কবি, সাহিত্যিক ও লেখকদের সৃষ্টিশীলতায় কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা নেই এই সত্য নতুন করে প্রমাণিত হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের বইমেলাগুলোতে। আসন্ন আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায় বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে অংশ না নিলেও, বাংলাদেশের কবি-লেখকদের বই বাঙালি পাঠকদের কাছে ঠিকই জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের শীতলতার প্রভাব পড়েছে এবারের আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা ২০২৬-এ। আগামী ২২ জানুয়ারি সল্টলেক বইমেলা প্রাঙ্গণে শুরু হতে যাওয়া ৪৯তম এই আন্তর্জাতিক আসরে অংশ নিচ্ছে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন, জাপানসহ বহু দেশ। ফোকাল থিম কান্ট্রি হিসেবে থাকছে আর্জেন্টিনা। তবে প্রতিবেশী বাংলাদেশ এ বছরও এই আন্তর্জাতিক আসরে অংশ নিতে পারেনি, যা অনেক বাঙালি পাঠকের কাছে হতাশার কারণ।
তবে কলকাতার বাইরে পশ্চিমবঙ্গের জেলা পর্যায়ের বইমেলাগুলোতে চিত্রটি ভিন্ন। উত্তর ২৪ পরগনার সদর শহর বারাসাতে ১১ জানুয়ারি শুরু হওয়া বারাসাত বইমেলা-য় বাংলাদেশি লেখকদের বই বিক্রির দৃশ্য চোখে পড়ার মতো। মেলার অন্যতম আকর্ষণ ‘সোনার বাংলা’ বইয়ের স্টলে ভারত ও বাংলাদেশের বইয়ের বিশাল সংগ্রহ রাখা হয়েছে।
বই কিনতে আসা বিএড ছাত্রী নাজনিন সিদ্দিকা বলেন, ‘আমি সাহিত্যের ছাত্রী। বাংলা সাহিত্য পড়তে ভালোবাসি। হুমায়ূন আহমেদ আমার খুব প্রিয় লেখক। এখানে এসে তার অপেক্ষা বইটি কিনেছি। বইটির অনেক বিষয় আমার জীবনের সঙ্গে মিলে গেছে।’
হুমায়ূন আহমেদের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও কাজী নজরুল ইসলামও তার প্রিয় লেখক বলে জানান তিনি।
একই স্টলে হুমায়ূন আহমেদের কাঠ গোলাপ বই হাতে নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন কলেজ শিক্ষার্থী উম্মি কুলসুম। তিনি বলেন,‘আমি গল্পের বই পড়তে ভালোবাসি। এই বইটির কিছু লাইন আমার খুব ভালো লেগেছে। দুই দেশের রাজনৈতিক টানাপোড়েন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রাজনীতির সঙ্গে সাহিত্যকে মেলানো উচিত নয়। সাহিত্য চলবে তার নিজের গতিতে।’
‘সোনার বাংলা’ বুক স্টলের কর্মকর্তা সুদীপ কুমার দাস জানান, বাংলাদেশি লেখকদের বইয়ের চাহিদা আগেও ছিল, এখনও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি বই আনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, ‘এপার বাংলায় বাংলাদেশি বইয়ের চাহিদা খুব বেশি। তাই কুরিয়ারের মাধ্যমে চড়া দামে বই আনতে হচ্ছে। কাঠ গোলাপ, আমি পদ্মজা, পরিযানসহ অনেক বইয়ের চাহিদা রয়েছে। দাম বেশি হলেও পাঠকদের জন্য সংগ্রহে রাখতে হচ্ছে।’
তবে সবকিছুই নির্বিঘ্ন নয়। বাংলাদেশি বই বিক্রি নিয়ে মাঝেমধ্যেই চাপ ও আপত্তির মুখে পড়তে হচ্ছে বই বিক্রেতাদের। স্টলের সামনে বাংলাদেশ সংক্রান্ত ব্যানার সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধও আসে বলে জানান সুদীপ কুমার দাস। তবে পরিচিত পাঠকেরাই খুঁজে খুঁজে এসে তাদের পছন্দের বই সংগ্রহ করছেন।
এর আগে উত্তর ২৪ পরগনার শ্যামনগর বইমেলায় বাংলাদেশি বই বিক্রি ঘিরে সাময়িক উত্তেজনার ঘটনাও ঘটেছিল। যদিও পুলিশ দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, রাজনৈতিক দূরত্ব থাকলেও সাহিত্য এখনও দুই বাংলার পাঠককে একই সুতোয় বেঁধে রেখেছে। সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশি সাহিত্য তার পাঠক ঠিকই খুঁজে নিচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের বইমেলাগুলোতে।
বিডি-প্রতিদিন/আশফাক