শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ১০ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৯ মার্চ, ২০২১ ২৩:২৪

নির্যাতনের টার্গেট যখন শিশুরা

চারপাশে হয়রানি বাড়ছেই, অনেক কিছুই থেকে যায় সমাজের অজানা

আলী আজম

পরিবারের আশা-আকাক্সক্ষার কেন্দ্রবিন্দু শিশু। অথচ সেই শিশুই অপরাধীদের টার্গেট। নানা ধরনের সহিংসতার শিকার তারা। খুন, অপহরণ, যৌন হয়রানি, সহিংস আক্রমণ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনে অতিষ্ঠ শিশুরা। একটি শিশুর কারণে পুরো পরিবার তছনছ হয়ে যাচ্ছে। নিমেষেই পরিবারে নেমে আসছে অন্ধকার। শিশুদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ দেখে অনেকে আঁতকে উঠছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভিন্ন প্রলোভনের মাধ্যমে শিশুদের খুব সহজেই আয়ত্তে আনা যায়। ফলে অপরাধীদের মূল টার্গেট শিশু। তবে অপরাধের সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দিচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

ঘটনা : ১

২০ ফেব্রুয়ারি সকালে মা নার্গিস বেগমের সঙ্গে গাজীপুরের গাছা থানার উত্তর খাইলকুরের বাসা থেকে সততা মিনি সোয়েটার ফ্যাক্টরিতে যায় তিন বছরের শিশু নিহাদ ইসলাম। মা কারখানার ভিতরে যান আর শিশুটি কারখানার কলাপসিবল গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। সেখান থেকে মাস্ক পরা এক ব্যক্তি শিশুটিকে কোলে তুলে নিয়ে যায়। পরে সিসি ক্যামেরা দেখে শিশু অপহরণের ঘটনা জানা যায়। ওই দিনই গাছা থানায় একটি অভিযোগ দেয় শিশুর পরিবার। ঘটনার তিন দিন পর ২৩ ফেব্রুয়ারি পুলিশ নিহাদের লাশ উদ্ধার করে ঢাকার শ্যামপুরের করিমুল্লার বাগ এলাকার ৩৮ নম্বর বাড়ির ছাদের ট্যাংক থেকে। সোয়েটার কারখানার শ্রমিক হানিফ আলী ও নার্গিস বেগম দম্পতির একমাত্র ছেলে নিহাদ। তাদের গ্রামের বাড়ি পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার বেংহাড়ী। শিশুটিকে কী কারণে কারা অপহরণ করেছিল তা জানতে পারেনি পরিবার। হত্যার রহস্য এখনো বের করতে পারেনি পুলিশ।

ঘটনা-২ : ২৪ ফেব্রুয়ারি রাতে পুরান ঢাকার ওয়ারীর পদ্মনিধি লেনের ৮/১/এ নম্বর বাড়ির ষষ্ঠ তলার ফ্ল্যাট থেকে গলা কাটা অবস্থায় ১২ বছরের শিশু হাসানের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে সোহেল ও জাহিদ হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তারা দুজনই আদালতে হত্যার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। তারা টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার লুটের জন্যই হাসানকে খুন করেন।

ঘটনা-৩ : ২৭ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ৮টার দিকে রাজধানীর ডেমরার পূর্ব বক্সনগর বাসা থেকে চিপস কেনার জন্য দোকানে গিয়ে নিখোঁজ হয় ছয় বছরের জুবায়ের। পরে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন অপহরণকারী নাজমুল শেখ। ১ মার্চ এ বিষয়ে মামলা করেন শিশুটির বাবা রাজীব ভূইয়া। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে কেরানীগঞ্জের কালীগঞ্জ বাজার থেকে অপহৃত শিশুটিকে উদ্ধার করে। পুলিশ বলছে, শিশুটির বাবার পূর্বপরিচিত নাজমুল। ডেমরা থানার এসআই শাহজাহান বলেন, অপহরণের পর ওই দিন রাতেই শিশুটির বাবাকে ফোন দিয়ে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন নাজমুল। টাকা না দিলে শিশুটিকে মেরে ফেলার হুমকি দেন। নিরুপায় হয়ে শিশুর বাবা অপহরণকারীর দেওয়া বিকাশ নম্বরে ১০ হাজার টাকা পাঠান। টাকা পেয়ে অপহরণকারী মোবাইল ফোন বন্ধ করে দেন। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়। গতকাল তার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত। শুধু এ তিনটি ঘটনাই নয়। এদের মতো বহু শিশু প্রতিনিয়ত হত্যা, অপহরণ ও সহিংসতার শিকার হচ্ছে। ২০২০ সালে ১ হাজার ৫২১ শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে মেয়েশিশু ১ হাজার ৮৮ আর ছেলেশিশুর সংখ্যা ৪৩৩। ৯ জানুয়ারি মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ‘শিশু পরিস্থিতি রিপোর্ট ২০২০ পত্রপত্রিকার পাতা থেকে’ প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানায়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, ২০২০ সালে বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয় ১ হাজার ৭১৮ শিশু। এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যাসহ বিভিন্ন কারণে ৫৮৯ শিশু নিহত হয়েছে। ২০১৯ সালে এ সংখ্যা ছিল ৪৮৮। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ওয়ারী বিভাগের ডিসি শাহ ইফতেখার আহমেদ বলেন, ‘বিভিন্ন প্রলোভনের মাধ্যমে সরলমনা শিশুদের আয়ত্তে আনা খুব সহজ। এ কারণে অপরাধীদের টার্গেট শিশু। বিভিন্ন সহিংসতা ছাড়াও খুন-অপহরণের শিকার শিশুরা। থানায় আসা শিশুদের প্রতিটি বিষয় গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে পুলিশ। আমরা চাই প্রতিটি শিশু সুরক্ষিত থাকুক।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক বলেন, ‘পারিবারিক ও সামাজিক দ্বন্দ্ব, অহমিকা, তিরস্কার, অপমানের প্রতিশোধ নিতে শিশুদের বেছে নেওয়া হচ্ছে। শিশুদের রক্ষায় পারিবারিক ও সামাজিকভাবে সবার অংশগ্রহণের মাধ্যমে সব দ্বন্দ্ব প্রশমনের মানসিকতা তৈরি করতে হবে।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপারসন খন্দকার ফারজানা রহমান বলেন, ‘পরকীয়ার ক্ষেত্রেও যখন একটি শিশু দেখে ফেলে তখন শিশুটিকে মেরে ফেলা হয়। ১৮ বছরের নিচের শিশুরা অত্যন্ত ঝুঁকিতে রয়েছে। শারীরিক কাঠামো, পরিবেশগত কারণে শিশুরা চাইলেও তার ওপর কেউ নির্যাতন চালালে তা ফিরিয়ে দিতে পারে না। আবার শিশুর ওপর যে কেউ চাইলে সহজেই আক্রমণ করতে পারে। অপরাধের যে রুটিন অ্যাকটিভিটিজ সেখানে শিশুরা “সুইট্যাবল টার্গেট”। আবার ইন্টারনেটের প্রযুক্তি ও ভোগবাদী সমাজব্যবস্থার কারণে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে। এতে একটি শিশু যে একটি পরিবারের আলো এ মানসিকতা দিন দিনে হারিয়ে যাচ্ছে।’ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. বিধানরঞ্জন রায় পোদ্দার বলেন, ‘সমাজে এখন যে অপরাধগুলো ঘটছে সেখানে শিশুকে ব্যবহার করেই অপরাধীরা নিজ উদ্দেশ্য হাসিল করতে চাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে অপরাধ ঘটানোর ক্ষেত্রে একটি শিশুকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। শিশুরা দুর্বল বলেই তাদের ওপর আক্রমণ সহজ। অর্থাৎ অপরাধ ঘটানোর ক্ষেত্রে শিশু হচ্ছে সহজ শিকার। আর গৃহকর্মে নিয়োজিত ও শ্রমজীবী শিশুদের শোষণ করা সহজ হওয়ায় তারা বিভিন্ন অপরাধের ভিকটিম হয়।’

এই বিভাগের আরও খবর