শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ২১ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২০ মার্চ, ২০২১ ২৩:০৪

খরচ কমাতে কম প্রোটিনযুক্ত গম আমদানি করছে সরকার

মানিক মুনতাসির

সহজে প্রাপ্তি এবং কিছুটা খরচ কমাতে তুলনামূলক কম প্রোটিনযুক্ত গম আমদানি করছে সরকার। আড়াই লাখ মেট্রিক টন গম আমদানি করা হচ্ছে। এতে সরকারের প্রতি টনে ব্যয় কমবে ৩ থেকে ৬ মার্কিন ডলার। পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অনুসৃত নির্দেশনা অনুযায়ী সাধারণত ১২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রোটিনযুক্ত গম আমদানি করা হয়। যা মানবদেহের জন্য উপযুক্ত পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ। তবে করোনা পরিস্থিতির কারণে যেহেতু আন্তর্জাতিক বাজারে গমসহ খাদ্যপণ্যের প্রাপ্যতার কিছুটা সংকট রয়েছে সেজন্য ১১ শতাংশ প্রোটিনযুক্ত গম আমদানির সুপারিশ করেছে এ সংক্রান্ত টেকনিক্যাল কমিটি। কিন্তু সেখান থেকে আরও দশমিক ৫ শতাংশ কম প্রোটিনযুক্ত গম আমদানি করা হচ্ছে। অর্থাৎ সরকার আড়াই লাখ টন আমদানি করছে যার মধ্যে প্রোটিনের মাত্রা ১০ দশমিক ৫ শতাংশ। এখানে সরকারের যুক্তি হলো প্রাপ্তি সহজ হবে এবং খরচ কম পড়বে টন প্রতি ৩ থেকে ৬ মার্কিন ডলার। এই গম সাধারণত টিআর, কাবিখাসহ বিভিন্ন রকম সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বিক্রি নিম্ন আয়ের মানুষের মাঝে সরবরাহ করে সরকার। গত ১১ জানুয়ারি খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের সভার কার্যপত্র ঘেঁটে এসব তথ্য জানা গেছে। কার্যপত্রের একটি কপি গত ৮ মার্চ অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট শাখায় পাঠানো হয়েছে।

জানা গেছে, গত বছরের শুরুতে রাশিয়া থেকে ৪ লাখ মে. টন গম আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করেছিল সরকার। তখনই ২ লাখ টন গম দেশে আসে। কিন্তু বছরের প্রথমার্ধে বিশ্বব্যাপী কভিড-১৯-এর আতঙ্ক শুরু হলে থেমে যায় রাশিয়া থেকে গম আমদানি প্রক্রিয়া। সে দেশের সরকার গম ও খাদ্য রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞাও জারি করে। ফলে বাকি গম আর আমদানি করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে সারাবিশ্বেই করোনা মহামারী ছড়িয়ে পড়লে প্রত্যেক দেশই খাদ্য সংকটের আশঙ্কায় খাদ্য মজুদ শুরু করে। যার জেরে বাংলাদেশও মজুদ বাড়াতে থাকে। এর অংশ হিসেবে বিশ্ববাজার থেকে আমদানি সহজ করতে বা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে ও আমদানি খরচ কিছুটা কমাতে বিকল্প বাজার বা বিভিন্ন দেশ থেকে গম আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে আর্জেন্টিনা থেকে দেড় লাখ টন ও রাশিয়া থেকে এক লাখ টন গম আমদানির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়। আর্জেন্টিনা থেকে যেসব গম আসবে তার মধ্যে ২৫ হাজার টনের একটি জাহাজ আজ ২১ মার্চ চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করার কথা রয়েছে। বাকি আরও পাঁচটি জাহাজ এ মাসের মধ্যেই বন্দরে এসে পৌঁছাবে বলে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানিয়েছেন খাদ্য সচিব ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম। বাকি এক লাখ টন গমও দ্রুততম সময়ের মধ্যে রাশিয়া থেকে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এই উভয় দেশ থেকে যে আড়াই লাখ টন গম আসার কথা সেগুলোতে প্রোটিনের পরিমাণ ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ। যা খেলে মানব দেহের জন্য পুষ্টিগুণের তেমন কোনো তারতম্য হবে না বলে মনে করেন খাদ্য সচিব। তিনি আরও বলেন, আমরা কিন্তু খারাপ গম আমদানি করছি না। শুধু প্রোটিনের কিছুটা তারতম্য হচ্ছে। ভারত ও পাঞ্জাবে এর চেয়েও পুষ্টিগুণের গম পাওয়া যায়, আমরা কিন্তু সেটা আনছি না। তারা আমাদেরকে চিঠিও লেখে। কিন্তু আমরা সেটা নিচ্ছি না। তবে কম প্রোটিনযুক্ত গম আমদানির ব্যাপারে পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. নাজমা শাহীন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, কম প্রোটিনযুুক্ত গম গরম আবহাওয়ায় সংরক্ষণ করা হলে ময়েশ্চার বা আর্দ্রতা বেড়ে যাবে। যা টক্সিন বাড়াবে। এতে ক্যান্সারের জীবাণু পর্যন্ত বহন করতে পারে। ফলে প্রোটিন কমালেও ময়েশ্চার যেন না বাড়ে তা নিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যাপারে আমাদের কাছে জানতেও চেয়েছিল সরকার। আমরা বলেছি, আমাদের দেশে যেসব গম উৎপাদন হয় সেগুলোর ১৮টি নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে তাতে ১১ দশমিক ২ শতাংশ প্রোটিন থাকে। আর আমদানির ব্যাপারেও আমরা বলেছি ১১ শতাংশ প্রোটিনযুক্ত গম কেনা যেতে পারে। এটা খেলে মানব দেহের পুষ্টির তেমন কোনো তারতম্য হবে না। এর বড় কারণ হলো আমাদের এখন প্রাণিজ প্রোটিন গ্রহণের মাত্রা অনেক বেশি। ফলে গমের মধ্যে প্রোটিন কম থাকলেও তেমন কোনো ক্ষতি হবে না। তবে সরকার এখানে আরও দশমিক ৫ শতাংশ প্রোটিন মাত্রা কমিয়েছে এটা অবশ্য আমি জানি না। কেননা আমরা মতামত দিয়েছি ১১ শতাংশ প্রোটিনযুক্ত গম আমদানি করা যেতে পারে। নাজমা শাহীন আরও বলেন, এই গম আমদানির পর সরকারি সাইলোতে সংরক্ষণ করা হলে কিছুটা ময়েশ্চার নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু এটা বেসরকারি খাতের ডিলারসহ সংশ্লিষ্টদের হাতে চলে গেলে তারা কীভাবে সংরক্ষণ করেন। সেখানে আর্দ্রতা কেমন থাকে। তাতে ময়েশ্চার বেড়ে যায় কিনা-সেগুলো দেখার মতো কেউ থাকে না। এমনকি ময়েশ্চার বেড়ে গেলে ফাঙ্গাস পড়ে যায়। এতে গমের মধ্যে টক্সিনের পরিমাণ বেড়ে যায়। যা ক্যান্সারের জীবাণু পর্যন্ত বহন করতে পারে। এটা অবশ্যই জনস্বাস্থ্যের জন্য হানিকর। তবে ১১ শতাংশ প্রোটিনযুক্ত গম মানব দেহের জন্য উপযুক্ত পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ।