২১ নভেম্বর, ২০২৩ ১০:৫৪

মওলানা ভাসানীর ৪৭তম মৃত্যুবার্ষিকী ও জাতীয় নির্বাচন

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম

মওলানা ভাসানীর ৪৭তম মৃত্যুবার্ষিকী ও জাতীয় নির্বাচন

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম

দেখতে দেখতে এতদিন হয়ে গেল ভাবতেও পারিনি। মনে হয় এই তো সেদিন জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদে সীমান্তে সীমান্তে ঝাড়ে-জঙ্গলে, বনে-বাদাড়ে উল্কার মতো ছুটে বেড়াচ্ছি। প্রথম অবস্থায় তেমন সাড়া পাইনি। সীমান্ত এলাকার উপজাতিরা প্রথম থেকেই আমাদের পাশে আসতে শুরু করে। তাদের জিজ্ঞেস করলে, তোমরা কেন এসেছ? তাদের সোজাসাপটা উত্তর, ‘ওরা জাতির পিতাকে হত্যা করেছে, আমরা তার বদলা নেব।’ তাদের কথায় কোনো কুটিলতা ছিল না, কোনো খাদ ছিল না। সত্যিই তারা বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদে জাতীয় মুক্তিবাহিনী গড়ে তুলেছিল। ৬-৭ মাস যেতে যেতেই আমাদের সমর্থক হিন্দু-মুসলমান দলে দলে অংশগ্রহণ করতে শুরু করে। সেখানে অনেক রাজনৈতিক নেতা, ছাত্র, যুবকর্মী ছিল। একটা সময় সশস্ত্র বাহিনীর অনেক লোক যোগাযোগ করে এবং কেউ কেউ অংশগ্রহণ করে। রক্ষীবাহিনীর অধিকাংশ সদস্যকে সেনা ও অন্যান্য বাহিনীতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দিলে তারাও তাদের বাহিনী থেকে, ক্যাম্প থেকে পালিয়ে আমাদের সঙ্গে অংশগ্রহণ করে। ’৭৫-এর ২১ আগস্ট ঢাকা ছেড়েছিলাম। সে সময় একটা ছোট্ট প্রচারপত্র বিলি করেছিলাম, ‘খুনিরা বঙ্গবন্ধুর তিন পুত্র কামাল-জামাল-রাসেলকে হত্যা করতে পারলেও আমি বঙ্গপিতার চতুর্থ পুত্র কাদের সিদ্দিকী পিতৃহত্যা বিনা প্রতিবাদে যেতে দেব না। যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ পিতৃহত্যার বদলা আমরা নেবই নেব।’ অনেক কষ্টে প্রায় ৪০ ঘণ্টা না খেয়ে সীমান্তে পৌঁছেছিলাম। তার পরের ইতিহাস অনেক লম্বা। সে নিয়ে অন্য কোনো দিন অন্য কোনোখানে লিখব। এক বছর পার হয়ে গিয়েছিল। আমরা তখন বেশ শক্ত সামর্থ্য। সহকর্মীদের সংখ্যা প্রায় ৮-১০ হাজার। নানা জায়গায় সুশৃঙ্খল ঘাঁটি গড়ে উঠেছিল। খাওয়া-দাওয়া, কাপড়-চোপড় সব কিছুতেই কষ্ট ছিল। কিন্তু একেবারে আগের মতো নয়। একবেলা না খাওয়া একবেলা খাওয়া সে রকম নয়। নিয়মিতই খাওয়া-দাওয়া, কাপড়-চোপড়ের ব্যবস্থা ছিল। তবে একটা কথা বলে যাই, বয়স হয়েছে কখন না কখন চলে যাব, পৃথিবীর ইতিহাসে কোথাও স্বেচ্ছাশ্রমে কোনো জনযুদ্ধ গড়ে ওঠেনি। কমবেশি সবাই একটা সম্মানী পেয়েছেন। সেটা ভিয়েতনাম, লাউস, কম্বোডিয়া, কিউবা কিংবা চীন। কোথাও যোদ্ধারা নিয়মিত সামান্য সম্মানী পাননি এমন একটা ঘটনাও নেই। এমনকি আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধেও যারা নিয়মিত বাহিনীর ছিলেন তারাও তাদের বেতন পেয়েছেন। সেটা সামরিক-বেসামরিক সবাই। যারা বা যাদের সামরিক-বেসামরিক চাকরি ছিল না তারাও যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন ৫০ থেকে ১০০ টাকা মাসিক ভাতা পেয়েছেন। প্রশিক্ষণ শেষে দেশে প্রবেশের পথে তাদের হাত খরচ, খাওয়া-দাওয়ার একটা সর্বনিম্ন অর্থ দিয়ে দেওয়া হতো। কিন্তু ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে কাদেরিয়া বাহিনী এবং ’৭৫-এর বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদী যোদ্ধাদের এক পয়সাও সম্মানী বা ভাতা দেওয়া হয়নি। এ এক বিশ্বের বিস্ময়! সীমান্তে প্রায় ৪০০ মাইলজুড়ে ডাউকি থেকে রৌমারী-রাজীবপুর-চিলমারী পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে জাতীয় মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। সেখানে অনেক জায়গায় থানা, অনেক বিডিআর ক্যাম্প আমাদের মুক্ত এলাকার মধ্যে পড়েছিল, যা জাতীয় মুক্তিবাহিনী দখল করে নিয়েছিল।

এরকম অবস্থায় ’৭৬-এর ১৭ নভেম্বর আমি তখন মেঘালয়ের রংরায়। হঠাৎই বিবিসির সাড়ে ৭টার খবরে শুনলাম মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী আর নেই। খবরটি শুনে কতটা দিশাহারা হয়েছিলাম ঠিক বলে বোঝাতে পারব না। মৃত্যু সংবাদ জীবনে অনেক পেয়েছি, অনেক মৃত্যু চোখের সামনে দেখেছি। কিন্তু সবচেয়ে বেশি আঘাত পেয়েছিলাম ১৫ আগস্ট ’৭৫-এ পিতার মৃত্যুতে। বুক ফেটে গিয়েছিল, দিশাহারা হয়ে পড়েছিলাম। সমস্ত চিন্তা-চৈতন্য কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল কোনো বোধশক্তি ছিল না। ঠিক তেমনি আঘাত পেয়েছিলাম হুজুর মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর মৃত্যু সংবাদে। হুজুরকে ’৬০-’৬২ সাল থেকে চিনতাম জানতাম, ২-৪ বার কাছাকাছি চলাফেরাও করেছি। কিন্তু তারও আগে ’৫৭-এর কাগমারী মহাসম্মেলনে হুজুরকে প্রথম দেখেছিলাম। বঙ্গবন্ধুকেও সেখানে পেয়েছিলাম বা দেখেছিলাম। তখনকার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আতোয়ার রহমান খান আরও কত নেতা, গায়ক, শিল্পীর মহামিলন ঘটেছিল সেখানে। সম্মেলন শেষে কাগমারী মাওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজের সামনে এক জনসভা হয়েছিল। অসম্ভব লোকসমাগম হয়েছিল সেখানে। মাইকের গমগম আওয়াজ হৃদয়মূলে নাচন তুলেছিল। আমার এখনো চোখের সামনে সিনেমার পর্দায় ভেসে ওঠার মতো হুজুর মওলানা ভাসানীর দাড়ির নাচন দেখি। আমার মনে হয় আমি আগে হুজুরকে চিনেছি, না হুজুরের দাড়ি চিনেছি। স্বাধীনতার পর তো আমাকে ছাড়া তার চলতই না। যে কোনো ব্যাপারে তার ছিল কাদরীকে প্রয়োজন। কোনো বড় মাহফিল হবে চাল-ডাল-তেল-নুন-মরিচ-পিঁয়াজ-লাউ-কুমড়া-চিনি যা কিছু দরকার ডাকো কাদরীকে। ৫-৭ হাজার টাকার বাজারের তালিকা দিয়ে লুঙ্গির কোঁচা থেকে হয়তো ১২৫-১৩০ টাকা বের করে দিতেন। এটা ছিল তার সারা জীবনের অভ্যাস। তিনি প্রতি বছর খাজা বাবার ওরস করতেন, মুরিদদের নিয়ে জলসা করতেন। খাওয়া-দাওয়ার দায়িত্ব পড়ত আমার ওপর। লোকজনও এ ব্যাপারে প্রচুর সাহায্য করত। যখন যার কাছে যা চেয়েছি বল্লা-রামপুর-টাঙ্গাইল-কালিহাতী-হামিদপুর-গোপালপুর-ঘাটাইল-নাগরপুর-মির্জাপুরের অনেক বিত্তশালী উৎসাহ করে সাহায্য করেছেন। একবার ৫ মণ কাঁচামরিচ, ১০ মণ পিঁয়াজ, ২ মণ রসুন, ১০ মণ আলু, ২-৩ মণ মাছের জন্য হুজুর আমাকে দিয়েছিলেন ১১০ টাকা। এখন সেসব কথা মনে হলে কেমন যেন এক মধুময় আবেশে হারিয়ে যাই। সর্বশেষ ৮ মার্চ ১৯৭৫ কাগমারী মাওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজ সরকারি করতে বঙ্গবন্ধু টাঙ্গাইল গিয়েছিলেন। রাজধানীর বাইরে সেই তার শেষ সফর। টাঙ্গাইলের প্রান্তসীমা গোড়াই থেকে আমি, বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী এবং জননেতা আবদুল মান্নান ভাই বঙ্গবন্ধুর গাড়িতে ছিলাম। কাগমারী সন্তোষে যাওয়ার পথে জাহাঙ্গীর স্মৃতি সেবাশ্রম পরিদর্শন করেছিলেন। মাওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজ মাঠে এক বিশাল জনসভা হয়েছিল। আমাদের নেতা শামসুর রহমান খান শাজাহান ভাই সভা পরিচালনা করছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাকে বলেছিলেন, ‘শাজাহান, তুমি বসে কাদেরকে দাও।’ আমার জীবনে শ্রেষ্ঠ ঘটনা কাগমারী মাওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজ জাতীয়করণের জনসভা পরিচালনা। সেবারও সন্তোষের দরবার হলে খাবার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ছিল আমার ওপর। আরিচার রুই, বাহাদুরাবাদ ঘাটের চিতল, আরও কোথাকার কোথাকার গরু, খাসি সে এক এলাহি কারবার। সেবার তালিকা দিয়ে কোঁচা থেকে বের করে দিয়েছিলেন ১৩৭ টাকা। বাজার খরচ হয়েছিল ১৭-১৮ হাজার। সে এক চমৎকার ব্যাপার। বড় ভালোবাসতেন হুজুর মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। দরিদ্রের বন্ধু, সাধারণ মানুষের আশ্রয় অমন হৃদয়বান মানুষ খুব একটা পাওয়া যায় না। সেই মানুষটি ’৭৬-এর ১৭ নভেম্বর ঢাকার পিজি হাসপাতালে মারা যান। তার জন্য তখন কিছুই করার ছিল না আমার।

আমার জীবনে খুব একটা অতৃপ্তি নেই। যা চেয়েছি প্রায় সব কিছুই পেয়েছি। টাকা, গাড়ি-ঘোড়া, বিষয়-সম্পত্তির জন্য কখনো লালায়িত ছিলাম না। এখনো নই। গাড়ি আছে, বাড়ি আছে। বাড়ি না হয় একটু পুরনো, গাড়ি না হয় আরও বেশি জেরবেরে। কিন্তু চলার মতো সবই আছে। বাড়িতে অফুরন্ত শান্তি আছে। জীবনে যা সব থেকে বেশি প্রয়োজন সে স্বস্তির কোনো অভাব নেই। কিন্তু সারা জীবন একটা সুপ্ত বাসনা ছিল আল্লাহ যদি জাতির পিতার কফিনে কাঁধ লাগাতে দেন, তাঁর দেহ কবরে নামানোর সৌভাগ্য অর্জন করতে পারি সেটা হবে আমার জন্য জীবনের শ্রেষ্ঠ আশীর্বাদ। কামনা ও বাসনা ছিল মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর দেহ কবরে নামানোর। এ দুটির কোনো সাধই পূরণ হয়নি। এই অপূর্ণতা নিয়েই আমাকে এ দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হবে।

হুজুর মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ৪৭তম মৃত্যু দিনে শুক্রবার সকালে তার মাজারে গিয়ে মনটা বেশ ভারী হয়ে গিয়েছিল। সন্তোষে এখন মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে। সে এক যারপরনাই অরাজক অবস্থা। প্রথম প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে আমার সরল-সহজ ভালো মানুষই মনে হয়েছিল। এর আগে একজন ছিলেন যার আবার আমার দাদুর নামে নাম দুর্নীতির খনি। মানুষ এত দুর্নীতি করতে পারে তাও আবার একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভদ্রলোক টাঙ্গাইল না এলে মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর না হলে বোঝা যেত না। ভদ্রলোকের দক্ষতা যোগ্যতাও ছিল না। এখন যিনি ভিসি হয়েছেন তিনি আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল বা টাঙ্গাইল থেকে যখন ঢাকায় ফিরি মূল রাস্তায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভবত ৪টি গেট, ৪টাই খোলা দেখি। কিন্তু সন্তোষে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবকটি গেট বন্ধ। হুজুর মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী একজন ওলি-এ-কামেল। তার ভক্ত মুরিদ বেশুমার। তারপরও গেট বন্ধ। ১৭ নভেম্বর হুজুরের মৃত্যু দিনেও অনেককে ঢুকতে দেওয়া হয়নি, গাড়ি ঢুকতে দেওয়া হয়নি। সেদিনও গেট বন্ধ। কখনো খোলা কখনো আবার বন্ধ। মাজার জিয়ারত শেষে বেরিয়ে আসার পথে এক মোটরসাইকেল আরোহীকে পুলিশ বাধা দেয়। আমি গাড়ি থেকে নেমে পুলিশের সেই সাব-ইন্সপেক্টরকে জিজ্ঞেস করলে তিনি যুৎসই উত্তর দিতে পারেননি। একসময় বলেন, ওপর থেকে বলা হয়েছে। হুজুরের মৃত্যু দিনেও যদি এরকম কপাট বন্ধ থাকে তাহলে তো বিশ্ববিদ্যালয়টা হুজুরের স্মৃতি বিজড়িত তার পদধূলি মাখা আঙিনায় না হওয়াই ভালো ছিল। অন্য কোথাও হলেই হতো। এলাকায় একটা মারাত্মক উত্তেজনা চলছে। আমি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর একজন ভক্ত বলে অনেক মানুষ আসে অনেক অভিযোগ করেন। যেমন আওয়ামী লীগের লোকেরা আসে, আওয়ামী লীগ নিয়ে অনেক কথা বলে। এই গত পরশু তৃণমূল বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তৈমূর আলম খন্দকারের ‘স্বাধীনতা তোমাকে খুঁজছি’ বইটির মোড়ক উন্মোচন করতে প্রেস ক্লাবে গিয়েছিলাম। এক বক্তা বললেন, অনেকেই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন না, আলোচনা করতে পারেন না। আপনি আপনার বোনের সঙ্গে যখন খুশি তখন যোগাযোগ করতে পারেন, কথা বলতে পারেন। আপনি তাঁকে দেশের সার্বিক অবস্থা সঠিকভাবে জানান। বক্তাকে বলেছি, তার কথা একেবারে অসত্য নয়, কিন্তু সম্পূর্ণ ঠিকও নয়। বঙ্গবন্ধুর জমানায় হলে রাত ১টার সময় তাঁর কাছে যেতে পেরেছি, কথা বলতে পেরেছি। এখনো নেত্রীর সঙ্গে কথা বলতে পারি, দেখা করতে পারি। কিন্তু অতটা না। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ভাবনাচিন্তা সেটা তো আমি বদলে ফেলতে পারব না। সত্যিই সন্তোষ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একক ক্যাম্পাস নয়। সেখানে অনেক স্কুল-কলেজ-দাতব্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে, মাজার রয়েছে। প্রবেশের এতটা কড়াকড়িতে প্রচন্ড উত্তেজনা চলছে। হুজুরের পরিবার-পরিজনকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হয় না। এ নিয়েও নানা কথা আছে। একটা মজার ব্যাপার হলো, বাংলাদেশে কখনো দালালের অভাব হয়নি। সেই সুলতানি আমল থেকে মুঘল আমল তারপর ইংরেজ এই বাংলায় যেমন বীরের অভাব হয়নি, তেমনি মীরজাফরের অভাব হয়নি। ভালোমন্দ মিলেই এই বাংলা। তাই জিনিসগুলো গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার। দু-একটা পত্রিকায় দেখলাম বিপুল লোকসমাগম হয়েছে। না, কথাটা সত্য নয়। টাঙ্গাইল শহরে তো বোঝাই যায়নি যে সেদিন ভাসানী হুজুরের মৃত্যুর দিন। এত বড় একজন মানুষ তার মাজারে গিয়েও বোঝা যায়নি, যা কাপড়-চোপড় বা অন্য জিনিসপত্র বিক্রেতাদের পসরা সাজিয়ে বসে থাকতে দেখা গেছে। আমি যখন গিয়েছিলাম তখন হাজারের বেশি লোক ছিল না। সেখানে আমাদেরই ৪-৫’শ ছিল। জাতীয় পার্টিকে দেখলাম, ছাত্রলীগ ছাত্রলীগ বলে ৭০-৮০ জনকে নিয়ে একটা দলকে মাজারে যেতে দেখেছি, একেবারে বেরিয়ে আসার পথে শতাধিক লোকের একটি মিছিল যেখানে বীর মুক্তিযোদ্ধা আনিসকে দেখলাম। এরপর মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট থেকে টাঙ্গাইল শহর পর্যন্ত ১০ জনেরও একটা মিছিল দেখিনি। তাই আবেগ বিবেক অনুভূতি সব বন্ধ হয়ে গেছে। এসব ব্যাপারে আমি খুবই চিন্তিত। আমরা যদি অতীতকে ভুলে যাই, অতীতের ত্যাগী নেতাদের ত্যাগ-তিতিক্ষা ও ভূমিকার মূল্যায়ন করতে না পারি তাহলে ভবিষ্যতে অন্ধকার বিদূরিত করে আলোর পথের খোঁজ পাব কী করে?

জাতীয় নির্বাচন নিয়ে চরমভাবে শঙ্কা। আমরা মনেপ্রাণে চাই একটা সুন্দর সুষ্ঠু নির্বাচন হোক। নির্বাচন কমিশনের সেখানে সহায়ক ভূমিকা পালন করা উচিত। কিন্তু দেখছি অনেক ক্ষেত্রে তারা বিভ্রান্তি ছড়িয়ে যাচ্ছেন। বিভিন্ন দলের জোটবদ্ধ হওয়ার জন্য সময় গত পরশু পার হয়ে গেছে অথচ মার্কা বরাদ্দের আগ পর্যন্ত জোটবদ্ধ হওয়ার সুযোগ থাকার কথা। সব সময় দেখেছি মনোনয়নপত্র দাখিলের ৬-৭ দিন পর মনোনয়ন যাচাই-বাছাই, প্রত্যাহার, পরদিন মার্কা প্রদান এবং সভা-সমাবেশ শুরু। এবার ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়তে গিয়ে নির্বাচন কমিশন মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় দিয়েছে ১৩-১৪ দিন, যাচাই-বাছাই ১৭-১৮ দিন, তারপর প্রতীক বরাদ্দ। এসব মোটেই যুক্তিসংগত নয়। তফসিল এবং নির্বাচন অন্তত আরও এক সপ্তাহ পিছিয়ে দেওয়া অতি সহজেই সম্ভব ছিল। কেউ কারও মতামত নেয় না, কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করে না। সবই কেমন যেন নিজে নিজেই মাদবর। আবার বিশ্ব মোড়ল আমেরিকা নিরপেক্ষ ভোট চায়, যথার্থ ভোট চায়, তারা কোনো দলের পক্ষ নন, তারা দেশ এবং জনগণের পক্ষে। অথচ মাদবর সাহেবরা এমন দৌড়ঝাঁপ করছেন এ যেন তাদের নির্বাচন। এখনকার আমেরিকার রাষ্ট্রদূতের ছোটাছুটি ছটফটানিতে মনে হয় তিনি যেন বিএনপি নেতা তারেক রহমানের কোনো ছোটখাটো কর্মী। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টির কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন আলোচনায় বসে সবকিছু ঠিকঠাক করতে। বিশ্ব মোড়ল আমেরিকাই তো বাংলাদেশে ভেদনীতি শুরু করেছে। ওই তিন দলই তো বাংলাদেশ না, আরও অনেক দল আছে। ১৮ কোটি মানুষের বাংলাদেশ। তাই তাদের সাবধান হওয়া উচিত। তা তারা হয়নি। আমরা আশা করি, এরকম কাজ আমেরিকা কেন, অন্য কোনো দেশেরই করা উচিত না।

মুসলমানের ঘরে জন্মালেই সে মুসলমান হয় না। মুসলমান হতে কোরআন হাদিস আল্লাহ রসুলে বিশ্বাস রাখতে হয়। ইসলামের যে সমস্ত বিধিবিধান অনুশাসন তা মেনে চলতে হয়। ইসরায়েল ফিলিস্তিনির ওপর, গাজার ওপর যে হত্যালীলা চালিয়েছে, চালাচ্ছে তাতে একজন মুসলমানেরও আমেরিকার সঙ্গে থাকার কথা না। সারা দুনিয়া ইসরায়েলের বর্বর আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর। ব্রিটেনে ইসরায়েলি বর্বরতার প্রতিবাদে সর্ববৃহৎ প্রতিবাদ হয়েছে। খোদ আমেরিকাতেও জো বাইডেনের কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ উঠেছে। সেখানে হাজার হাজার ইহুদি অংশ নিয়েছে, তারা ধ্বংস নয় শান্তি চায়। অথচ আমাদের দেশে বিএনপি এবং বিএনপি সমর্থিত লোকজন একটা টুঁশব্দও করেনি। কিছুদিন আগে ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কথার পরিপ্রেক্ষিতে তারেক রহমান বলেছেন, প্যালেস্টাইন আমাদের ইস্যু না, গাজায় হত্যার প্রতিবাদ আমাদের ইস্যু না, পশ্চিমা দেশগুলো আমাদের সমর্থন করছে। তাদের সমর্থন পেতে হলে এসব ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে কোনো কথা বলা উচিত হবে না।’ হায়রে কপাল! এই হচ্ছে জিয়াউর রহমানের ছেলে। যে জিয়াউর রহমান পাকিস্তানের নির্দেশ অমান্য করে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আমি চিন্তামুক্ত হতে পারছি না। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, আগামী দিনগুলো যাতে নির্বিঘ্ন হয়। প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্যের যে আকাশচুম্বী দাম মানুষ শেষ হয়ে যাচ্ছে। কত বড় বড় উন্নয়নের কথা বাজারে গিয়ে কেউ মনে রাখতে পারছে না। আলু-পিঁয়াজ-মরিচ-তেল-আদা-রসুন, চা-চিনি, মাছ-মাংস কোনো কিছুই ছোঁয়া যায় না। সর্বোপরি ওষুধ নিয়ে ভেজাল এবং কালোবাজারির যে দৌরাত্ম্য এবং সকাল বিকাল ওষুধের দাম বাড়তে বাড়তে আকাশছোঁয়া হয়ে গেছে। দুস্থ মানুষ প্রায় মরণাপন্ন। এসব থেকে পরিত্রাণের জন্যই দেশের মালিকানা দেশের মানুষের ফিরে পাওয়া উচিত। আর তা করতে স্বচ্ছ সরকারি প্রভাবমুক্ত নির্বাচনের বিকল্প নেই। মানুষ ইচ্ছামতো ভোট দিতে পারলে এবং তাদের ভোট মর্যাদা পেলে সাধারণ মানুষ মনে করবে দেশ পরিচালনায় তাদের ভূমিকা আছে। সংবিধানের নির্দেশমতো দেশের মালিক জনগণ। এ ভাবনা জনগণের মধ্যে একবার জাগ্রত হলে অর্ধেক সমস্যা আপনা-আপনি কর্পূরের মতো উড়ে যাবে। বাকি অর্ধেক দূর করার জন্য আমাদের সবাই মিলেমিশে কাজ করতে হবে।

লেখক : রাজনীতিক

এই বিভাগের আরও খবর

সর্বশেষ খবর