শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৪ জুলাই, ২০২০ ০০:৩৬

স্বল্প সুদে আরও ২ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ নেবে সরকার

জাপান জার্মানি ফ্রান্স কোরিয়াসহ উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতিশ্রুতি

রুকনুজ্জামান অঞ্জন

‘কভিড-১৯’-এর প্রাদুর্ভাব দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে- এ আশঙ্কা থেকেই গত অর্থবছরে বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে স্বল্প সুদে দ্রুত বাজেট সহায়তা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। সেই উদ্যোগের ফলে গত জুন পর্যন্ত বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিসহ বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার সহায়তা পাওয়া গেছে। এবার উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও দাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে একইভাবে আরও প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, চলতি অর্থবছরে বাজেট সহায়তার অংশ হিসেবে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের জন্য আগেভাগেই কার্যক্রম শুরু হয়েছে। দাতাদের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা চলছে। এরই মধ্যে দেড় বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈদেশিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি মিলেছে। এটি ২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার জন্য আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। প্রতিশ্রুত ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা পাওয়া গেলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরও শক্তিশালী হবে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, প্রতিশ্রুত সহায়তার বেশিরভাগই স্বল্প সুদের নমনীয় ঋণ হিসেবে পাওয়া যাবে, যার সুদের হার সাকুল্যে ২ শতাংশেরও কম। এর মধ্যে জাপানের কাছ থেকে (জাইকা) যেটি পাওয়া যাবে, তার সুদের হার নেই বললেই চলে। এ ছাড়া কিছু পরিমাণ অনুদান রয়েছে বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব ও এডিবির বিকল্প নির্বাহী পরিচালক ড. মাহবুব আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, করোনা সংকটের কারণে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আয়ের যে পরিস্থিতি, তাতে এ ধরনের বাজেটারি সহায়তা যত বেশি পাওয়া যাবে দেশের জন্য ততই লাভ। এক্ষেত্রে সরকারকে প্রকল্পের বাইরে এমন ঋণ নিতে হবে যাতে এ বছরই ছাড় হয়; কারণ প্রকল্প সহায়তা নিলে সেটি ধাপে ধাপে ছাড় করতে অনেক সময় লাগে।

যাদের কাছ থেকে সহায়তা পাওয়া যাবে : এখনো পর্যন্ত সহজ শর্তে যারা বাংলাদেশকে ঋণ ও অনুদান সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তাদের মধ্যে বিশ্বব্যাংক ৫ মিলিয়ন ডলার, এডিবি ৫০০ মিলিয়ন ডলার, এআইআইবি ৩০০ মিলিয়ন ডলার, ফ্রান্স ১৩০ মিলিয়ন ডলার, দক্ষিণ কোরিয়া প্রায় ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দিতে পারে। এ ছাড়া ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ৯০ মিলিয়ন মার্কিন এবং জার্মানি ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ অনুদান পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

যে কারণে স্বল্প সুদে ঋণ : অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ‘কভিড-১৯’ পরবর্তী বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে করোনাভাইরাসের প্রভাব বিবেচনা করেই স্বল্প সুদে বৈদেশিক সহায়তা নেওয়ার বিষয়ে জোরেশোরে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। দুটি উদ্দেশে সরকার এই সহায়তা নেওয়ার বিষয়ে জোর দিচ্ছে। ১. বাংলাদেশের রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে হবে, যাতে চাহিদা বাড়ার পর আমদানিজনিত চাপ বৈদেশিক মুদ্রার মজুদে হঠাৎ কোনো সংকট সৃষ্টি করতে না পারে; ২. এ ছাড়া বাজেট বাস্তবায়নে মধ্যমেয়াদি ঝুঁকি মোকাবিলা। সংশ্লিষ্টরা জানান, গত দুই মাসে রেমিট্যান্স আয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ রেকর্ড পরিমাণ ৩৫ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করার পরও সরকারের মধ্যে উৎকণ্ঠা রয়েছে। কারণ প্রবাসীরা যেভাবে দেশে ফিরে আসছেন, তাতে রেমিট্যান্স আয়ের এই ধারা সামনের দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে কি-না সে বিষয়ে নিশ্চিত নয় সরকার। এ ছাড়া এবার রমজান মাস অতিবাহিত হয়েছে পুরো লকডাউনের সময়। কিন্তু আগেভাগেই ব্যবসায়ীরা পণ্য আমদানি করায়, লকডাউনকালে সবকিছু বন্ধ থাকার পরও পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক ছিল। তবে বিশ্ব পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ছে। এ বছর চাল আমদানির বিষয়েও সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে বাড়তি আমদানি ব্যয় মেটাতে গিয়ে যাতে রিজার্ভে চাপ না পড়ে সেদিকে লক্ষ্য রেখেই দাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে স্বল্প সুদে এই বাজেট সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।

সংস্কারের অনেক শর্ত পূরণ হয়নি : বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সরকারের বাজেটে বৈদেশিক ঋণের টার্গেট দেওয়া আছে প্রায় ৯ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে আগে গৃহীত ঋণের আসল ফেরত দিতে হবে আরও প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার। ফলে নিট বৈদেশিক সহায়তার প্রয়োজন পড়বে মোট সাড়ে ১১ বিলিয়ন ডলার। এক্ষেত্রে পাইপলাইনে আছে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে থেকে সাড়ে ৭ বিলিয়ন ডলার হয়তো এ বছর পাওয়া যেতে পারে। বাকি ২ বিলিয়ন ডলার দ্রুত বাজেটারি সহায়তা নিলেও নিট বৈদেশিক সহায়তা আরও প্রায় ১ থেকে দেড় বিলিয়ন ডলার ঘাটতি থাকবে। বৈদেশিক সহায়তার এই ঘাটতি পূরণ করতে হলে অনেক খাতে সংস্কারের শর্ত রয়েছে যেগুলো পূরণ করতে হবে সরকারের। বিশ্বব্যাংকের সাবেক এই অর্থনীতিবিদ উদাহরণ দিয়ে বলেন, কর্মসংস্থানের ওপর উন্নয়ন সহায়তা (ডিপিসি) হিসেবে গত অর্থবছরে দুটো কিস্তি ছাড় করেছে বিশ্বব্যাংক। তৃতীয় কিস্তির ২৫০ মিলিয়ন ডলার নিতে হলে অনেক সংস্কার কার্যক্রম আছে, যেটি বাস্তবায়ন করতে হবে। বিশেষ করে জাতীয় সংসদে শুল্ক আইন ও কোম্পানি আইন পাস, ইজি অব ওয়ান স্টপ সার্ভিস দেওয়ার যে ৫৪টি প্রক্রিয়া রয়েছে সেটি সহজীকরণ, ডে কেয়ার আইন, ন্যাশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট-এর সংঘবিধি কার্যকর করার বিষয়গুলো এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর