শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ২৩:৫১

নদীর কান্না

তিস্তা এখন আবাদি জমি

রেজাউল করিম মানিক, লালমনিরহাট

তিস্তা এখন আবাদি জমি
তিস্তার বুকে ধু-ধু বালুচর -বাংলাদেশ প্রতিদিন

ফেব্রুয়ারির শুরুতেই তিস্তা পানিশূন্য। খরস্রোতা তিস্তা দাঁড়িয়ে আছে মরুভূমির ওপর। গত বছর কয়েক দফা বন্যার পর তিস্তার বুকে জেগে উঠেছে ধু-ধু বালুচর। তিস্তা নদী খনন, শাসন, ড্রেজিং ও সংরক্ষণ না করায় উজান থেকে নেমে আসা পলি জমে অগভীর খরস্রোতা রাক্ষুসী তিস্তা নদী আবাদি জমিতে রূপ নিয়েছে। এই বালুচরে তিস্তাপাড়ের লাখো কৃষক বিভিন্ন ফসল ফলাচ্ছেন। পানি না থাকায় মাছশূন্য হয়ে পড়েছে তিস্তা। ফলে জেলেরা তাদের পেশা বদলে চলে যাচ্ছেন অন্য পেশায়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উত্তরাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী জৌতিপ্রসাদ ঘোষ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, তিস্তার পানি ব্যারাজ পয়েন্টে গত ১০ বছরের তুলনায় রেকর্ড পরিমাণ কমে গেছে। জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে পানি ব্যারাজ পয়েন্টে ৩ হাজার কিউসেক থাকলেও ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহেই তা কমে ১৩০০ কিউসেকে নেমে এসেছে। এই পরিমাণ পানি দিয়ে সেচ কার্যক্রম কোনোভাবেই চালানো সম্ভব নয় বলে জানান পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই প্রকৌশলী। তিনি জানান, চলতি বছর ইরি, বোরো ও খরিপ-১ চাষাবাদের জন্য ৫০ হাজার হেক্টর জমি নির্ধারণ করা হলেও পানির অভাবে শেষ পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না। পানি উন্নয়ন বোর্ড তিস্তা খননের জন্য ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করলেও অজ্ঞাত কারণে তা লালফিতায় বন্দী রয়েছে। বহু বছর ধরে তিস্তাচুক্তি নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে অসংখ্যবার বৈঠক হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। বারবারই হতাশ হয়েছে তিস্তাপাড়ের লাখো মানুষ। রংপুর ও লালমনিরহাটের তিস্তাবিধৌত এলাকায় জেগে উঠেছে ১৪৩টি চর। বালুচরে দিগন্তজুড়ে সবুজের মাঠে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন কৃষক। আলু, ভুট্টা, মরিচ, মসুর ডাল, মিষ্টিকুমরা, চীনাবাদাম, পিয়াজ, রসুন, তরমুজসহ বিভিন্ন ফসল ফলছে তিস্তায়। দুই পাড়ে বসবাসকারীরা জানান, তিস্তা এখন আর নদী নয়, এ যেন বিস্তীর্ণ আবাদি জমি। তিস্তার বুকে খেয়াপারে বা মাছ ধরতে নৌকা নিয়ে ছুটে চলা মাঝিমল্লাদের দৌড়ঝাঁপ নেই। পানি আর মাছে পরিপূর্ণ তিস্তার বুকে জেগে উঠেছে শুধুই বালুচর। মাছ ধরতে না পেরে মানবেতর জীবনযাপন করছে নদীর দুই পাড়ের কয়েক হাজার জেলে পরিবার।

সরেজমিন দেখা গেছে, এ অঞ্চলের বৃহৎ নদী তিস্তা এখন মরুভূমি। এর বুকে ফলছে নানা ধরনের ফসল। কথা হয় হাতীবান্ধা উপজেলার সানিয়াজান ইউনিয়নের তিস্তাপাড়ের পাসশেখ সুন্দর গ্রামের হাশেম আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, তিস্তা মরে যাওয়ায় মাছ বিলীন হয়ে গেছে। লালমনিরহাটের চররাজপুর এলাকার আকবর হোসেন জানান, তিস্তায় একহাঁটু পানিও নেই। হেঁটে নদী পার হওয়া যায়। গঙ্গাচড়ার জাহাঙ্গীর জানান, মাঘ মাসেই তিস্তা ধু-ধু বালুচর। সামনে তো খরার দিন পড়েই রয়েছে। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে উজান থেকে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে নেমে আসে বালু। ফলে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। বছর বছর তলদেশ ভরাট হওয়ায় এ অঞ্চলের বৃহৎ নদীগুলো হারাতে বসেছে ঐতিহ্য। নদীতে মাছ ধরে যারা জীবিকানির্বাহ করতেন, তারা আজ অসহায়। পানি না থাকায় জেলেরা পেশা বদল করে চলে যাচ্ছেন অন্য পেশায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের এক পরিসংখ্যান মতে, লালমনিরহাট জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে ছোট-বড় অনেক নদী। কিন্তু কালক্রমে নদী ভরাট হয়ে পানি শুকিয়ে মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে এ জেলার জনপদ। বন্ধ হয়ে গেছে নদীকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য, চাষাবাদ। আর পানি না থাকায় দুর্দিন চলছে মৎস্যজীবীদের। এ বিষয়ে পাউবোর দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, নদীগুলো পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। রংপুর ও লালমনিরহাটের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ৩৩টি নদী ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে এগুলোতে কোনো পানি নেই। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওই সূত্রটি দাবি করে, নদীগুলো খনন করে পানিপ্রবাহ ধরে রাখা সম্ভব। এ ব্যাপারে সরকারের সদিচ্ছা প্রয়োজন বলে মনে করেন পাউবোর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। এদিকে ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার পর নীলফামারী জেলার কালীগঞ্জ সীমান্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে ঐতিহাসিক তিস্তা নদী। লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধা জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী বন্দর হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে মিশেছে তিস্তা। নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৩১৫ কিলোমিটার হলেও বাংলাদেশ অংশে রয়েছে ১৬৫ কিলোমিটার। তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্প সূত্র জানায়, বর্তমানে তিস্তায় পানি রয়েছে সাড়ে ১৩০০ কিউসেক। প্রকল্প এলাকায় সেচ দেওয়া এবং নদীর প্রবাহ ঠিক রাখতে তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে প্রয়োজন ২০ হাজার কিউসেক পানি। শুধু সেচ প্রকল্প চালাতেই প্রবাহমাত্রা থাকা প্রয়োজন ১৪ হাজার কিউসেক এবং নদীর অস্তিত্ব রক্ষার জন্য চার হাজার কিউসেক পানি। কিন্তু তিস্তায় প্রয়োজনীয় পানি মিলছে না। শুষ্ক মৌসুমে বোরো আবাদের সময় ব্যারাজ পয়েন্টে কয়েক বছর ধরে পাওয়া যায় মাত্র ৫০০ কিউসেক পানি। ব্যারাজের সবকটি জলকপাট বন্ধ রেখে সেচ প্রকল্পে পানি সরবরাহ করায় নদীর ভাটিতে আর প্রবাহ থাকছে না। ফলে জেগে উঠছে অসংখ্য চর। নীলফামারী জেলার ডালিয়া ও লালমনিরহাট জেলার দোয়ানীতে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে তিস্তা সেচ প্রকল্প চালু হয় ১৯৯৮ সালে। লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর ও দিনাজপুর জেলার ১২টি উপজেলার ৯১ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দিতে পারার কথা এই প্রকল্পে। কিন্তু এটা শুরুই হয় ৭৯ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দিয়ে। এরপর ক্রমাগত সেচের আওতা কমেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ডালিয়া ডিভিশনের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান বলেন, ‘তিস্তার পানিপ্রবাহ ধরে রাখার চেষ্টা করছি। উজান থেকে পানি কম আসায় এবার সেচযোগ্য জমির আওতা কমানো হচ্ছে।’ লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার আরাজি শেখ সিন্দুর গ্রামের মোতালেব হোসেন বলেন, ‘১০ বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করেছি। পানির অভাবে ভুট্টা গাছ মরতে বসেছে। এখন নিরুপায় হয়ে শ্যালো মেশিন দিয়ে সেচ দিতে হচ্ছে।’ রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের আঞ্চলিক পরিচালক মোহাম্মদ আলী জানান, তিস্তার চরাঞ্চল এখন আবাদি জমিতে পরিণত হয়েছে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর