শনিবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ টা
পেটের কাটা দাগে শনাক্ত

মণ্ডপে কোরআন রাখার কথা স্বীকার করলেন ইকবাল

মহিউদ্দিন মোল্লা, কুমিল্লা

মণ্ডপে কোরআন রাখার কথা স্বীকার করলেন ইকবাল

কুমিল্লার নানুয়ার দীঘির পাড়ের পূজামন্ডপে পবিত্র কোরআন রাখার ঘটনায় অভিযুক্তকে শনাক্ত করা হয় পেটের কাটা দাগ দেখে। কক্সবাজার পুলিশ ভিডিও কলে কুমিল্লা জেলা পুলিশের মাধ্যমে ইকবালকে তার মাকে দেখায়। তার মা ইকবালকে শনাক্তের পাশাপশি জানিয়েছেন, তার পেটে কাটা দাগ রয়েছে। পুলিশ পেটের কাটা দাগকেও গুরুত্ব দেয়। এদিকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মন্ডপে কোরআন রাখার কথা স্বীকার করেছেন আটক ইকবাল হোসেন। গতকাল বিকালে তাকে কুমিল্লা পুলিশ লাইন্সে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, মন্ডপে কোরআন শরিফ রাখার পর হনুমানের মূর্তি থেকে গদা সরিয়ে নেওয়ার কথাও পুলিশকে জানিয়েছেন ইকবাল। তবে কার নির্দেশে এই কাজ করেছেন, তা এখনো জানাননি। গ্রেফতারের পর থেকেই ইকবাল অসংলগ্ন আচরণ করছেন। ৩০ বছর বয়সী ইকবাল কুমিল্লা নগরীর ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের দ্বিতীয় মুরাদপুর-লস্করপুকুর এলাকার  নূর আহম্মদ আলমের ছেলে। ইকবালের মায়ের নাম বিবি আমেনা বেগম। তিনি জানান, তার তিন ছেলে ও দুই মেয়ে। ইকবাল সবার বড়।

ইকবালের মা আমেনা বেগম জানান, ইকবাল ১৫ বছর বয়স থেকেই নেশা করা শুরু করে। ১০ বছর আগে বিয়ে করে জেলার বরুড়া উপজেলায়। সেই সংসারে তার এক ছেলের জন্ম হয়। পাঁচ বছর পরে স্ত্রীর সঙ্গে ডিভোর্স হয়ে যায় ইকবালের। এরপর ইকবাল জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মিয়া বাজার এলাকার কাদৈর গ্রামে বিয়ে করে। এই সংসারে তার এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। ইকবালের স্ত্রী সন্তান এখন কাদৈর গ্রামে থাকে। ইকবালের মা আমেনা বেগম আরও জানান, ইকবাল নেশাগ্রস্ত হয়ে নানাভাবে পরিবারের সদস্যদের ওপর অত্যাচার করত। ইকবাল মাজারে মাজারে থাকতে পছন্দ করত। বিভিন্ন সময় আখাউড়া মাজারে যেত। কুমিল্লার বিভিন্ন মাজারেও তার যাতায়াত ছিল। ইকবাল পঞ্চম শ্রেণি পাস। ১০ বছর আগে বন্ধুদের নিয়ে অন্যপাড়ার আরও কিছু ছেলের সঙ্গে মারামারি হয়। এ সময় প্রতিপক্ষ ইকবালকে পেটে ছুরিকাঘাত করে। তখন ইকবালের প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়।

ইকবালের মা বলেন, তারপর থেকেই অপ্রকৃতিস্থ ইকবাল। তার চলাফেরার কারণে বিভিন্ন সময় চোরের অপবাদে তাকে স্থানীয়রা মারধর করত বলেও তিনি আক্ষেপ করেন। তিনি বলেন, তার ছেলে যে অন্যায় করেছে যদি তা সত্য হয় তাহলে যেন তার শাস্তি হয়। তবে ইকবালের মা আমেনা বেগম ও তার ছোট ভাই রায়হান বলেন, ইকবাল কারও প্ররোচনায় এমন কাজ করতে পারে।

১৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলের সৈয়দ সোহেল জানান, গত ১০ বছর ধরে তিনি ইকবালকে চেনেন। ইকবাল রঙের কাজ করত। মাঝে মাঝে নির্মাণ কাজের সহযোগী হিসেবেও কাজ করত। ইকবাল ইয়াবা সেবন করত। এ নিয়ে ইকবালের বিষয়ে অনেক দেনদরবার করতে হতো। তবে কাউন্সিলর সোহেলের দৃঢ় বিশ্বাস ইকবালের মানসিক অসুস্থতা কাজে লাগিয়ে তৃতীয় পক্ষ কাজটি করেছে।

কয়েকটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র মন্ডপে কোরআন রাখতে ইকবালকে কাজে লাগিয়েছে। নানুয়ার দীঘির পাড়ের পূজামন্ডপটিই ছিল তাদের লক্ষ্য। তবে ইকবাল যখন মসজিদ থেকে কোরআন নিয়ে সেখানে যান, তখন মন্ডপ পুরোপুরি জনশূন্য হয়নি। এ জন্য তিনি চলে যান মন্ডপ থেকে কিছুটা দূরের গুপ্ত জগন্নাথ মন্দিরে। ওই মন্দিরটির গেটের তালা ভাঙতে তিনি একটি লাঠিও জোগাড় করেন। তবে সেটি তালা ভাঙার মতো মজবুত না হওয়ায় ব্যর্থ হন ইকবাল। এরপর আবার নানুয়ার দীঘির পাড়ের পূজামন্ডপে যান। এদিকে কুমিল্লার সচেতন নাগরিক কমিটির সাবেক সভাপতি বদরুল হুদা জেনু বলেন, ইকবালকে কে প্ররোচনা দিয়েছে তাকে খুঁজে বের করতে হবে। মূল হোতা বের হলে আইনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা বাড়বে। কুমিল্লা মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অচিন্ত্য দাস টিটু বলেন, আমরা প্রথম থেকে দাবি করছি, এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে। তার সঙ্গে মূল হোতাদেরও খুঁজে বের করতে হবে।

কক্সবাজার থেকে ইকবাল কুমিল্লায় : কক্সবাজার থেকে গ্রেফতার করে কুমিল্লা পুলিশ লাইন্সে নেওয়ার পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক ইউনিট। এর আগে গতকাল দুপুর ১২টার দিকে ইকবালকে বহন করা পুলিশের গাড়ি কুমিল্লা পুলিশ লাইন্সে পৌঁছায়। ভোর সাড়ে ৬টার দিকে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার কার্যালয় থেকে তাকে নিয়ে আসা হয় কুমিল্লায়। এরপর সাড়ে ১২টায় তাকে পুলিশ লাইন্সে হেলমেট ও বুলেট প্রুফ জ্যাকেট পরা অবস্থায় সাংবাদিকদের সামনে উপস্থিত করা হয়। বৃহস্পতিবার রাতে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত এলাকায় ঘোরাফেরা করার সময় ইকবাল হোসেনকে কক্সবাজার জেলা পুলিশের একটি দল আটক করে। এর আগে কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. সোহান সরকারের নেতৃত্বে তাকে আনতে কক্সবাজার যায় পুলিশ। নানুয়ার দীঘির পাড়ের অস্থায়ী পূজামন্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ রাখার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত সেই ইকবালকে ঘটনার পর থেকে হন্যে হয়ে খুঁজছিল পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. ফারুক আহমেদ বলেন, ইকবালকে কুমিল্লায় আনা হয়েছে। তাকে ঘটনার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

 আমরা সিসিটিভিতে যে ইকবালকে শনাক্ত করে ছিলাম এই সেই ইকবাল।

উল্লেখ্য, গত ১৩ অক্টোবর কুমিল্লা নগরীর নানুয়ার দীঘির পাড়ের একটি অস্থায়ী মন্ডপে হনুমানের মূর্তির কোলের ওপর কোরআন শরিফ পাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সারা দেশে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

সর্বশেষ খবর