্বামীর পেছনে হন্যে হয়ে ছুটছেন। এসব বিষয়ে কম যান না সাবরিনাও। আরিফ চৌধুরী তাকে একদিন এক চিকিৎসকের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সময় কাটানো অবস্থায় পেয়েছেন। পরে আরিফের মারধরের শিকার হন ওই চিকিৎসক। এ নিয়ে সাবরিনা শেরেবাংলানগর থানায় একটি জিডি করেছিলেন। এসব নিয়ে সেই সময় আলোচনার কমতি ছিল না। সম্প্রতি এই দম্পতি নতুন করে আলোচনায় এসেছেন। জানা গেছে, জেকেজি হেলথ কেয়ার নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তারা ২৭ হাজার করোনা রোগীর নমুনা সংগ্রহ করে কোনো রকম পরীক্ষা ছাড়াই ১৫ হাজার ৪৬০টি মনগড়া ভুয়া রিপোর্ট দিয়েছেন। বাকি ১১ হাজার ৫৪০টি রিপোর্ট দিয়েছে আইইডিসিআরের মাধ্যমে। জেকেজির গুলশানের অফিস থেকে ১৫ হাজার ৪৬০টি ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে এই দম্পতি হাতিয়ে নিয়েছেন প্রায় ৮ কোটি টাকা। করোনার রিপোর্ট জালিয়াতির কারণে সাবরিনা চৌধুরীর স্বামী আরিফ চৌধুরীসহ ছয়জনকে গ্রেফতার করেছে ডিএমপির তেজগাঁও ডিভিশন। তারা এখন কারাগারে। পুলিশি তদন্তে তাদের ভুয়া রিপোর্ট প্রদানের সত্যতাও মিলেছে। এমনকি জালিয়াতির কাজে সংশ্লিষ্টতা মিলেছে ডা. সাবরিনা চৌধুরীর।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের রেজিস্ট্রার সার্জন হয়েও তিনি একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছিলেন। সরকারি চাকরি করেও তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে প্রভাব খাটিয়ে নিজের প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ ভাগাতেন। এর বাইরে এই দম্পতির বিরুদ্ধে নানা অনৈতিক কর্মকান্ড, মাদকতা, বিশিষ্টজনের নাম ভাঙিয়ে ফায়দা নেওয়া, হুমকি-ধমকি, সন্ত্রাসী বাহিনী লালন-পালনসহ নানা অভিযোগ রয়েছে।

যেভাবে জালিয়াতি ফাঁস : করোনার এই ভুয়া প্রতিবেদন তৈরির বিষয়টি জেকেজির প্রায় সব কর্মীর কাছে ওপেন সিক্রেট ছিল। তারা যাতে বিষয়টি বাইরে প্রকাশ করে না দেন সেজন্য ভিন্ন কৌশল হাতে নেন ডা. সাবরিনা ও তার স্বামী আরিফ। সপ্তাহে ছয় দিন কাজ করার পর একদিন আনন্দ ট্রিপের নামে ঢাকার বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে একজন নারী একজন পুরুষ কর্মীকে আলাদাভাবে পাঠানো হতো। এটার নাম দিয়েছিল ‘হানিমুন ট্রিপ’। এমনকি মহাখালীতে তিতুমীর কলেজের মাঠে জেকেজি যে বুথ স্থাপন করেছিল সেখানে প্রায় প্রতি রাতে মদের পার্টি বসত। জেকেজির কর্মীরা রাতভর সেখানে নাচানাচি করতেন। এ নিয়ে তিতুমীর কলেজের ছাত্রদের সঙ্গে জেকেজির কর্মীদের মারামারির ঘটনা ঘটে। দীর্ঘদিন ধরেই জেকেজিতে চাকরি করতেন তানজিনা পাটোয়ারী নামে এক নার্স ও তার স্বামী হুমায়ুন কবীর। পরীক্ষা ছাড়াই করোনার টেস্ট রিপোর্ট হাজার হাজার মানুষকে দেওয়া হচ্ছে- এটা প্রথমে মেনে নিতে পারেননি তানজিনা। তিনি জেকেজির সব মাঠকর্মীর সমন্বয়কের দায়িত্বে ছিলেন। মাসে তার বেতন ছিল ৩০ হাজার টাকা। তবে এক পর্যায়ে তানজিনা বলেন, ‘স্যাম্পল সংগ্রহের পর যদি এ ধরনের ভুয়া রিপোর্ট তার মাধ্যমে করানো হয়, তাহলে তাকে বেতন বাড়িয়ে দিতে হবে।’ এটা জেকেজির কর্ণধার আরিফ চৌধুরীকে জানিয়ে দেন তানজিনা। বেতন বাড়ানোর কথা শোনার পরপরই জেকেজি থেকে স্বামী হুমায়ুন কবীরসহ তানজিনাকে চাকরিচ্যুত করেন আরিফ চৌধুরী। ওই প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরি হারানোর পর এই দম্পতি নিজেরা পুরনো চুরিবিদ্যা কাজে লাগান। একটি সাইট থেকে আশকোনার বাসায় বসেই তৈরি করতে থাকেন করোনার ভুয়া সনদ। তানজিনা স্যাম্পল সংগ্রহ করতেন আর ঘরে বসে ভুয়া রিপোর্ট তৈরি করতেন তার স্বামী। জেকেজির কাছ থেকে শেখা বিদ্যা কাজে লাগিয়ে এই দম্পতিও লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। মাসখানেকের করোনা বাণিজ্যের টাকায় একটি নতুন প্রাইভেট কার কেনার কথা ভাবছিলেন হুমায়ুন কবীর। পুলিশের হাতে গ্রেফতারের পর নকল সার্টিফিকেট বাণিজ্যের কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন এই দম্পতি। তাদের কাছ থেকেই বেরিয়ে আসে আরিফ চৌধুরী ও তার স্ত্রী ডা. সাবরিনার নাম।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকে শোকজ : ‘মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে স্বাস্থ্য অধিদফতর রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করেছে’ স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে পাঠানো এই সংবাদ বিজ্ঞপ্তির ব্যাখ্যা চেয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। গতকাল এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদের কাছে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উপসচিব শারমিন জাহান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়, বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত স্বাস্থ্য অধিদফতরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির প্রতি মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। ওই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে স্বাস্থ্য অধিদফতর রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করেছে। কোনো হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তির আগে তা সরেজমিন পরিদর্শন করতে হবে। হাসপাতাল পরিচালনার অনুমতি, পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, জনবল ও ল্যাব ফ্যাসিলিটিজ ইত্যাদি বিশ্লেষণ করে উপযুক্ততা বিবেচিত হলেই কভিড-১৯ পরীক্ষা-চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য চুক্তি করা যায়। রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তির আগে কোন বিষয় বিবেচনা করা হয়েছিল, চুক্তি করার পর এসব শর্ত পালনে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল তা জানাতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা বলতে কী বোঝানো হয়েছে তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালককে এ ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর