শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ২৩:১৩

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতে পরিস্থিতি পর্যালোচনার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

নিজস্ব প্রতিবেদক

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতে পরিস্থিতি পর্যালোচনার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

বন্ধ থাকা সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার ব্যাপারে পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল মন্ত্রিসভার বৈঠকে তিনি এ নির্দেশ দেন। বৈঠক শেষে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি ভার্চুয়ালি বৈঠকে সংযুক্ত হন। 

এদিকে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাঙালির জীবনে যদি ১৫ আগস্ট না আসত, তবে বাংলাদেশ অনেক আগেই উন্নত-সমৃদ্ধশালী হিসেবে গড়ে উঠত। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা-পরবর্তী দীর্ঘ সময় স্বাধীনতাবিরোধী, গণহত্যাসহ বঙ্গবন্ধুর খুনিরাই মূলত ক্ষমতায় ছিল। তারা দেশের জনগণের ভাগ্যে পরিবর্তন নয়, বরং নিজেদের ভাগ্য গড়তেই ব্যস্ত ছিল। তারা দেশকে সামনে নয়, অনেক পেছনের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। গতকাল বিকালে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তিনি সভায় যুক্ত হন। 

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, দেশের প্রতিটি অর্জনেই বাঙালি জাতিকে সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ করতে হয়েছে। কিন্তু শহীদের রক্ত কখনো বৃথা যায় না, যেতে পারে না। আমরা তা হতে দেব না। স্বাধীনতার সুফল আমরা প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে দেব। দেশকে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত, প্রত্যেক মানুষের জীবনকে উন্নত ও অর্থবহ করব- একটি মানুষ ঠিকানাহীন থাকবে না, প্রত্যেকের ঘরে আলো জ্বালব- এটাই হচ্ছে আমাদের অঙ্গীকার। প্রধানমন্ত্রী এ সময় ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর  বিরুদ্ধে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা স্পেশাল ব্রাঞ্চের লেখা রিপোর্ট নিয়ে প্রকাশিত মহামূল্যবান গ্রন্থগুলো সবাইকে পড়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এটা বঙ্গবন্ধুর পক্ষে নয়, বিরুদ্ধে লেখা সব রিপোর্ট। পৃথিবীর কোনো দেশের কোনো নেতার বিরুদ্ধে ৪৬টি ফাইলে প্রায় ৪৬ হাজার পৃষ্ঠাব্যাপী কোনো রিপোর্ট লেখার ইতিহাস কোথাও নেই। মাতৃভাষার জন্য বঙ্গবন্ধু কী কী করেছিলেন, কীভাবে ভাষা-সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তুলেছিলেন, আর এই সংগ্রাম করতে গিয়ে বারবার গ্রেফতার হন- এসব রিপোর্ট থেকেই সত্য ইতিহাসের মহামূল্যবান তথ্য সবাই জানতে পারবেন। আর যারা ভাষা নিয়ে গবেষণা করছেন তাদেরও এই রিপোর্টগুলো অনেক সহায়ক হবে। প্রধানমন্ত্রী ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চলমান মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনের কথা উল্লেখ করে বলেন, এ দুটি ঐতিহাসিক দিবস উপলক্ষে আমরা ব্যাপক কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নিলেও করোনার কারণে তা পালন কতে পারছি না। তবে আমরা এ দুটি দিবসকে সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে দেশের একটি মানুষও গৃহহীন, ভূমিহীন বা ঠিকানাহীন থাকবে না। সবার জন্য আমরা একটি ঠিকানা করে দেব, ঘর নির্মাণ করে দেব। একই সঙ্গে দেশের প্রতিটি মানুষের ঘরে আলো জ্বালব, বিদ্যুৎ পৌঁছে দেব। দেশের মানুষকে করোনাভাইরাসের টিকা গ্রহণ এবং টিকা গ্রহণের পরও স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিধি মেনে চলার অনুরোধ জানিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, পৃথিবীর অনেক দেশ এখনো করোনার ভ্যাকসিন পায়নি। আমরা আগাম ব্যবস্থা নিয়েছিলাম বলেই টিকা আনতে পেরেছি এবং মানুষ এ টিকা গ্রহণ করছেন। এই করোনাভাইরাস কত দিন থাকবে এবং টিকার কার্যকারিতা কত দিন থাকবে- তা নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে। তাই সবার প্রতি অনুরোধ, স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিধি মেনে চলুন, সবাই মাস্ক পরবেন এবং ঘন ঘন সাবান দিয়ে হাত ধোবেন। ইনশাআল্লাহ, এই মহামারী থেকেও আমরা মুক্তি পাব।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা জনগণের কল্যাণে রাজনীতি করি বলেই এত বিপুলসংখ্যক ভূমিহীন-গৃহহীন মানুষকে আমরা ঘর তৈরি করে দিয়েছি। দেশের সবচেয়ে অবহেলিত কামার-কুমার-জেলে, বেদে-হিজড়া, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, কুষ্ঠরোগীসহ সর্বস্তরের অসহায় মানুষকে আমরা পুনর্বাসন করে যাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয় প্রান্তে সূচনা বক্তব্য দেন দলের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। আরও বক্তব্য রাখেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক মন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক সিরাজুল মোস্তফা, সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, মহিলা বিষয়ক সম্পাদক মেহের আফরোজ চুমকি, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু আহমেদ মন্নাফী ও উত্তরের সভাপতি শেখ বজলুর রহমান। গণভবন প্রান্ত থেকে আলোচনা সভা পরিচালনা করেন দলের কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ। অনুষ্ঠানের শুরুতেই ভাষাশহীদ থেকে শুরু করে একাত্তর ও ১৫ আগস্টের সব শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

মন্ত্রিসভার বৈঠক : মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানান, করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন উৎপাদন আরও সহজভাবে করা যাবে বাংলাদেশে। দেশে ভ্যাকসিন উৎপাদন ও ভ্যাকসিন সম্পর্কিত গবেষণা, প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা পেতে আন্তর্জাতিক ভ্যাকসিন ইনস্টিটিউট (আইভিআই) প্রতিষ্ঠার চুক্তি অনুসমর্থনের প্রস্তাবে সায় দিয়েছে মন্ত্রিসভা। মন্ত্রিসভায় অনির্ধারিত আলোচনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে কি না, তা পর্যালোচনা করার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, আগামী পাঁচ থেকে ছয় দিনের মধ্যেই আন্তমন্ত্রণালয় সভা করে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার আগে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের করোনাভাইরাসের টিকা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। গত বছরের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী পাওয়ার কথা ঘোষণা করে সরকার। এরপর ১৭ মার্চ থেকে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি চলছে। আইভিআই চুক্তি অনুসমর্থনের বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব আরও জানান, ১৯৯৬ সালের ২৮ অক্টোবর ইউনাইটেড নেশন ডেভেলপমেন্টের প্রোগ্রামের উদ্যোগে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে একটি আন্তর্জাতিক ভ্যাকসিন ইনস্টিটিউটের চুক্তি হয়েছিল। সেই চুক্তিতে বাংলাদেশ স্বাক্ষরকারী দেশ। তবে পূর্ণ্য সদস্যের জন্য বাংলাদেশের মন্ত্রিসভার অনুমোদনের দরকার ছিল, সেটা হয়েছে। খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, এর মাধ্যমে ভ্যাকসিন উৎপাদন এবং এ সম্পর্কিত গবেষণা কাজে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা পাওয়া যাবে। এতে দেশের ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী সংস্থাগুলোর সক্ষমতাও বাড়বে। ভ্যাকসিন উৎপাদন প্রয়োগ ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও যুগোপযোগী হবে। কম দামে ভ্যাকসিন পাওয়া যাবে। আর ভ্যাকসিনের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যোগ্যতা অর্জনের পথও আমাদের সুগম হবে, যা বিদেশে বাংলাদেশের ভ্যাকসিনের বাজার সম্প্রসারণে সহায়ক হবে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, আমাদের ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মান বিশ্বে প্রমাণিত। আমরা আশা করছি, খুব দ্রুত এগুলো অর্জন করতে পারব। এ সময় বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান গ্লোব বায়োটেকের ভ্যাকসিন তৈরির বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, গ্লোব বায়োটেক এখনো ট্রায়াল শেষ করেনি। এ বিষয়েও আলোচনা হয়েছে কেবিনেটে। তারা যদি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রটোকল মেনে করতে পারে তাহলে সমস্যা নেই।

পেটেন্ট আইন : পেটেন্ট (স্বত্ব) না মানার শাস্তি বাড়িয়ে ‘বাংলাদেশ পেটেন্ট আইন, ২০২১’ এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে গতকালের মন্ত্রিসভা। খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম জানান, ১৯১১ সালের পেটেন্ট ও ডিজাইন আইন দিয়ে এতদিন চলছিল। ২০১৬ সালে এই আইনটিকে দুই ভাগ করে একটা পেটেন্ট আইন, আরেকটি ডিজাইন আইনের খসড়া করা হয়। খসড়া আইন অনুযায়ী, পেটেন্ট মালিক ২০ বছরের জন্য পেটেন্ট রাইট পাবেন। ২০ বছর পর এটা পাবলিক সম্পদ হয়ে যাবে। খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, এই আইনের আদেশ পালনে কেউ ব্যর্থ হলে ২০ থেকে ৮০ হাজার টাকার ক্ষতিপূরণ প্রস্তাব করা হয়েছিল। এটাকে ৫ লাখ থেকে ১০ লাখে উন্নীত করে দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ শিল্প-নকশা আইন : গতকালের বৈঠকে ‘বাংলাদেশ শিল্প-নকশা আইন, ২০২১’ এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, আগের আইনের অধীনে ডিজাইন এবং ট্রেডমার্কস রেজিস্ট্রার অধিদফতর ছিল, সেটা বহাল থাকবে। এই অধিদফতরের অধীনে একটি শিল্প ইউনিট থাকবে। এই আইনের অধীনে শিল্প-নকশা নিবন্ধন সংক্রান্ত সব কার্যক্রম সম্পন্ন হবে। তিনি বলেন, আইনের অধীনে বিধি দিয়ে নির্ধারিত পদ্ধতিতে এবং ফি প্রদান সাপেক্ষে শিল্প-নকশার নিবন্ধনের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর। কারও যদি এক্সক্লুসিভ এক্সট্রা অর্ডিনারি কোনো রকম থাকে তাহলে সে দরখাস্ত দিলে তাকে আরও পাঁচ বছরের জন্য মেয়াদ বাড়ানো হবে। এ ছাড়া গতকালের মন্ত্রিসভায় জাতীয় আর্কাইভস আইন-২০২১-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে।


আপনার মন্তব্য