শিরোনাম
প্রকাশ : ১২ মে, ২০২১ ২২:৪৩
প্রিন্ট করুন printer

খুব গভীর থেকে জীবনকে দেখুক মানুষ

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী :

খুব গভীর থেকে জীবনকে দেখুক মানুষ
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
Google News

জীবনটা নাটক না, জীবনটা প্রতিদিন একটু একটু করে আগুনে পোড়া কঠিন বাস্তবতা। সে আগুনে যে পুড়েছে সে জানে পোড়া কয়লা কতটা মূল্যবান। একসময় কয়লা পুড়িয়ে রেলগাড়ি চালানো হতো, যে কয়লার যোগান দিতো মানুষ। সে মানুষটা জানে পোড়া কয়লার অসহনীয় উত্তাপ  তার দেহকে কতটা যন্ত্রণায় দগ্ধ করেছে। তবে এটাই যে নির্মম বাস্তবতা। তার ক্ষুধার্ত পেটে খাদ্যের যোগান দিয়েছে এই কাজটা। তার দেহটা আগুনের দহন জ্বালায় পুড়েছে একটু একটু করে, তারপরও সে কখনো এই পোড়া কয়লার মূল্যকে অস্বীকার করেনি। এই পোড়া কয়লা তার মৌলিক চাহিদা মিটিয়েছে। এর থেকে বড় পাওয়া আর কি হতে পারে। তার জীবনে সান্তনা এতটুকু আগুনের ঝাঁঝে তার শরীরের চামড়াটা কুঁজকে ম্রিয়মান হলেও সে সভ্যতার চাকাকে ঘুরিয়েছে, মানুষের জীবন যাত্রাতে গতি এনেছে।

রেলগাড়ির কথা মনে হতেই সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালির রেলগাড়িটার কথা মনে পড়ে গেলো। ছবিটির সবচেয়ে মনকে ব্যাকুল করা দৃশ্য হলো সাদা কাশফুলের বনে দূর্গা ও অপু দুই ভাইবোনের অপার আনন্দে প্রকৃতিকে দু'চোখ ভরে দেখা এবং সেখানে দাঁড়িয়েই দারুণ বিস্ময় নিয়ে রেলগাড়ি  দর্শন। রেলগাড়ির ঝিকঝিক শব্দে জীবনের কি যেন একটা অপূর্ণতা কঠিন বাস্তবতার ছন্দপতনের ইতিহাস লিখেছিলো সে সময় তা হয়তো অবুঝ দুটি প্রাণ বুঝতে পারেনি। বর্ষায় প্রচণ্ড বৃষ্টিতে ভিজে দূর্গা অসুস্থ হয়ে পড়ে। বিছানায় রোগে কাতরাতে কাতরাতে নির্বাক চোখে দূর্গা অপুকে উদ্দেশ্য করে বলে, ‘সেরে উঠলে আমায় তুই একদিন রেলগাড়ি দেখাবি?’ এই তো জীবন। যে জীবন মানুষের কাছে এতটাই  মূল্যবান সে জীবন মৃত্যুর কাছে ততটাই মূল্যহীন। অপু তার রোগ শয্যায় শায়িত বোনের মৃত্যুকে নিজ চোখে দেখেছে অথচ তার রেলগাড়ি দেখার স্বপ্নটা পূরণ করতে পারেনি। এটাই জীবন যেটা নিজেও পুড়ে, আবার মানুষকেও পুড়ায়। তবে মৃত্যুর বিপরীতে দাঁড়িয়ে জীবন মানুষকে এমন কঠিন সত্যকে শেখায়। মৃত্যু খুব কষ্টের, খুব আবেগের হয় অথচ মানুষ যদি মানুষের মৃত্যু থেকে বেরিয়ে আসা অন্তর্নিহিত বার্তাটি পড়তে পারে, তবে মৃত্যু মানুষের কাছে মহামূল্যবান হয়ে উঠে। 

জীবন মৃত্যুর সাথে আশান্বিত হবার একধরণের গভীর যোগসূত্র আছে। একটা ছোট গল্প অনেকটা এমন, প্রতি রাতে আমরা যখন ঘুমাতে যাই, কোন নিশ্চয়তা নেই আমরা পরের দিন আবার জেগে উঠতে পারব কিনা। তবুও আমরা পরের দিনের জন্য ঘড়িতে এলার্ম দিয়ে রাখি যাতে ঘড়ির এলার্মের শব্দে আবার আমরা ঘুম থেকে জেগে উঠতে পারি। এটাই আশা। আমরা জানি মৃত্যু অবধারিত, যে কোনো সময় জগদ্দল পাথরের বোঝা টানা জীবন  পাখিটা খাঁচা থেকে মুক্ত হয়ে হারিয়ে যেতে পারে। তারপরও মানুষ প্রতিদিন জীবনকে দেখবে বলে একটু একটু করে আশার বীজ বুনে। মৃত্যুকে অতিক্রম করে জীবনের জটিল মনস্তত্ত্বে তাই আশা মানুষের কাছে মূল্যবান সম্পদে পরিণত হয়। 

ঠিক যেমন বিশ্বাস মানুষের কাছে অমূল্য রতনের মতো। তবে বিশ্বাসটা নাটক নাকি শাশ্বত বিশ্বাস সেটা বোধ হয় কষ্টিপাথরে ঘষে ঘষে সোনা চেনার মতোই কঠিন। একটা গল্প মনে পড়লো। একজন ওয়াইফ তার হাজবেন্ডকে জিজ্ঞাসা করলো সে তাকে কতটা ভালোবাসে। হাজবেন্ড এটা কিভাবে প্রমাণ করা যায় তা নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লো। হাজবেন্ড একগুচ্ছ রজনীগন্ধা ফুল তার ওয়াইফের হাতে দিয়ে বললো আমি তোমাকে এতটাই  ভালোবাসি। ওয়াইফ অনেকটা অভিমান করে বললো, কাল সকালেই তো এই ফুল তার সুবাস হারাবে তখন তো ভালোবাসাও হারাবে! এর পরদিন ভালোবাসার প্রমাণ দিতে হাজবেন্ড তার ওয়াইফকে খুব নাম করা একটা পাঁচতারা হোটেলে লাঞ্চ করাতে নিয়ে গেলো। ওয়াইফ এবারও মুখ ভার করে বললো,  এই খাবার তো রাত পেরোলেই হজম হয়ে যাবে তখন আবার ক্ষুদা লাগবে। ভালোবাসাও তো এমন করে একটা সময় পর ফুরিয়ে যাবে! এরপর হাজব্যান্ড একে একে তাকে রক্ত দিয়ে লেখা লাভ উইশ লেটার, স্বর্ণালংকার, দামি আইফোন, নিজের সমস্ত সম্পত্তি উইল করে দিলেও ওয়াইফ তাতেও একটা না একটা অজুহাত খুঁজে বের করতে লাগলো। শেষে একদিন হাজব্যান্ড তাকে নিজের বুক চিরে কলিজা বের করে তার হাতে  দিয়ে বললো আমি তোমাকে এতোটা ভালোবাসি... এরপর সে মারা গেল। ওয়াইফ কলিজাটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করে বললো, একটু পরই তো এটা পচে দূর্গন্ধ বের হবে, ভালোবাসা কি আসলে এমন পচা? এই ভেবে সে কলিজাটা ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করলো। এইতো ভালোবাসা, যা পচে যায়। এইতো বিশ্বাস, যা নর্দমায় ডুবে মরে। এইতো স্বার্থপর পৃথিবী, যা রঙ্গমঞ্চ বানিয়ে মানুষকে নিয়ে খেলে। যেখানে মানুষ মানুষের জন্য জীবন দিয়েও ভালোবাসার বিশ্বাস অর্জন করতে পারে না। বিশ্বাস আর ভালোবাসার অদেখা এই নির্মম ব্যাকুলতা জীবনের কোনো একটা জায়গায় যেন থমকে দাঁড়ায়। জীবনের আয়নায় জীবনের বিপরীত ও কুৎসিত  ছবিটা দেখে আঁতকে উঠে। 

একটা ছবির কথা মনে পড়লো। একটা মস্তকবিহীন মানুষের দেহ তার মুখসহ মাথার বোঝাটা টেনে চলেছে। যে মুখে কথা নেই, যে মাথায় চিন্তা নেই। মানুষের জীবনটা বুঝি এমনই, যেখানে দেহটা মানুষের মুখোশের মুখটা দেখবে না বলে সেটা তার দেহের পিছনে রাখতে চায়। কারুকাজ খচিত মাথার স্নায়ুতন্ত্রটার দেহ থেকে বিচ্ছেদ ঘটাতে চায়। আবার ছবিটার বিষয়টা ভিন্নও তো হতে পারে। যেমন জীবনের সাথে লড়তে লড়তে দুঃসহ যন্ত্রণায় ক্লান্ত হয়ে পড়া একটা মানুষ জীবনের কঠিন বাস্তবতাগুলোকে দেখবে না বলে হয়তো তার মাথাসহ মুখটা মস্তকবিহীন দেহের পিছনে রেখেছে। জীবনটা তো এমনই। যেখানে পলে পলে বদলে যায় জীবনের দৃশ্যপট। কোনটা মূল্যবান আর কোনটা মূল্যহীন সেটা বোঝাটাই তো অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। জীবন মিথ্যের হাত ধরে সত্যের মুখোশ পড়ে। জীবন মন্দের দাস হয়ে ভালোর রাজা সাজে। 

জীবন সব সময় বিপরীতমুখী হতে চায়। জীবন যত না বৈপরীত্য দেখাতে চায় মানুষ তাকে ততটা তাকে টেনে হিচড়ে তা বানাতে চায়। অথচ সমান্তরাল রেখা ছেড়ে জীবনকে সরলরেখায় চলাটা বেশি দরকার ছিল। জীবন একটা অন্ধ মানুষের মতো যে অনেক সূর্যের আলো ও উত্তাপের মধ্যে চলেও ভাবে সে অন্ধকার আর হিমশীতল ঠান্ডার ভিতরে আছে। হয়তো জীবনের ভিতরের দর্শনতত্ত্ব এমনটা অনুভব করতে চায় না। বরং মানুষ যে জীবনকে বেছে নেয় তাকে এমন করে ভাবতে শেখায়। কোনটা সত্য জীবনের মানুষ নাকি মানুষের জীবন। অথবা দু’টোই সত্য। জীবনের যেখানে পরাধীনতা মানুষের সেখানে স্বাধীনতা। জীবনের যেখানে স্বাধীনতা মানুষের সেখানে পরাধীনতা।

কিন্তু এমনটা তো আমরা চাইনা। মানুষ ও জীবন অভিন্ন সত্তা হয়ে স্বাধীন সত্তা হয়ে উঠুক। ভালো -মন্দ, সত্য-মিথ্যা বিচার করতে শিখুক। যা আছে তা পড়ে থাক তার মতো, জীবন চলুক জীবনের নিয়মে। মানুষ চলুক জীবনের গভীর থেকে জীবনকে দেখে জীবনের আনন্দে। জয়তু মানুষ, জয়তু জীবন। সেটা এক সমীকরণে এসে মিলিত হয়ে বলে উঠুক জয়তু মানুষের জীবন, জয়তু জীবনের মানুষ।

বিডি-প্রতিদিন/শফিক