২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিয়েছেন সরকারি ও বিরোধীদলীয় সদস্যরা। তাঁরা বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশংসা, সমালোচনা ও নানা প্রস্তাব তুলে ধরেছেন। সরকারি দলের সদস্যরা প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘জনকল্যাণমুখী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। অন্যদিকে এই বাজেট গরিবের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে বলে মন্তব্য করেন বিরোধীদলীয় সদস্যরা।
গতকাল জাতীয় সংসদ অধিবেশনে সাধারণ আলোচনায় পর্যায়ক্রমে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। ১৯৭১ সালের ইতিহাস ও ধর্মীয় ইস্যু ঘিরে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে তীব্র বাক্যবিনিময় হয়েছে। আলোচনায় প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধি, দ্রব্যমূল্য, কর ফাঁকি, খেলাপি ঋণ, বাজেট বাস্তবায়ন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অর্থ পাচার, কওমি মাদ্রাসা, সামাজিক নিরাপত্তা, প্রশাসনিক সংস্কারসহ নানান বিষয় উঠে আসে। আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারি দল বিএনপির সংসদ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, এমপিরা যেসব দাবি সংসদে করেছেন তা বাস্তবায়নে বাজেট হওয়া দরকার ছিল ৩০ লাখ কোটি টাকা। বাস্তবে তা সম্ভব না। প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী একটি আর্থিক নীতিমালা উপস্থাপন করেছেন এমন এক সময়ে, যখন সরকারকে বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে তেলসহ নিত্যপণ্যের মূল্য বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই সরকারকে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘জনকল্যাণমুখী’ আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, এই বাজেটের মাধ্যমে একটি স্বৈরাচারী সরকারের সঙ্গে জনগণের সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে। ৪১ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা, শারীরিক প্রতিবন্ধীদের ব্যবহৃত সরঞ্জামের ওপর কর কমানো, স্টার্টআপে সহায়তা এবং ক্যানসার, হৃদরোগ ও চক্ষু চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট ওষুধের দাম কমানোর উদ্যোগ সাধারণ মানুষের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রমাণ। এই বাজেটের মূল দর্শনই জনকল্যাণ।
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বক্তব্যের শুরুতেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সাম্প্রতিক এক মন্তব্যের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, চট্টগ্রামে এখন বলা হচ্ছে, ফতোয়া নিতে আর মাদ্রাসায় যেতে হয় না, ফতোয়া এখন সংসদেই দেওয়া হয়। ‘জামায়াতে ইসলামী ইসলামী দল নয়’ বলে যাঁরা মন্তব্য করছেন, তাঁদের আগে দলটির শতবর্ষের ইতিহাস জানতে হবে। শাহজাহান চৌধুরীর বক্তব্যের পরপরই বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক তাঁর বক্তব্যে সংসদকে অযথা উত্তপ্ত না করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, নিজেদের কথা নিজেদেরই বিচার করা উচিত। একাত্তরের ইতিহাস স্মরণ করতে হবে। স্বাধীনতার মাত্র এক দিন আগে কারা বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিল এবং বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করার চেষ্টা করেছিল, তা ভুলে গেলে চলবে না। প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে বিরোধী দলের সমালোচনার জবাবে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, সমালোচনা অবশ্যই হবে, তবে তা হতে হবে গঠনমূলক। অতীতের মতো এবার বাজেট ঘোষণার পর ‘মানি না, মানব না’ স্লোগান ওঠেনি, যা ইতিবাচক। অতীতের বিভেদ ভুলে সবাইকে একসঙ্গে দেশ গড়ার কাজে শরিক হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘দুঃসাহসী’ ও ‘গগনস্পর্শী’ বাজেট হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বর্তমান সংসদের অধিকাংশ সদস্য অতীতে রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁরা সংসদে জনগণের স্বার্থে ভূমিকা রাখবে। মাত্র চার মাসের মধ্যেই সরকার কাবিখা, কাবিটা, ভিজিএফ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অনুদান, কৃষি সহায়তা, কৃষিঋণ মওকুফ, স্বাস্থ্য কার্ড, পরিবার কার্ডসহ বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে।
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান বাজেটকে জনবান্ধব নয় বলে মন্তব্য করে বলেন, এই বাজেট গরিব মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। বাজেটে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, ভ্যাটের বিস্তার, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কম প্রবৃদ্ধি, খেলাপি ঋণের ভয়াবহ বৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং অর্থ পাচারের বাস্তবতা বাজেটে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। সরকার নির্ধারিত ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য বাস্তবসম্মত নয়। খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা ব্যাংকিং খাতের জন্য বড় সংকেত। বিদেশি ঋণ পরিশোধে সরকার নতুন ঋণের ওপর নির্ভর করছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অভিযোগ এনে সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড, অপহরণ ও ধর্ষণের ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন রফিকুল ইসলাম খান। তিনি গণভোটের মাধ্যমে সংস্কার বাস্তবায়ন, কওমি মাদ্রাসার ১২ থেকে ১৪ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য বিশেষ বরাদ্দ, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সম্মানজনক ভাতা, রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ, প্রশাসনে দলীয়করণ বন্ধ, পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিদেশে অবস্থানরত অন্যান্য মামলার আসামিদের দেশে ফিরিয়ে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।
বাংলাদেশের সামরিক খাতে ৪২ হাজার কোটি টাকা নয়, অন্তত ১ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার আহ্বান জানান বিএনপির সংসদ সদস্য বরকত উল্লা বুলু। তিনি বলেন, বাংলাদেশ কারও বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চায় না, তবে আত্মরক্ষার জন্য শক্তিশালী প্রতিরক্ষা সক্ষমতা প্রয়োজন। উদাহরণ হিসেবে ইরান ও উত্তর কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা না থাকলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে। গাজীপুর ও সাভারে কর্মরত লাখো নারীশ্রমিকের চিকিৎসাসেবার জন্য একটি আধুনিক নারী শ্রমিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার দাবি জানান তিনি।
খাদ্য ও জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল বারী বলেন, বাজারে চালসহ নিত্যপণ্যের দাম বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছে। চালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, এমন দাবি সঠিক নয়। গত ১৭ বছরে প্রশাসন ও ব্যাংকিংব্যবস্থা ধ্বংসের মুখে গিয়েছিল। বর্তমান সরকার তা সংস্কারে কাজ করছে। গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হলে মূল্যস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণে আসবে। বাজেটের একটি টাকাও অপচয় হতে দেওয়া হবে না বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর কর ফাঁকির সমালোচনা করে বিএনপির সংসদ সদস্য মো. শাহজাহান বলেন, সঠিক তদারকির অভাবে অনেক বড় কোম্পানি প্রকৃত কর দিচ্ছে না। অতীতে ‘উন্নয়নের জন্য দুর্নীতি’ সংস্কৃতির কারণে দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন টেকসই হয়নি। অর্থবছর জুন-জুলাইয়ের পরিবর্তে জানুয়ারি-ডিসেম্বর করার প্রস্তাব দেন তিনি।
পোশাক বদলে বা নাম পরিবর্তন করে কোনো বাহিনীর মানসিকতার পরিবর্তন আসে না বলে মন্তব্য করেন বিএনপির সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকার সমালোচনার মুখে পড়ছে, কিন্তু শুধু বাহিনীর নাম বা পোশাক পরিবর্তন করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বিডিআরে সংঘটিত ঘটনাটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এরপর ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশ রাইফেলসের (বিডিআর) নাম পরিবর্তন করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) করা হলেও, এতে সংশ্লিষ্ট সদস্যদের মানসিক ক্ষত বা ঘটনার প্রভাব মুছে যায়নি। সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারে বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান তিনি।