শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ২০ জুন, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৯ জুন, ২০২১ ২৩:১৪

মা বাবা বোনকে হত্যার পর ৯৯৯-এ ঘাতকের কল

দ্রুত আসুন নইলে স্বামী সন্তানকেও মেরে ফেলব

নিজস্ব প্রতিবেদক

Google News

জাতীয় জরুরি সেবা ট্রিপল নাইনে (৯৯৯) ফোন করে মেহজাবিন মুন বলেন, ‘আমি আমার বাবা, মা আর ছোট বোনকে মেরে ফেলেছি। আপনারা দ্রুত আসুন। নইলে আমার স্বামী-সন্তানকেও মেরে ফেলব।’ গতকাল সকালে এমন খবর পেয়ে পুলিশের দল ছুটে যায় রাজধানীর কদমতলীতে। জুরাইন লাল মিয়া সরদার রোডের মুরাদপুর আদর্শ স্কুলের পাশের বাসা থেকে মেহজাবিনের বাবা, মা ও বোনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পাশাপাশি ওই বাসা থেকে মেহজাবিনের স্বামী ও মেয়েকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। ট্রিপল নাইনে ফোন কলার মেহজাবিন মুনকে ওই বাসা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

নিহতরা হলেন- মেহজাবিনের বাবা মাসুদ রানা (৫০), মা জোসনা ওরফে মৌসুমী ইসলাম (৪৫) ও ছোট বোন জান্নাতুল ইসলাম (১৮)। পরে তাদের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। অসুস্থ অবস্থায় মেহজাবিনের স্বামী শফিকুল ইসলাম এবং তাদের পাঁচ বছরের মেয়ে মারজান তাবাসসুম ইফতিয়াকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

পুলিশ বলছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মেহজাবিন খুনের ঘটনা স্বীকার করেছেন। পরিবারের প্রতি ক্ষোভ থেকে সবাইকে চায়ের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করেন মেহজাবিন। পরে হাত-পা বেঁধে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। তবে কী কারণে এই ট্রিপল খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে তা অনুসন্ধানে পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা পুলিশ, সিআইডির ক্রাইম সিন টিম এবং র‌্যাব সদস্যরা কাজ করছেন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মেহজাবিনের স্বামী শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমার বাসা কদমতলীর বাগানবাড়ীতে। শুক্রবার রাতে আমার শ্বশুরবাড়ি মুরাদপুর হাইস্কুল রোডে যাই। একটি বাড়ির দ্বিতীয় তলায় থাকতেন শ্বশুর-শাশুড়িসহ তাদের পরিবার। আমার স্ত্রী মেহজাবিনের সঙ্গে বেশ কিছুদিন ধরে তাদের বিরোধ চলছিল। এরই জের ধরে মেহজাবিন সবাইকে খাবারের মধ্যে চেতনানাশক কোনো ওষুধ খাওয়ায়।’

নিহত মৌসুমী ইসলামের বড় বোন জাহানারা বলেন, ‘মেহজাবিনের ছোট বোন জান্নাতুল ইসলামের সঙ্গে তার স্বামী শফিকুলের পরকীয়ার সম্পর্ক ছিল। এ জন্য তাদের পরিবারে ঝগড়া হতো। তবে ঘটনার দিন কী ঘটেছিল, তা আমি জানি না। আমাদের ধারণা, পরকীয়া সম্পর্কের কারণেই এ ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।’ এ জন্য শফিকুলকেই দায়ী করেন ওই পরিবারের স্বজনরা। ডিএমপির ওয়ারী বিভাগের ডিসি শাহ ইফতেখার আহমেদ বলেন, শুক্রবার রাতের যে কোনো সময় খাবারের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দিয়ে অচেতন করে হাত-পা বেঁধে শ্বাসরোধ করে নিজের বাবা, মা ও ছোট বোনকে হত্যা করেছেন মেহজাবিন। সকালে খুনি মেহজাবিন নিজেই ট্রিপল নাইনে ফোন করে পুলিশকে জানান। তিনি বলেন, ‘মেহজাবিনের বাবা মাসুদ রানা মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি বিয়ে করেছেন। বোনের সঙ্গে স্বামীর অনৈতিক সম্পর্ক আর বাবার বিয়ে- এসব মিলিয়ে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ থেকে পরিবারের সবাইকে হত্যার পরিকল্পনা করেন মেহজাবিন।’ তবে মেহজাবিনের একার পক্ষে এ ঘটনা ঘটানো কতটুকু সম্ভব এ নিয়ে পুলিশের মধ্যে সন্দেহ দেখা দিয়েছে।

নিহতদের স্বজন ও স্থানীয়রা বলেন, নিহত মাসুদ রানা কয়েক বছর সৌদিতে ছিলেন। বছরখানেক হলো দেশে ফিরেছেন। অন্যদিকে ছয় বছর আগে মেহজাবিন মুন ও শফিকুল ইসলামের বিয়ে হয়। এরপর বিয়ে মেনে না নেওয়ায় মেহজাবিনের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু বছরখানেক হলো মেহজাবিনের বিয়ে মেনে নেয় পরিবার। এতেই বাধে বিপত্তি। মেহজাবিনের চাচাতো বোন শিলা বলেন, ‘মেহজাবিন তার পরিবারের সবাইকে শেষ করে দিতে চেয়েছিল।’ তিনি বলেন, ‘দুই দিন আগে স্বামী-সন্তানকে নিয়ে মায়ের বাড়িতে বেড়াতে আসে মেহজাবিন। এসেই ছোট বোন জান্নাতুলের সঙ্গে তার স্বামীর পরকীয়া রয়েছে বলে বাবা-মার কাছে অভিযোগ করে। এ নিয়ে অনেক কথা কাটাকাটি হয়। এর জেরেই হয়তো সে এ হত্যার ঘটনা ঘটিয়েছে।’ এ ছাড়া প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, জায়গা-সম্পত্তি নিয়েও পরিবারের সঙ্গে বিরোধ ছিল মেহজাবিনের। সম্পত্তি লিখে দেওয়ার জন্য বাবা-মাকে চাপ দিতেন মেহজাবিন। এ নিয়ে এর আগে সালিশ বৈঠকও হয়েছে। কদমতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল উদ্দিন মীর বলেন, ‘মেহজাবিনের স্বামীকেও আমরা সন্দেহের বাইরে রাখছি না। তাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। সম্পত্তির বিষয়ও এখানে রয়েছে।’ ঘটনাস্থল থেকে ট্রিপল মার্ডারের বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছেন সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটের সদস্যরা। এ ঘটনায় কদমতলী থানায় হত্যা মামলার প্রস্তুতি চলছে।