শুক্রবার, ১৬ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ টা

খুনি ছিল পেছনের সিটে

মির্জা মেহেদী তমাল

খুনি ছিল পেছনের সিটে

ইসমাইল হোসেন জিসান। বয়স ২৪। ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। রাজধানীর শ্যামলীর ২ নম্বর রোডে বন্ধুর সঙ্গে ভাড়া বাসায় থাকতেন। তিনি গাজীপুর জেলার গাছা থানার কাথোরা গ্রামের সাব্বির হোসেন শহীদের ছেলে। পড়াশোনার ফাঁকে ইসমাইল রাইড শেয়ারিং সার্ভিস পাঠাওয়ের মোটরসাইকেল চালাতেন। ২০২০ সালের ১২ মে ঢাকার শেরেবাংলা নগর থেকে হঠাৎ নিখোঁজ হন ইউনিভার্সিটির ছাত্র ইসমাইল হোসেন জিসান। তিনি পাঠাওয়ের মোটসাইকেলচালক ছিলেন। সকালে জিসানের পাঠাও মোটরসাইকেল ভাড়া করে গাজীপুরের গাছা থানা এলাকায় যান এক যাত্রী। এর পর থেকে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। ইসমাইলের সন্ধান না পেয়ে রাতে গাছা থানায় একটি জিডি করেন তার বাবা সাব্বির হোসেন। এর একদিন পর ছেলের কোনো খোঁজ না পাওয়ায় শেরেবাংলা নগর থানায়ও জিডি করেন তিনি। এর পরই অভিযানে নামে পুলিশ।

গাছা ও শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ এক অভিযানে গাছা এলাকার একটি ভাড়া বাড়ি থেকে হাসিবুর নামের এক যুবককে গ্রেফতার করে। হাসিবুর কামারজুরি বাজার এলাকায় খাবার হোটেলের ব্যবসা করেন এবং ওই এলাকার জাহাঙ্গীর আলম নামের এক ব্যক্তির বাসায় ভাড়া থাকেন। এ সময় সেখান থেকে জিসানের মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে হাসিবুর জিসানকে হত্যার কথা স্বীকার করেন এবং তার মৃতদেহ তার বাড়ির সেপটিক ট্যাংকে ফেলা হয়েছে বলে জানান। শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ জানায়, ২০২০ সালের ২৩ মে ওই বাড়ির সেপটিক ট্যাংক থেকে জিসানের লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ হাসিবুরকে জিজ্ঞাসাবাদে জানতে পারে, পাঠাওয়ের মোটরসাইকেলটি ছিনতাইয়ের জন্য যাত্রী সেজে জিসানের বাইকে চড়েছিল। পরে তাকে হত্যা করে বাইক ছিনিয়ে নেয়। ২০১৯ সালের ২৫ আগস্ট দিবাগত মধ্যরাতের ঘটনা। রাজধানীর মালিবাগ ফ্লাইওভারের তৃতীয় তলায় মিলন (৩৫) নামে এক যুবককে গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তারা মিলনের মোটরসাইকেলটিও ছিনিয়ে নিয়ে যায়। মিলন অ্যাপসভিত্তিক রাইড শেয়ারিং ‘পাঠাও’য়ের চালক ছিলেন। দুই সন্তানের জনক মিলন পরিবারের সঙ্গে মিরপুর-১ গুদারাঘাট এলাকায় থাকতেন। পুলিশ জানতে পারে, মিলনের লাস্ট কল ছিল ৭ আগস্ট। হয় এর মাঝে সে পাঠাও চালায়নি অথবা চালিয়ে থাকলেও অ্যাপস ছাড়াই যাত্রী পরিবহন করেছেন। ঘটনার পর ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটিও উধাও। ধারণা করা হচ্ছে, যাত্রীবেশে ছিনতাইকারী তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে মোটরসাইকেলটি নিয়ে পালিয়েছে। পুলিশ জানায়, মিলন এক যাত্রীকে মালিবাগ চৌধুরীপাড়ায় নামিয়ে দেয়। যাত্রী নামানো শেষে মালিবাগ-মৌচাক উড়ালসড়কের আবুল হোটেলের ঢালে ওঠার সময় গ্রেফতারকৃত নুর উদ্দিন ভিকটিম মিলনকে সিগন্যাল দিয়ে থামিয়ে গুলিস্তান যাবে বলে ৫০ টাকায় ভাড়া ঠিক করে। ফ্লাইওভারের সবচেয়ে উপরের সড়কে পৌঁছালে মোটরসাইকেল থামাতে বলে নুর উদ্দিন। মোটরসাইকেল থামানোর পর নুর উদ্দিন মিলনকে বলে সে মোটরসাইকেল চালাবে। এতে মিলন রাজি হয় না। সে বলে আপনাকে আমি কেন মোটরসাইকেল চালাতে দিব? এভাবে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। সুযোগ বুঝে নুর উদ্দিন এন্টি কাটার দিয়ে মিলনের গলায় উপর্যুপরি আঘাত করে ফ্লাইওভারে রেখে মোটরসাইকেল ও মোবাইল নিয়ে চলে যায়। ঘটনার পর শাহজাহানপুর থানায় মামলা করেন মিলনের স্ত্রী শিল্পী বেগম। এরপর মামলার তদন্ত শুরু করে ডিবি পুলিশ। তারই ধারাবাহিকতায় তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় শাহজাহানপুর থানা এলাকা থেকে এই হত্যাকান্ডে অভিযুক্ত নুর উদ্দিন ওরফে সুমনকে গ্রেফতার করে ডিএমপির গোয়েন্দা পূর্ব বিভাগ। শুধু মোটরবাইক নয়, উত্তরায় উবার চালককে গলা কেটে হত্যা করে গাড়ি ছিনতাইয়ের চেষ্টা করা হয়। দুর্বৃত্তরা গাড়িটি নিতে না পারলেও চালককে হত্যা করে গেছে। এ ঘটনায় খুনিরা ধরা পড়েছে। ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছে। এ তিনটি ঘটনাই নয়, আরও বেশ কয়েকটি ঘটনা রাজধানীর সড়কে ঘটেছে। যাত্রীবেশী খুনি পেছনের সিটে বসা রয়েছে, তা পাঠাও বা উবার চালক ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারে না। যাত্রীর কথামতো চালক কোনো নীরব জায়গায় যাওয়া মাত্রই তারা আক্রান্ত হচ্ছেন। কেউ প্রাণ হারাচ্ছেন, কেউ জীবন-জীবিকার অবলম্বনটি ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। যারা প্রাণে বেঁচে যাচ্ছেন, তাদের পথে বসে যেতে হচ্ছে। আর প্রিয় মানুষকে হারিয়ে পরিবারের সদস্যদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় এখন উবার, পাঠাও চালকরা। পুলিশ বলছে, যারা অ্যাপস থাকা সত্ত্বেও অ্যাপস ব্যবহার করছে না, তারাই বিপদে পড়ছে। তাই মধ্যরাতে কোনো নীরব জায়গায় রাইড শেয়ারিং করা থেকে বিরত থাকা উচিত। আর অবশ্যই অ্যাপস ব্যবহার করেই রাইড শেয়ারিং করতে হবে। নিজেদের সচেতন থেকেই রাইড শেয়ারিং করতে হবে।

এই রকম আরও টপিক