দেশে অবৈধ ও নকল পণ্যের বিস্তার রোধে সরকার, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা-সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ এবং কঠোর আইনপ্রয়োগের প্রয়োজন। দেশে অবৈধ পণ্যের বাজার প্রায় ৪০-৫০ হাজার কোটি টাকার। ফলে সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে। আমদানি পর্যায়ে আন্ডার ইনভয়েসিং, আন্ডার ভ্যালুয়েশন এবং ডকুমেন্টেশন ঘাটতির কারণে এ সমস্যা আরও বাড়ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও জনবল সংকটের কারণে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই আমদানি থেকে উৎপাদন ও বিপণন প্রতিটি ধাপেই নজরদারি জোরদার না করলে এ সমস্যা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। গতকাল কালের কণ্ঠ আয়োজিত ‘অবৈধ পণ্যের দৌরাত্ম্য : ব্যবসায়ীদের নাভিশ্বাস, করণীয় কী?’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। ইডব্লিউএমজিপিএলসি কার্যালয়ে এ গোল টেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কালের কণ্ঠের সম্পাদক হাসান হাফিজের সভাপতিত্বে বৈঠকে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। কালের কণ্ঠের বার্তাপ্রধান ফারুক মেহেদীর সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য দেন কালের কণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক হায়দার আলী।
গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. ফিরোজ উদ্দীন, পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (খাদ্যশিল্প ও উৎপাদন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব, বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ক্রাইম-মেট্রো) মো. আশরাফুল ইসলাম (বিপিএম), বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির নির্বাহী পরিচালক সাইফুল ইসলাম, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) পরিচালক (সিএম) মো. সাইফুল ইসলাম, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক (অভিযোগ ও তদন্ত বিভাগ) মো. মাসুম আরেফিন, আবুল খায়ের গ্রুপের গ্রুপ হেড অব করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড লিগ্যাল শেখ শাবাব আহমেদ, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল, আর্লা ফুড বাংলাদেশ লিমিটেডের হেড অব করপোরেট অ্যাফেয়ার্সের আনোয়ারুল আমিন, কনশাস কনজ্যুমার্স সোসাইটির (সিসিএস) সভাপতি ড. আহসান হাবিব, বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন কনসালট্যান্ট জাহিদ রহমান। এ ছাড়া বক্তব্য দেন কালের কণ্ঠের চিফ বিজনেস এডিটর মাসুদ রুমী।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘মানুষ যখন প্রকৃত নাগরিক হয়ে উঠবে, তখনই সে বৈধ-অবৈধকে চ্যালেঞ্জ করবে। আইনপ্রয়োগকারী তখনই আইন প্রয়োগ করতে বাধ্য হবে, যখন জনগণ তাকে বাধ্য করবে। অন্যথায় তিনি তা করবেন না। সেজন্যই এই ধরনের গোলটেবিল আলোচনা জরুরি, যাতে আমরা নাগরিক হয়ে উঠতে পারি, নাগরিক অধিকার আদায় করতে পারি এবং সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে আনতে পারি। জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে অবৈধ পণ্যের দৌরাত্ম্য কখনো কমবে না।’ তিনি বলেন, ‘বাজারব্যবস্থাকে বাজারের নিয়মেই চলতে দিতে হবে। যদি কেউ একচেটিয়াভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে সে নিজেই দাম নির্ধারণ করবে এবং বিভিন্নভাবে প্রভাব বিস্তার করবে। আমরা এমন একটি বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে একটি সুরক্ষাবলয় তৈরি করা হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে সংবাদপত্রগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
কালের কণ্ঠের সম্পাদক হাসান হাফিজ বলেন, ‘এই চ্যালেঞ্জ সম্মিলিতভাবে মোকাবিলা করতে হবে। শুধু সরকার একা পারবে না; বেসরকারি খাতকেও সমানভাবে এগিয়ে আসতে হবে। নতুন সরকার একটি গুণগত পরিবর্তনের সরকার, মানুষের জনপ্রত্যাশার সরকার। দীর্ঘদিনের বঞ্চিত, শোষিত, নিপীড়িত মানুষের স্বপ্ন-আকাক্সক্ষাকে ধারণ করে এই সরকার নির্বাচিত হয়েছে। তাদের সাহায্য করা আমাদের দায়িত্ব, জাতীয় দায়িত্ব। এই সরকার যদি ব্যর্থ হয়ে যায়, তাহলে বাংলাদেশ ব্যর্থ হয়ে যাবে।’ কালের কণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক হায়দার আলী বলেন, খাদ্য, ওষুধ, কসমেটিকসসহ প্রায় সব খাতে ভেজালের সমস্যা ব্যাপক। এ বিষয়ে গণমাধ্যমে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ হলেও কার্যকর পরিবর্তন আনতে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অতিরিক্ত সচিব মো. ফিরোজ উদ্দীন বলেন, দীর্ঘদিনের সামাজিক বাস্তবতায় একটি বড় অংশের মানুষের মধ্যে অসততার প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যা দূর করা সহজ নয়। বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যক্রমে নৈতিকতা, সততা ও সচেতনতার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘মানুষের এই অতৃপ্ত ভোগপ্রবণতাই বাজারে নানা অনিয়মকে উসকে দিচ্ছে। সমস্যাটির পরিসর ভোক্তার আচরণ থেকে শুরু করে করপোরেট সংস্কৃতি এবং সরকারি প্রশাসন পর্যন্ত বিস্তৃত।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, ‘নকল ও ভেজাল পণ্যের সমস্যা মোকাবিলায় আমাদের শুধু উপরিভাগে নয়, বরং সমস্যার গভীরে গিয়ে কারণগুলো বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘ভেজাল পণ্যের সমস্যাটি কেবল একটি নির্দিষ্ট খাতে সীমাবদ্ধ নয়; খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনী-প্রায় সব ধরনের পণ্য উৎপাদন ও বিপণনের প্রতিটি স্তরে এটি ছড়িয়ে পড়েছে। ভেজাল পণ্যের এই চক্র সমাজের প্রতিটি স্তরকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আবুল খায়ের গ্রুপের হেড অব করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড লিগ্যাল শেখ শাবাব আহমেদ বলেন, ‘সিগারেট, ফার্মাসিউটিক্যাল ও কনজ্যুমার, প্রায় সব খাতেই আমাদের ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা রয়েছে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রেই অবৈধ ও নকল পণ্যের একই ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে তিন ধরনের অবৈধ কার্যক্রম চলছে, আইনবহির্ভূত উৎপাদন, আমদানি প্রক্রিয়ার অপব্যবহার বা ম্যানিপুলেশন এবং গ্রে চ্যানেলের মাধ্যমে পণ্য প্রবেশ ও বিপণন।