ভয়াবহ ভূমিকম্পে মুহূর্তেই ধসে পড়ে বহুতল ভবন। কংক্রিটের স্তূপের নিচে আটকা পড়েন এক মা ও তার মাত্র ১৮ দিন বয়সী নবজাতক। মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ের সেই দীর্ঘ সময়জুড়ে সন্তানকে আঁকড়ে ধরেই বেঁচে থাকার শক্তি খুঁজে পান তিনি। অবশেষে জটিল উদ্ধার অভিযানে জীবিত বেরিয়ে আসেন দুইজনই। ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত বাড়ির ধ্বংসস্তূপ থেকে ১৮ দিন বয়সী সন্তানসহ বেঁচে ফেরা এক মা বর্ণনা করেছেন তার বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতা।
উদ্ধার হওয়া মা দায়ানা পাতিনো জানান, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকার সময় তার ১৮ দিন বয়সী ছেলে হুয়ান দাভিদ তাকে মানসিকভাবে শক্ত রেখেছিল। দায়ানার ভাষায়, যতক্ষণ আমার সন্তান বেঁচে ছিল, ততক্ষণ আমারও বেঁচে থাকার তাগিদ ছিল। সে শ্বাস নিচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত হতে আমি বারবার তার নাকের কাছে হাত রাখতাম।
মা ও শিশুকে উদ্ধারের ভিডিও ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই নবজাতক হুয়ান দাভিদকে ভেনেজুয়েলার দুর্যোগ-পরবর্তী আশার প্রতীক হিসেবে দেখছেন। ভেনেজুয়েলার উত্তরাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকা লা গুয়াইরার একটি বহুতল ভবনের অষ্টম তলার ফ্ল্যাটে থালাবাসন ধোয়ার সময় ভূমিকম্পের আঘাতে ধসে পড়ে ভবনটি। প্রথমে হালকা কম্পন মনে হলেও মুহূর্তেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
দায়ানা বলেন, হঠাৎ মনে হলো আমি বাতাসে উড়ছি। এরপর মনে হলো ধুলো আর ধ্বংসস্তূপের মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছি। কীভাবে যে সন্তানকে শক্ত করে ধরে রাখতে পেরেছিলাম, আজও বুঝতে পারি না। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে প্রথমে তিনি সাহায্যের জন্য চিৎকার করলেও পরে বুঝতে পারেন, শক্তি সঞ্চয় করাই বেশি জরুরি। তাই আশপাশে মানুষের কণ্ঠস্বর বা পদচারণার শব্দ পেলেই শুধু চিৎকার করতেন।
তিনি জানান, তার বাম পা কংক্রিটের নিচে আটকে ছিল এবং মাথার পাশে একটি বড় পাথর চেপে ছিল। সেই অবস্থায় ধ্বংসস্তূপের মধ্যে একটি বাইবেল খুঁজে পেয়ে নতুন করে সাহস পান। তার ভাষায়, সেখান থেকেই আমার বেঁচে থাকার যাত্রা শুরু হয়েছিল। ঘুটঘুটে অন্ধকারে ওপর থেকে আসা সামান্য আলোর ফাঁকে একসময় তিনি নিজের ভাইয়ের কণ্ঠস্বর শুনতে পান। সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করলে ভাই তার অবস্থান শনাক্ত করেন এবং প্রতিশ্রুতি দেন- তোমাদের বের না করা পর্যন্ত আমি এখান থেকে যাব না।
অবশেষে দীর্ঘ ও অত্যন্ত সতর্ক উদ্ধার অভিযানের মাধ্যমে মা ও শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। ভূমিকম্পে দায়ানার দুই পায়ে আঘাত লাগলেও নবজাতক হুয়ান দাভিদ অল্পের জন্য বড় ধরনের ক্ষতি থেকে রক্ষা পায়। এদিকে, দায়ানার স্বামী গেরসন ভূমিকম্পের সময় ভবনের বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। ভবনটি ধসে পড়ার দৃশ্য দেখে তিনি স্ত্রী ও সন্তানের জীবিত ফেরার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। তাই তাদের উদ্ধার হওয়াকে তিনি ‘অলৌকিক ঘটনা’ বলে বর্ণনা করেছেন।
স্ত্রী-সন্তানকে ফিরে পাওয়ার পর গেরসনের আবেগঘন প্রতিক্রিয়ার ভিডিওও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, আমি ভেবেছিলাম তারা আর নেই। যখন ছেলেকে জীবিত দেখলাম, মনে হলো আমার নিজেরই পুনর্জন্ম হয়েছে।
ভূমিকম্পে তাদের বাড়ি, আসবাবপত্র এবং প্রায় সব সম্পদ ধ্বংস হয়ে গেছে। এমনকি পরিবারের পোষা কুকুরটিও এখনো নিখোঁজ। তবে সব হারিয়েও নতুন করে জীবন গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন এই দম্পতি। গেরসনের কথায়- আমরা প্রায় সবকিছু হারিয়েছি। কিন্তু আমরা বেঁচে আছি। যা হারিয়েছে, তা আবার গড়ে তোলা যাবে।
তথ্য সূত্র- বিবিসি।
বিডি-প্রতিদিন/আব্দুল্লাহ