শুক্রবার, ১৪ জুন, ২০২৪ ০০:০০ টা
দ্য স্টোরি অব অ্যান আওয়ার

এক প্রহরের গল্প

মূল : কেট শপ্যাঁ, ভাষান্তর : ড. নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়া

এক প্রহরের গল্প

হার্টের সমস্যায় ভুগছেন মিসেস ম্যালার্ড। এ বিষয়টা বিবেচনায় রেখেই স্বামীর মৃত্যু-সংবাদটা তাকে জানানোর আগে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। ছোট বোন জোসেফিন প্রচ্ছন্ন আকার-ইঙ্গিতের আশ্রয় নেন। খানিকটা রাখঢাক করে বড় বোনকে দুঃসংবাদটা জানায়।

মিসেস ম্যালার্ডের স্বামীর বন্ধু রিচার্ডসও এ-দুঃসময়ে পাশে আছেন। বন্ধু ব্রেন্টলি ম্যালার্ডের মৃত্যুর খবরটা পরিবারকে তিনিই জানিয়েছিলেন। রেল-দুর্ঘটনার গোয়েন্দা তথ্যটা যখন সংবাদপত্র-অফিসে আসে, তখন রিচার্ডস সেখানেই ছিলেন। ‘নিহতদের তালিকা’য় বন্ধু ব্রেন্টলি ম্যালার্ডের নামটা একেবারে শীর্ষে দেখতে পান তিনি। খবরের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য তিনি দ্বিতীয় টেলিগ্রামটা না আসা পর্যন্ত পত্রিকা অফিসেই অপেক্ষা করেন। বন্ধু-পত্নীর হৃদরোগের বিষয়টা মাথায় রেখেই তিনি অন্য কারোর মাধ্যমে মর্মান্তিক সংবাদ পৌঁছে দেওয়াটা সমীচীন মনে করলেন না। অসতর্কভাবে এমন একটা দুঃসংবাদ হুট করে পৌঁছে দিয়ে পাছে আবার যাতে কোনো বিপত্তি না ঘটায়, সে আশঙ্কায় তিনি নিজেই সশরীরে এসে খবরটা অতি সতর্কতার সঙ্গে জানান মিসেস ম্যালার্ডের ছোট বোন জোসেফিনকে।

মহিলা মহলে অনেকেই এ মর্মান্তিক ঘটনাটা জানলেও মিসেস ম্যালার্ডের পক্ষে এ দুঃসংবাদের ভার বহন করার সামর্থ্য মোটেই ছিল না।

সংবাদটা শোনামাত্রই শোকে বিহ্বল হয়ে ছোট বোনের কোলে ঢলে পড়েন তিনি। পাগলপারা হয়ে কাঁদতে শুরু করেন অঝোরে। শোকের প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলে নিয়ে ছায়ামূর্তির মতো হেঁটে একা একা চলে যান নিজের কক্ষে। তিনিই চাইলেন না-যে তার সঙ্গে অন্য কেউ আসুক। খোলা জানালার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন খানিকক্ষণ। অনুভব করেন যেন কী এক ভিন্ন রকমের সুখানুভূতি। জানলার পাশে রাখা ইজি-চেয়ারটাতে বসে পড়েন অবসাদে। দেহের ক্লান্তি আর মনের বিষণ্নতা তাকে যেন তাড়িয়ে নিয়ে যায় আত্মার গহীনে।

বাড়ির আঙিনার খোলা চত্বরের গাছগুলোর দিকে নজর পড়ে তার। গাছের শাখায় শাখায় যেন নব-বসন্তের উন্মেষ। বসন্তের উচ্ছ্বল জীবন নিয়ে নতুন সাজে সেজেছে প্রকৃতি। মনে হলো যেন নব-জীবনের উজ্জ্বল উদ্ভাস। বাঁধভাঙা হাসি হাসছে বাসন্তী আবহ। বাতাসে বৃষ্টির শান্তিময় নির্মল নিঃশ্বাস। রাস্তায় ফেরিঅলা তার বিক্রয়-সামগ্রীর ফিরিস্তি দিয়ে চলেছে গলা ফাটিয়ে। দূর থেকে ভেসে আসছে কোনো নিঃসঙ্গ গায়কের সংগীতের মৃদু সুর।

ছাদের কার্নিশে চলছে একদল চড়াই পাখির কিচিরমিচির। প্রাণের উচ্ছ্বাসে ওরা মেতে আছে খেয়ালি খেলায়। বইয়ে চলছে যেন প্রাণের উচ্ছ্বাসের আবেগী ফোয়ারা। পশ্চিমমুখী জানালা পথে দেখা যায় অবারিত আকাশ। এখানে-ওখানে আকাশের ছোপ-ছোপ নীল রং উঁকি দিচ্ছে মেঘের ফাঁকে ফাঁকে।

চেয়ারের কুশনে মাথা রেখে শোকাতুর মিসেস ম্যালার্ড বসে রইলেন নিশ্চুপ, নিথর, নিস্তব্ধ-যেন পটে আঁকা অচল ছবি। শুধু তখনই খানিকটা নড়াচড়া করেন যখন চাপা কান্নার একটা হাহাকার তার বুকের ভিতর থেকে উথলে উঠে গলা-অবধি কাঁপিয়ে তোলে। ঘুমিয়ে পড়ার আগে অনেক শিশু যেমন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে, আর সেই রেশ তার স্বপ্ন দেখা পর্যন্ত থেকে যায়; মিসেস ম্যালার্ডের অবস্থাও অনেকটা তেমনি।

তিনি ছিলেন অল্প বয়সি। চেহারা ফর্সা, সৌম্য-শান্ত। মুখের রেখাগুলোতে বিষণ্নতার ছাপ ফুটে উঠলেও তাতে থাকে শক্তিমত্তা আর বলিষ্ঠতার বিশেষত্ব। সেই রেখাগুলো তার আবেগকে দমন করার মতো শক্তির আভাসই দিত। কিন্তু এখন তার চোখে-মুখে একটা ভাবলেশহীনতার ছাপ। যাকে এক কথায় বলা যায় ‘ব্ল্যাংক লুক’। তার দৃষ্টি আকাশের সেই নীল ছোপগুলোর একটির দিকে স্থির হয়ে আছে। এই নজরে নেই মনের ভাবের কোনো প্রতিফলন। বরং বুদ্ধি-তাড়িত চিন্তা যেন রুদ্ধ হয়ে আছে এই দৃষ্টিরেখায়।

অভাবিত কিছু তার দিকে ধেয়ে আসছে। তিনিও ভয়ে ভয়ে অপেক্ষা করে আছেন সেই পরিস্থিতির জন্য। তবে সেটার-যে স্বরূপ কেমন, তা তার অজানা। হতে পারে খুব সূক্ষ্ম কিংবা তীব্র কিছু। ধরাছোঁয়ার বাইরের কোনো ব্যাপার। অধরা হলেও তিনি তা অনুভব করতে পারছেন। মহাশূন্য থেকে হামাগুড়ি দিয়ে নামছে সেটা। রং-রূপ-শব্দে-ঘ্রাণে পূর্ণ হয়ে হাওয়ায় ভর করে ছুটে আসে তার দিকে। আলতো ছোঁয়ায় ছুঁয়ে যায় তাকে। বুকজুড়ে অনুভব করেন সেটার গুরুভার। অশান্ত হয়ে ওঠে তার বোধ। উত্তেজনায় ভর করে অজানা অস্বস্তি। সেই অজানা জিনিসটাকে তিনি চিনতে শুরু করেন; যেটা তাকে গ্রাস করতে এসেছে। দখল করতে এসেছে তার অস্তিত্বকে। প্রাণান্ত কসরত করেন সেটাকে প্রতিহত করার। তার ধবল, সরু, ক্ষীণকায় হাত দু’খানায় যতটা শক্তি ধরে, সমস্তটা দিয়ে চালায় তার প্রতিরোধ প্রচেষ্টা।

অবশেষে সব চেষ্টা ব্যর্থ। হাল ছেড়ে দিলেন তিনি। পরিস্থিতির কাছে হয়ে যান নিরুপায় সমর্পিত। একটা শব্দ ফিসফিস করে তার আধোখোলা ঠোঁট ঘেঁষে মিলিয়ে যায় শূন্যে। দীর্ঘশ্বাসের প্রতিটা বিরতিতে বারবার অস্ফুটে উচ্চারিত হতে থাকে, ‘মুক্তি, মুক্তি, মুক্তি!’

শূন্যদৃষ্টি আর পেছন থেকে তাড়া করতে থাকা আতঙ্ক উধাও হয়ে যায় তার চোখ-মুখ থেকে। এখন তার দৃষ্টি প্রখর, চেহারা উজ্জ্বল। হৃৎস্পন্দন স্পন্দিত হচ্ছে দ্রুত। প্রবহমান রক্তকণা তার শরীরের প্রতিটি ইঞ্চিতে উষ্ণ। উদ্বেগের লেশমাত্র নেই তার সমস্ত দেহ-মনে।

না, তিনি প্রশ্ন করতে ভোলেননি যে, কোনো একটা দানবীয় আনন্দ কি তাকে কব্জা করে ফেলেছে? কিন্তু ব্যাপারটা একটা তুচ্ছ বিষয় হিসেবে খারিজ হয়ে যায়। কারণ স্পষ্ট ও উচ্চমার্গের উপলব্ধির কাছে এর কোনোই মূল্যই নেই। এমন নগণ্য বিষয়কে গণ্য করাই বিধেয় নয়। তবে তিনি জানতেন, তিনি আবার কেঁদে ফেলবেন। যখন তিনি দেখবেন, মৃতদেহের স্নেহশীল কোমল হাত দুখানা গুটিয়ে রাখা হয়েছে। দেখবেন, যে-মুখটি তার দিকে সারাটা জীবন তাকিয়েছে কেবল ভালোবাসারই দৃষ্টিতে, সেই প্রেমময় মুখটাকে এখন দেখতে হবে পান্ডুর, নিথর, নিস্তেজ, মৃত। তবে এই তিক্ত মুহূর্ত পেরিয়ে তিনি কল্পনা করলেন অনাগত দিনের কথা, ভবিষ্যতের কথা। আসছে বছরগুলোর একটা দীর্ঘ মিছিল যা একান্তই তার হবে। তিনি নিজে একাই তাদের স্বাগত জানাতে উদ্বাহু। দুবাহু ছড়িয়ে উষ্ণ আলিঙ্গনে সেই দিনগুলোকে বুকে জড়িয়ে নেবেন পরম পুলকে।

সেই আসন্ন বছরগুলোতে তার জন্য বেঁচে থাকার জন্য কেউ থাকবে না; সে বাঁচবে কেবল নিজেরই জন্য। তার প্রবল ইচ্ছাকে অবদমিত করার মতো কেউ থাকবে না। যেমনটা মানুষ বিশ্বাস করে যে, সংসার জীবনে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কটা এমনই যে, জীবনসঙ্গী হিসেবে তারা একজন অন্যজনের ওপর ব্যক্তিগত ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার রাখেন। সে সময়ে তিনি যে কোনো সদয় অভিপ্রায় কিংবা নির্দয় ইচ্ছাকে লঘু অপরাধ বলে মেনে নিতেন। কারণ সংক্ষিপ্ত সে সব মুহূর্তে তিনি ভিন্নরূপ একটা আভায় বিষয়টাকে বিবেচনা করতেন।

তবুও তিনি তার স্বামীকে কখনো-সখনো ভালোবাসতেন, যদিও সচরাচর বাসতেন না। তাতে কী-বা আসে যায়! প্রেম, অমীমাংসিত রহস্য, আত্ম-দৃঢ়তার এই অধিকার মুখে কী গণনা করা যায়-যা আকস্মিক এবং তার সত্তার সবচেয়ে শক্তিশালী আবেগ হিসেবে স্বীকৃত!

‘মুক্তি! শরীর ও আত্মার মুক্তি!’ তিনি ফিসফিস করে বলতে থাকেন।

জোসেফাইন বন্ধ দরজার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে থাকে। চাবি-ফুটোতে ঠোঁট রেখে দরজা খোলার জন্য মিনতি করতে থাকে অবিরাম। কক্ষের ভিতরে আসতে দেওয়ার কাতর আর্জি জানাতে থাকে উপর্যুপরি।

-‘লুইস, দরজা খোলো! আমি অনুরোধ করছি; দরজা খোলো-তুমি নিজেকে আরও অসুস্থ করে ফেলবে। কী পাগলামো করছো তুমি, লুইস? ঈশ্বরের দোহাই, দরজাটা খোলো।’

-‘চলে যাও। আমি নিজেকে অসুস্থ করছি না। মোটেই না। ঠিক আছি আমি।’

তখন তিনি যেন খোলা জানালা দিয়ে জীবনের অমৃত পান করছিলেন।

আসন্ন দিনগুলোর সঙ্গে তখন যেন তার কল্পনার খেয়ালিপনার দাঙ্গা চলছিল। বসন্তের দিন, গ্রীষ্মের দিনগুলি এবং সমস্ত ধরনের দিন-যা সবই তার নিজের হবে। তিনি একটা দ্রুত নিঃশ্বাস ফেললেন যাতে জীবন দীর্ঘ হয়। এই তো গতকালই তিনি কাঁপতে কাঁপতে আরাধনা করেছিলেন দীর্ঘ জীবনের জন্য।

উঠে দাঁড়ালেন তিনি। বোনের অনুরোধ-উপরোধ চেঁচামেচিতে শেষতক দরজা খুলে দিলেন। চোখে-মুখে এক জ্বরাক্রান্ত বিজয়ের উল্লাস। তার অজান্তেই তিনি যেন নিজেকে বিজয়-দেবীরূপে আবির্ভূত হলেন। বোনের কোমর আঁকড়ে ধরলেন। দুজন একসঙ্গে নামলেন সিঁড়ি বেয়ে। রিচার্ডস সিঁড়ির নিচে তাদেরই জন্য অপেক্ষা করছিল।

কেউ একজন হুড়কা-চাবি দিয়ে সদর দরজা খুলছিল। তিনি আর কেউ নন; ব্রেন্টলি ম্যালার্ড। তিনি দরজা খুলে ঘরে ঢোকেন। গায়ের জামা-কাপড়ে ভ্রমণের ছোপ-ছাপ দাগ। পিঠের ব্যাগটা আঁটসাঁট করে বাঁধা। ছাতাটাও যথারীতি সঙ্গেই আছে। তিনি মূলত দুর্ঘটনাস্থল থেকে অনেক দূরেই ছিলেন। এমনকি জানতেনও না যে, আদৌ এ রকম কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে কিনা।

জোসেফাইনের আর্তচিৎকার আর বিলাপ-রোদন শুনে ব্রেন্টলি ম্যালার্ড তো হতবাক। অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।  রিচার্ডস অতি ক্ষিপ্রগতিতে ব্রেন্টলি ম্যালার্ডকে বন্ধু-পত্নীর দৃষ্টির আড়াল করতে চাইলেন। কিন্তু ততক্ষণে রিচার্ডস অনেক দেরি করে ফেলেছেন।

ডাক্তাররা এসে বললেন, ‘মিসেস ম্যালার্ড হৃদরোগে মারা গেছেন- আনন্দই তার মৃত্যুর হেতু’।

এই রকম আরও টপিক

সর্বশেষ খবর