শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ৬ মে, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৫ মে, ২০১৯ ২৩:২৫

মুড়িতে ইউরিয়া সার

মির্জা মেহেদী তমাল

মুড়িতে ইউরিয়া সার

শুরু হচ্ছে রমজান মাস। আর এ মাসেই দেশে মুড়ির চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে রমজানে ইফতারে অত্যাবশ্যকীয় একটি উপাদান হলো মুড়ি। সন্ধ্যায় ইফতারের সময় ছোলা-মুড়ি ছাড়া ইফতার হয় না। রমজানকে টার্গেট করেই এক শ্রেণির মুড়ি কারবারিদের এখন রমরমা ব্যবসা। এ ছাড়া সারা বছরই মুড়ির ব্যবহার রয়েছে। শহরের জীবনে সাধারণ মানুষ এই বাণিজ্যিক মুড়ির ওপর বেশি নির্ভর করে থাকে। কিন্তু এই মুড়িতেও মেশানো হচ্ছে সোডিয়াম হাইড্রো সালফাইড। যার বাণিজ্যিক নাম হাইড্রোজ। সংশ্লিষ্টদের মতে, হাইড্রোজ মেশানোর কারণে মুড়ি বেশি পরিমাণ ফুলেফেঁপে ওঠে। সাদা চকচকে হয়। ক্রেতা আকর্ষণ করে বেশি। ফলে বেশি দামে বিক্রি করা সম্ভব হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাইড্রোজ একটি শক্তিশালী ক্ষারীয় পদার্থ। এটি পেটে গেলে মানব দেহে রক্তের শ্বেতকনিকা, হিমোগ্লোবিনের কার্যকারিতা নষ্ট করে দেয়। বিএসটিআই জানিয়েছে, মুড়ি ভাজতে সাধারণত লবণ ও পানির মিশ্রণের প্রয়োজন হয়। এই লবণ মিশ্রিত পানি মুড়িতে মেশানোর সময় হাইড্রোজ মিশিয়ে দেওয়া হয়। মুড়ি ভাজার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, হাইড্রোজ মেশানোর কারণে মুড়ি বেশি পরিমাণ ফুলে ফাঁপা হয়ে ওঠে। ফলে বেশি দামে বিক্রি করা সম্ভব হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, মুড়িতে এভাবে হাইড্রোজ মেশানো মানব স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। আবার খাদ্যে এভাবে হাইড্রোজ মেশানো নিষিদ্ধ। কিন্তু বেশি মুনাফার লোভে এভাবে মুড়ি ভেজে বিক্রি করা হচ্ছে। বিএসটিআই সূত্রে জানা গেছে, পুরান ঢাকা, বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে, শনিরআখড়া, গোবিন্দপুর, বাগানবাড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে মুড়ি ভাজার কারখানা। রমজান শুরু হওয়ার আগে প্রয়োজনীয় মুড়ি ভেজে বাজারে সাপ্লাই দেওয়া হয়ে থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মুড়ি ধান থেকে তৈরি এক ধরনের স্ফীত খাবার বা ভাজা চাল। সাধারণত প্রাতরাশ বা জলখাবারে খাওয়া হয়। বাংলাদেশ ও ভারতে জনপ্রিয় খাবার হিসেবে পরিচিত। এটা সাধারণ বাষ্প উপস্থিতিতে উচ্চ চাপের সাহায্যে তৈরি করা হয়। এটি স্বাস্থ্যের পক্ষেও ব্যাপক উপকারী। শরীরের এসিডিটি নিয়ন্ত্রণ করে ওজন কমাতে সাহায্য করে। মুড়িতে সোডিয়ামের পরিমাণ কম। তাই এটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে। পেট ভরে থাকে দীর্ঘক্ষণ। পেটে গোলমাল অবস্থায় শুকনো মুড়ি কিংবা ভেজা মুড়ি খেলে তাৎক্ষণিক উপকার পাওয়া যায়। মুড়িতে ভিটামিন বি ও প্রচুর পরিমাণে মিনারেল থাকায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। পাশাপাশি হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। কিন্তু মুড়িতে ভেজাল বা রাসায়নিক পদার্থ মিশিয়ে দেওয়ার কারণে এর পুষ্টিগুণ আর বজায় থাকে না। ভেজাল দেওয়া মুড়ি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে ওঠে। এ ছাড়া হাইড্রোজ দেওয়া মুড়ি খেতেও বিস্বাদ লাগে। বিশেষ করে মুখে দিলেই এক ধরনের তিতা স্বাদ অনুভূত হয়ে। সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে খোলা অবস্থায় বড় প্লাস্টিকের বস্তা ভর্তি মুড়ি বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। রমজান এলেই রাজধানীর বিভিন্ন বাজার, অলিগলির দোকান ও পাড়া-মহল্লায় ফেরি করে মুড়ি বিক্রি শুরু হয়। ইফতারের অত্যাবশ্যকীয় সামগ্রী হওয়ায় আগে থেকেই অনেকে মুড়ি সংরক্ষণ করে থাকেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুরান ঢাকাভিত্তিক একাধিক মুড়ি বিক্রেতা রাজধানীতে মুড়ি সাল্লাই দিয়ে থাকেন। নিজস্ব কারখানায় মুড়ি ভেজে বিক্রি করা হয়। কিন্তু এসব মুড়ি তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে সোডিয়াম হাইড্রো সালফাইড। যার বাণিজ্যিক নাম হাইড্রোজ। পাশাপাশি ইউরিয়া সার ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। বিএসটিআই সূত্র বলেছে, মুড়ি ভাজার কারখানায় বিএসটিআইয়ের অভিযানে হাইড্রোজ দেওয়ার বিষয়টি হাতেনাতে ধরা পড়েছে। জরিমানার পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ভেজাল মুড়ি তৈরির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন অভিযান না চালানোর কারণে আবার এ রমরমা ব্যবসা শুরু হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রমজানকে সামনে রেখে এসব কারখানা এখন সক্রিয়। গাজীপুর জাতীয় কৃষি প্রশিক্ষণ একাডেমির উপ-পরিচালক (কৃষি সম্প্রসারণ ও গ্রামীণ অর্থনীতি) ড. মো. দেলোয়ার হোসেন মজুমদার তার এক প্রবন্ধে বলেছেন, মুড়িতেও ঢুকে পড়েছে ভেজালের বিষবাষ্প। লবণের বদলে মেশানো হচ্ছে সেই ইউরিয়া। কারখানায় ভাজা মুড়ির সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে আড়তদারদের প্ররোচনায় গ্রামের সহজ-সরল বউ-ঝিরাও মুড়িতে মেশাচ্ছেন এই বিষ। প্রতিযোগিতার বাজারে মুড়িকে লম্বা, সাদা, ফাঁপানো ও আকর্ষণীয় করতে মুড়ি বেপারি এবং আড়তদাররা শ্রমিকদের সার সরবরাহ করছেন। তাদের প্ররোচনায় না বুঝে ঘরে ঘরে মুড়ি শ্রমিকরা লবণের বদলে চালে ইউরিয়া মিশিয়ে মুড়ি তৈরি করছেন। মুড়ি ভাজার চালের সঙ্গে বস্তায় বস্তায় ইউরিয়া। ইউরিয়া মিশ্রিত মুড়ির কুফলও জানেন না মুড়ি শ্রমিকরা। এক কেজি ইউরিয়ায় প্রায় ১৬০ কেজি মুড়ি ভাজা হয়। লবণের দাম বেশি হওয়ায় আর বেপারি আড়তদাররাও খুশি হওয়ায় চালে এ ইউরিয়া মিশিয়েই এখন মুড়ি ভাজা হচ্ছে। এসব সারের ক্রেতা শুধু মুড়ি বেপারি, আড়তদার ও শ্রমিকরা। বারোপোতায় এখন শুধু বিআর১১ ও ব্রি ধান২৮ ধানে মুড়ি ভাজা হচ্ছে। দুই-চার বছর আগেও এখানে ঘরে ঘরে আউশ ধানের মুড়ি ভাজা হতো।

ব্যবসায়ী আজিজুল জানান, বেপারি-আড়তদাররা যাচ্ছেতাই ধান কিনে দিচ্ছেন শ্রমিকদের। দরিদ্র শ্রমিকরা চালে ইউরিয়া মিশিয়ে সেই ধান থেকেই মুড়ি তৈরি করতে বাধ্য হচ্ছেন। মুড়িতে ইউরিয়ার সঙ্গে হাইড্রোজও মেশানো হচ্ছে। তা চেনার উপায় হলো এ ধরনের মুড়ির শরীরে অসংখ্য ছিদ্র থাকে, দেখতে খুব সাদা রঙের হয়। স্বাদ পানসে হয়ে যায়।


আপনার মন্তব্য