Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৩ এপ্রিল, ২০১৯ ২৩:১২

নদী বাঁচাও ৫৪

অস্তিত্ব হারাতে বসেছে পাবনার ১৬ নদ-নদী

এস এ আসাদ, পাবনা

অস্তিত্ব হারাতে বসেছে পাবনার ১৬ নদ-নদী

দখল, দূষণ আর খনন না করায় পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে চলনবিলের ১৬ নদ-নদী। এই নদ-নদীগুলো চরম অস্তিত্ব সংকটে। বছরের অধিকাংশ সময় এই বিলে পানি থাকলেও বর্তমানে এর অবস্থা উল্টো। বছরের অর্ধেক সময়ই থাকছে পানিশূন্য। ফলে মাছ ও শস্যভাণ্ডার খ্যাত চলনবিলে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। অপরদিকে চাষাবাদে সেচ সংকটের সম্মুখীন হতে হচ্ছে কৃষকদের। ব্যাহত হচ্ছে নৌ-চলাচল। ফলে অধিক খরচে সড়কপথে পণ্য পরিবহন করতে হচ্ছে এবং পানিশূন্য নদীর বুকে করতে হচ্ছে ফসলের চাষ। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে, উনিশ শতকের মাঝামাঝিতে বড়াল নদীতে পানি থাকলেও শেষের দিকে রাজশাহী থেকে চাটমোহরের নূরনগর ঘাট পর্যন্ত নদীর অনেক স্থানে ক্রসবাঁধ দেওয়া নদীটি এখন মৃতাবস্থায় পড়ে আছে। এ নদী উদ্ধারে বড়াল রক্ষা কমিটি দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রাম করার ফলে চাটমোহর নতুনবাজার খেয়াঘাট, বোঁথর ঘাট ও রামনগর ঘাটের তিনটি ক্রসবাঁধ অপসারণ করা হয়। নূরনগর থেকে বাঘাবাড়ী পর্যন্ত বর্ষায় কিছু দিনের জন্য নদীটি প্রাণ ফিরে পেলেও বছরের অন্যান্য সময় থাকে শুকনো। চেঁচুয়া নদী নাটোরের ধারাবারিষার দক্ষিণ পাশ দিয়ে চতরার বিল, জোড়দহ, আফরার বিল, খলিশাগাড়ি বিল ও কিনু সরকারের ধর হয়ে পাবনার চাটমোহরের চরসেন গ্রামের পশ্চিমে গুমানী নদীর সঙ্গে মিশেছে। নদীটি এখন অস্তিত্ব সংকটে। দক্ষিণ চলনবিলের বড়াইগ্রামের চিনাডাঙ্গা বিলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চাটমোহরের মূলগ্রাম ফৈলজানা হয়ে ফরিদপুরের ডেমরার কাছে চিকনাই নদী বড়াল নদীতে মিশেছে। ডেমরা এলাকায় স্লুইসগেট থাকায় ফরিদপুর থেকে নদীটি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বর্ষা মৌসুমে মাস চারেক এ নদীতে পানি থাকলেও বাকি আট মাস থাকে পানিশূন্য। এগুলো ছাড়াও বানগঙ্গা, তুলসী, ভাদাই ও মরা আত্রাই নদীর অবস্থা অত্যন্ত করুণ। ব্রিটিশ আমলে ১৯১৪ সালে ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ রেললাইন নির্মাণ, নদীর বুক চিরে সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ, অপরিকল্পিতভাবে ব্রিজ, কালভার্ট, স্লুইসগেট, বাঁধ, ক্রসবাঁধ নির্মাণসহ নানা কারণে চলনবিল এলাকার নদীগুলো এখন অস্তিত্ব সংকটে। দুই দশক আগে নাটোরের বনপাড়া থেকে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল পর্যন্ত মহাসড়ক নির্মাণের পর উত্তর থেকে দক্ষিণে পানির প্রবাহে আরও বেশি ভাটা পড়তে থাকে। ফলে পলি জমে দ্রুত ভরাট হচ্ছে চলনবিলের নদ-নদীগুলো। কয়েক বছর আগে আত্রাই রিভার ড্রেজিংয়ের কাজ শুরু হলেও যেখানে বালি পাওয়া সম্ভব এমন কিছু এলাকা খনন করে সংশ্লিষ্টদের অর্থের বিনিময়ে বালি বিক্রি করতে দেখা যায়। পরে অজ্ঞাত কারণে খননকাজ বন্ধ হয়। সীমিত আকারে কোথাও খনন করা হয়েছে আবার অনেক এলাকায় খনন করা হয়নি। ফলে এই খনন কাজের সুফল পাচ্ছেন না চলনবিলের কয়েক লাখ মানুষ। এ অবস্থায় চলনবিলের নদ-নদী রক্ষা করতে হলে যমুনা ও পদ্মাসহ চলনবিল এলাকার প্রধান নদ-নদী সঠিকভাবে খনন করে পানির প্রবাহ সৃষ্টি ও ধারণক্ষমতা বাড়াতে হবে। নইলে একসময় মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে চলনবিলের অনেক নদ-নদী। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক পরিবেশবিদ হুমায়ারা আনজুম বলেন, ভৌগোলিকভাবে এ এলাকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলোর করুণ অবস্থা। চলনবিল এলাকার নদীগুলোর প্রবহমান পানির পরিমাণ ও স্রোতের বেগ কম হওয়ায় পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে একেবারেই শুকিয়ে যাচ্ছে নদীগুলো। উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলের খাদ্যশৃঙ্খল ব্যাহত হচ্ছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনের পাশাপাশি মৎস্য ও ফসল উৎপাদনসহ পানিসংশ্লিষ্ট অন্য সব কাজ ব্যাহত হচ্ছে। সার্বিকভাবে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটছে। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অর্থনীতিবিদ ইয়াহিয়া ব্যাপারী আকাশ বলেন, ‘অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে এ অঞ্চলের নদীগুলো ক্রমান্বয়ে অস্তিত্ব সংকট পড়ছে। ফলে পরিবেশ ভারসাম্য হারাচ্ছে। পাশাপাশি পাবনার অর্থনীতির ক্ষেত্রেও ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের সর্বাগ্রে নদীকে সচল করতে হবে। তবেই পরিবেশ ও অর্থনৈতিক গতিশীলতা ফিরে আসবে।’ এ বিষয়ে পাবনার জেলা প্রশাসক মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘পাবনা জেলার অনেক কিছুই এই নদীকেন্দ্রিক হলেও বর্তমানে সত্যি করুণ অবস্থা। আমরা সাধ্যমতো নদী খননের চেষ্টা চালাচ্ছি। ইতিমধ্যে কয়েকটি নদীর খননকাজ শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব নদী খনন করা হবে।’


আপনার মন্তব্য