শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ২ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১ জুলাই, ২০২১ ২৩:০৪

খুনের চুক্তি ১০ হাজার

মির্জা মেহেদী তমাল

খুনের চুক্তি ১০ হাজার
Google News

মেয়ের পারিবারিক কলহ মেটাতে সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকার আশুলিয়ায় মেয়ের বাড়ি আসেন জরিনা বেগম। সঙ্গে ছিলেন তার বাবা বৃদ্ধ আকবর আলী মন্ডল। বেয়াইবাড়ি দুপুরের খাবার শেষে বিকাল ৫টার দিকে তারা বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন। জামাই নূর ইসলাম আশুলিয়া থেকে তাদের টাঙ্গাইলগামী একটি মিনিবাসে তুলে দেন। কিন্তু রাতেই নূর ইসলাম খবর পান ওই মিনিবাসে ডাকাতি হয়েছে। তার নানাশ্বশুরকে মারধর করে চলন্ত বাস থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছে। বাসটিতে রয়ে গেছেন তার শাশুড়ি। খবর পাওয়া মাত্রই নূর ইসলাম ছুটে যান আশুলিয়ার দিকে।

ওদিকে বাস থেকে ফেলে দিলে বৃদ্ধ আকবর আলী মন্ডল মারাত্মক আহত হন। তিনি টহল পুলিশকে জানান। ইতিমধ্যে ঘটনাস্থলে চলে আসেন নূর ইসলাম। বাস যেদিকে গেছে সেদিকেই পুলিশসহ সবাই ছুটতে থাকে। প্রায় ১ কিলোমিটার দূরে বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের মরাগাঙ এলাকা থেকে জরিনার লাশ উদ্ধার করা হয়। জরিনার শরীরে কোনো ক্ষতচিহ্ন পাওয়া না গেলেও গলায় কালো দাগ ছিল। ঘটনাটি ২০১৯ সালের ৯ নভেম্বরের।

আশুলিয়া থানায় এ ব্যাপারে নূর ইসলাম বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করেন। আসামি অজ্ঞাতনামা। পুলিশ তদন্ত শুরু করে। বাস ডাকাতদের টার্গেট করে চলে এ তদন্ত। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) নিজ উদ্যোগে মামলার তদন্ত করতে থাকে।

পিবিআই তদন্ত করতে গিয়ে খুনের ঘটনায় নতুন মোড় খুঁজে পায়। চলন্ত বাস থেকে বৃদ্ধ বাবাকে মারধর করে ফেলে দিয়ে সে বাসে জরিনা খাতুনকে (৪৫) খুনের নেপথ্যে ডাকাতি নয়, পারিবারিক দ্বন্দ্ব খুঁজে পায় পিবিআই। পরিকল্পিতভাবে জরিনাকে হত্যার অন্যতম পরিকল্পনাকারী দূরের কেউ নন, তার নিজের মেয়েজামাই নূর ইসলাম।

ওই হত্যাকান্ড ধামাচাপা দেওয়ার জন্য বাদী হয়ে নিজেই অজ্ঞাতদের আসামি করে আশুলিয়া থানায় মামলা করেছিলেন। শাশুড়িকে হত্যায় মাত্র ১০ হাজার টাকায় বাসচালকের সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন তিনি। আর পুরো ঘটনার মধ্যস্থতা করেছিলেন নূর ইসলামের মামা ও তার বিয়ের ঘটক মো. স্বপন। পিবিআই জানায়, আশুলিয়ায় চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকান্ডে জড়িত নূর-স্বপন ছাড়াও গ্রেফতার হয়েছেন নূরের মা আমেনা বেগম।

২০১৩ সালে স্বপনের মধ্যস্থতায় রোজিনা ও নূর ইসলামের বিয়ে হয়। তাবে তাদের দাম্পত্য কলহ লেগেই থাকত। মেয়েজামাইর মধ্যে সাংসারিক কলহ হলেই আশুলিয়ায় ছুটে আসতেন জরিনা খাতুন। মেয়েকে নির্যাতন করায় জামাইকে শাসাতেন; বেয়াইনকেও (মেয়ের শাশুড়িকেও) শাসাতেন তিনি। এ নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ছিল নূর ইসলামের। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্কের অবনতির জন্য শাশুড়ি জরিনাকেই দায়ী করতেন তিনি। কিন্তু প্রতিবাদ করার সাহস পেতেন না। কলহ প্রকট আকার ধারণ করলে নূর ইসলাম ও তার মা আমেনা বেগম বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন স্বপনের সঙ্গে। নিজেদের সাংসারিক বিষয়ে নাক গলানোয় শাশুড়িকে সরানোর জন্য তারা পরিকল্পনা করেন জরিনাকে এমন শিক্ষা দিতে হবে যেন তিনি আর তাদের বাড়িতে না আসেন। পরিকল্পনা এমনভাবে করা হয় যেন কেউ বুঝতে না পারে। জরিনাকে বাস থেকে ফেলে হত্যা করা হবে। আর তার সঙ্গে থাকা জরিনার বৃদ্ধ বাবাকে মারধর করা হবে। যেন তিনি নিজেই ডাকাতি বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ঘটনা ঘটেছে বলতে পারেন। বৈঠকে স্বপন ঘাতক মা-ছেলেকে বলেন, ‘জরিনারে সরায় দেওয়া কোনো বিষয় না। মাত্র ১০ হাজার টাকা দাও সমাধান করে দিচ্ছি।’

অফ রুটের (সাধারণত সেসব গাড়ির নির্দিষ্ট রুট নেই, যখন যে দিকে যাত্রী পায় সেদিকেই যায়) বাসটি ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে আগে থেকেই আশুলিয়ার জামগড়া বাসস্ট্যান্ডে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন স্বপন। কিছু দূর না যেতেই বাসের সহকারী ও দুই হেলপার মারধর করে মোবাইল ফোন ও টাকা-পয়সা কেড়ে নেয়। চলন্ত বাস থেকে আকবর আলীকে আশুলিয়া ব্রিজের কাছে ফেলে দেয়। বাসটি ফের আশুলিয়ার দিকে ফেরত আসে। এরপর বাসের মধ্যে জরিনাকে হত্যার পর লাশ রাস্তায় ফেলে পালিয়ে যায় ভাড়াটে খুনি চালক, সহকারী ও দুই হেলপার। বিষয়টি নূর ইসলামকে জানান নিহতের বাবা আকবর।

খবর পেয়ে রাত ১১টার দিকে পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার দূরে বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের মরাগাঙ এলাকা থেকে জরিনার লাশ উদ্ধার করেন নূর ইসলাম। এ সময় জরিনার শরীরে কোনো ক্ষতচিহ্ন পাওয়া না গেলেও গলায় কালো দাগ ছিল। ঘটনার পর বোঝার উপায়ই ছিল না হত্যার পরিকল্পনায় কে জড়িত। স্বপনকে আটক করার পর জানা গেছে ঘটনার নেপথ্যে কলকাঠি নেড়েছেন নিহতের খোদ জামাতা নূর ইসলাম।