শিরোনাম
১৫ নভেম্বর, ২০২১ ২২:১৮

জলবায়ু সম্মেলন, তহবিল বিতর্ক, কর্পোরেট প্রভাব ও তৃতীয় বিশ্বের শঙ্কা

ড. মঞ্জুরে খোদা

জলবায়ু সম্মেলন, তহবিল বিতর্ক, কর্পোরেট প্রভাব ও তৃতীয় বিশ্বের শঙ্কা

ড. মঞ্জুরে খোদা

দু’সপ্তাহ ধরে চলা-জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন শেষ হলে তা নিয়ে আশান্বিত হবার উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটেনি। জলবায়ু রক্ষার ধনীদেশগুলোর দায় চাপানো ও দায় এড়ানো বক্তব্য থেকে একে গ্রিন ওয়াস বলা যায়। 

সম্মেলনের সময়েই গ্লাসগোসহ বিশ্বের বিভিন্ন শহরের মিছিল-সমাবেশে বিশ্ব নেতৃত্বের ব্যর্থতার তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশ ও পরিবেশবাদীদের মন্তব্য বিষয়টিকে আরো স্পষ্ট করে। চুক্তি নিয়ে নাখোশ সুইডিশ জলবায়ু কর্মী গ্রেটা টুইট করে বলেছেন, কপ২৬ শেষ হলো। সম্মেলনের সারসংক্ষেপ হলো-ব্লা, ব্লা, ব্লা।

সম্মেলনের অর্জন কি? 

সম্মেলনের বিভিন্ন ডকুমেন্ট পড়ে বুঝতে চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু এগুলো বুঝে ওঠা মুশকিল। কারণ এর আলোচনা-দরকষাকষি ছিল বহুমাত্রিক ও বিচিত্র। শেষ পর্যন্ত ধনীদেশগুলোর চাওয়াগুলোই প্রাধান্য পাচ্ছিল। সেখানে উন্নয়নশীল দেশ ও অন্যান্য সংস্থার অবস্থান ছিল অনেকটা পর্যবেক্ষকের মতো। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তঃসরকার প্যানেলের বিশেষজ্ঞ ড. সালিমুল হক বিবিসিকে বলেন, সম্মেলনের বিভিন্ন ডকুমেন্ট-ড্রাফটের যে ভাষা তা সাধারণের পক্ষে বোঝা কঠিন।  

যাই হোক, শেষ পর্যন্ত সম্মেলনে ৩টি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে;
  
১। তাপমাত্রা ১.৫ সে. রাখার পরিকল্পনা যা পরবর্তী বছর পর্যবেক্ষণ করার কথা বলা হয়। 
২। কয়লার ব্যবহার বন্ধ নয়, কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি।
৩। জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আর্থিক সহায়তা বাড়ানো

কার্বণ নিঃসরণের মাধ্যমে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ১.৫ সে এর মধ্যে রাখার আলাপ নতুন নয়। এ আলাপ কিউটো, প্যারিস হয়ে গ্লাসগোতে এলেও তা আরো পর্যবেক্ষণে থাকার’ বছর সময় বেধে দেয়া হলো। কিন্তু তা কোথায় গিয়ে ঠেকবে কে জানে? কয়লা হচ্ছে জলবায়ুর প্রধান শত্রু, তাকে না বলার কথা হলেও শেষ পর্যন্ত চীন-ভারতের চাপে সেখানেও ছাড় দিতে হলো। আর ধনীদেশগুলো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল অনুন্নত ও ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে আর্থিক সহায়তা দানের সে কথাও রাখা হয়নি। গরীবদেশগুলোর ক্ষোভ ও চাপে এ যাত্রা ক্ষমা চেয়ে পার পেলেন। এই গ্রহকে রক্ষার মহাআয়োজন এমনই  টানাপোড়েনে চলেছে। জলবায়ু সম্মেলনের সভাপতি অলোক শর্মাই বলেছেন, এ হচ্ছে এক আপোসের দলিল। জাতিসংঘ মহাসচিব গুতেরেস নানাভাবে তার হতাশার কথা প্রকাশ করেছেন। তাহলে কিভাবে বলা যায় এ অর্জন সফল?

জলবায়ু তহবিলের বিতর্ক 

জলবায়ুর তহবিলের পরিমাণ, বন্টন, ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘ। তহবিলের অর্থ কিভাবে খরচ হবে? এডাপটেশন না মিটিগেশন, তার ভাগ নিয়ে বিতর্কও অমিমাংশিত থাকলো। এডাপটেশন হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর আর্থিক, অবকাঠামো ফসল ও অন্যান্য খাতে যে ক্ষতির হচ্ছে এর সহায়তা আর মিটিগেশন হচ্ছে, কার্বণ নিঃসরণ করে না’ এমন শিল্পে অধিক বিনিয়োগ করা। ধনীদেশ বলছে যা হবার হয়েছে, এখন কার্বণ নিঃসরণে অধিক মনোযোগ দিতে হবে। সেটা করা গেলে ভাল হতো কিন্তু জলবায়ুর ক্ষতির দায় কেন ধনীদেশগুলো এড়াতে চান? কেন গরীব দেশগুলোর কাছে তারা ক্ষমা চেয়ে, ক্ষতির দায় নিয়ে-প্রতিশ্রুত অর্থ দেবেন না, সেটাই বড় প্রশ্ন ও বিস্ময়।  

মিটিগেশনে তাদের আগ্রহের কারণ পরিষ্কার। সেটা করলে তাদেরই লাভ। তাদের অর্থ তাদের ঘরেই থাকবে। তাদের ব্যবসায়ীরাই পরিবেশ বান্ধব শিল্প ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করে মুনাফা করবে। যে কারণে জলবায়ুতে বিশ্বের বৃহৎ পুঁজির মালিকদের আগ্রহ বাড়ছে। জলবায়ু তহবিলের অর্থ এই নয় যে সে অর্থ তারা গরীর দেশগুলোকে দান করবে। সেটা ঋণ হিসেবে দেয়া হবে, সেখানেও কত গড়িমসি। ১২ বছর আগে তাদের বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার দেয়ার কথা থাকলেও দিয়েছে মাত্র তার ৩০ ভাগ।  যার ৭৫ ভাগই খরচ হয়েছে কার্বণ নিঃসরণে।  

জলবায়ু তহবিলের অর্ধেক কার্বণ নিঃসরণ এবং অর্ধেক লস এন্ড ড্যামেজ এর জন্য বলা হয়েছে। ধনীদেশগুলো তা অস্বীকার করছে। তারা এডাপটেশনে মাত্র ২০ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ রাখতে চায়। সেটার পরিষ্কার কোন মিমাংসা না হলেও তারা এ অংশ বাড়ানোর কথা বলেছে, কিন্তু কোন প্রতিশ্রতি দেয়নি। 

কর্পোরেট নজর জলবায়ু রক্ষা না বাণিজ্যে?

সম্মেলনের উদ্যক্তা জাতিসংঘ হলেও এর স্পন্সর ছিলেন বিশ্বের বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী কোম্পানি। যাদের বিরুদ্ধে জলবায়ুর ক্ষতি ও পরিবেশ বিরোধী কাজে সহায়তার অভিযোগ আছে। যে কারণে সম্মেলনে তাদের অংশগ্রহণ নিয়ে পরিবেশবাদীদের তীব্র ক্ষোভ ছিল। পরিবেশবাদী সংগঠন ‘গ্লোবাল উইথনেস’ এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদনই প্রকাশ করেছে। 

জাতিসংঘের এ জলবায়ু সম্মেলনে স্পন্সর হিসেবে ছিল ইউনিলিভার, মাইক্রোসফট, হিটাচি, গ্লাক্সো-স্মিথক্লাইন, জাগুয়ার-ল্যান্ড রোভার, স্কাই, গুগোল ও আইকিয়ার মতো প্রায় ২ ডজন করপোরেট জায়ান্ট। তাদের ছিল পাঁচশোর অধিক প্রতিনিধি। যাদের বেশীরভাগ বিশ্বের বৃহৎ তেল-গ্যাস কোম্পানির সাথে যুক্ত। তারাই ছিল সম্মেলনে উপস্থিত সর্ববৃহৎ প্রতিনিধি দল। তারা শুধু সেখানে উপস্থিতই হয়নি, সম্মেলনের অদূরে আলাদা স্টল করে পরিবেশ বান্ধব পণ্য যেমন, দোতলা বাস. ব্যাটারি চালিত গাড়ি, ক্ষুদ্র বিমান, ট্রাক্টর, ডিগার প্রভৃতির প্রদর্শনী করেছেন। তাদের উদ্ভাবিত নবায়নযোগ্য জ্বালানি নির্ভর পণ্য ভবিষ্যত ব্যবস্যার উদ্দেশ্যে।  

ধনীদেশগুলো কার্বণ নিঃসরণে অধিক বিনিয়োগের কথা বলছে। সেখানেই তাদের স্বার্থ। তাদের পক্ষ থেকে সরকারি খাতের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও জলবায়ু রক্ষার প্রকল্পের সাথে যুক্ত করার আলাপকে জোড়ালো করা হয়েছে।   
 
জলবায়ু সম্মেলনে বেসরকারি কোম্পানির অংশগ্রহণ নতুন নয়। প্যারিসেও তারা ছিল কিন্তু সেখানে তারা এতটা সরব ছিল না। বিশ্ব নেতাদের সাথে এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে তারও বক্তব্য রেখেছেন। এরমধ্যে মহাকাশে পর্যটন ব্যবসার বেপরোয়া বেজোসও ছিলেন। যার বিরুদ্ধে পরিবেশ বিরোধীদের অর্থ সহায়তার অভিযোগ আছে।  

বেসরকারি খাতের প্রভাব গরীব দেশকে শঙ্কিত করবে 

উন্নয়নশীল দেশগুলো দাবি তুলেছে ২০৩০ সাল নাগাদ জলবায়ু সংকট নিরসনে বছরে তাদের জন্য ১,৩০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল করার। ২০২৫ সালের মধ্যে ধনী দেশগুলোকে অন্তত দ্বিগুণ তহবিল দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি অনুযায়ী তারা বছরে যে ১০০ বিলিয়ন অর্থায়ন করতে চেয়েছিল এ অর্থ পেতে ২০২৫ সাল লেগে যেতে পারে। জলবায়ু তহবিলের অংক, বন্টন, প্রাপ্তি ও খাত নিয়ে নানা শঙ্কা টানাপোড়েন থাকলেও সরকার ও জাতিসংঘকেই এর প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে।   

গরীর দেশগুলোর ভয় জলবায়ু রক্ষায় বেসরকারি খাত যুক্ত হলে তা মোকাবেলার কৌশলে অগ্রাধিকার পাল্টে যাবে। দুর্গত মানুষের পুনর্বাসন-ব্যবস্থাপনার চেয়ে কার্বন নিঃসরণকে অধিক গুরুত্ব দেয়া হবে। সেটা হলে তারা পরিবেশবান্ধব শিল্প, যানবাহন, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়বে, ধনীদেশের বড় বড় কোম্পানিগুলোই সে সুযোগ পাবে। সেক্ষেত্রে তারা তাদের মুনাফাকেই অগ্রাধিকার দেবে। সেটা হলে গরীব দেশগুলো আবার ঋণ ও নির্ভরশীলতার জালে আটকে যেতে পারে।   

লেখক: উন্নয়ন গবেষক ও বিশ্লেষক।

বিডি-প্রতিদিন/বাজিত হোসেন

সর্বশেষ খবর