সবুজে ঘেরা ধান খেত। কাদামাটির পথ। পুকুরের টলমলে পানি আর গ্রামের সহজ-সরল মানুষের আন্তরিকতা। এসব মিলেই নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার একদুয়ারিয়া গ্রাম। এটি এখন বিদেশি পর্যটকদের কাছে অনন্য অভিজ্ঞতার এক ঠিকানা। গ্রাম ও গ্রামের জীবন উপভোগ করতে এখানে ছুটে আসছেন দেশি-বিদেশি পর্যটকরা। গত তিন বছরে এ গ্রামে আমেরিকা-নিউজিল্যান্ডের নাগরিকসহ শতাধিক বিদেশি পর্যটক এসেছেন। শহুরে ব্যস্ততা আর আধুনিক জীবনের কোলাহল থেকে দূরে এসে তারা উপভোগ করছেন ভিন্ন এক জীবনধারা।

গ্রামের মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়া, ধান খেত ঘুরে দেখা, গরুর দুধ দোহন শেখা, পুকুরে মাছ ধরা, ক্যারম খেলা কিংবা কাদামাটিতে গড়াগড়ি সব কিছুই তাদের কাছে নতুন ও রোমাঞ্চকর। এ ব্যতিক্রমী উদ্যোগের পেছনে রয়েছেন জাফর তুহিন। ২০২২ সাল থেকে তিনি বিদেশিদের জন্য গ্রামভিত্তিক ভ্রমণ প্যাকেজ চালু করেন। তার গ্রচেষ্টায় একদুয়ারিয়া গ্রাম ধীরে ধীরে ভিনদেশি পর্যটকদের কাছে পরিচিত হয়ে উঠছে। সম্প্রতি গ্রামটিতে এসেছিলেন যুক্তরাজ্যের এক দম্পতি। টাজ ও লিব্বি। কয়েক দিনের অবস্থানে তারা পুরোপুরি মিশে যান গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের ভিডিও ব্লগে উঠে এসেছে গ্রামবাংলার নানা চিত্র।

গরুর দুধ দোহন, পুকুরে মাছ ধরা, রান্না শেখা কী নেই সেখানে! শিশুদের সঙ্গে খেলাধুলাসহ সব কিছুই তারা তুলে ধরছেন নিজস্ব কায়দায়। ভাষার সীমাবদ্ধতা থাকলেও ইশারা-ইঙ্গিতেই তারা সহজে যোগাযোগ করছেন স্থানীয়দের সঙ্গে। বিকালে তারা এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে ঘুরে বেড়ান। পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলেন। কখনো চায়ের দোকানে আড্ডা দেন। আবার কখনো টেলিভিশন দেখে সময় কাটান। তাদের কাছে প্রতিটি মুহূর্তই নতুন অভিজ্ঞতায় ভরপুর। অতিথিদের জন্য জাফর তুহিন তার বাড়ির দ্বিতীয় তলায় থাকার ব্যবস্থা করেছেন। তিনি নিজেই ট্যুর গাইড হিসেবে পর্যটকদের সঙ্গে থাকেন। নির্ধারিত প্যাকেজ অনুযায়ী তিন দিন চার রাতের জন্য ভাড়া রাখা হয়েছে ৪০০ ডলার। অতিরিক্ত সময় থাকলে অতিরিক্ত ভাড়া দিতে হয়। পর্যটক লিব্বি বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ খুবই অতিথিপরায়ণ। এখানকার মানুষের ব্যবহার আমাকে মুগ্ধ করেছে। অল্প সময়েই আমি ডিম ও রুটি বানানো শিখে গেছি। শুরুতে মসলাযুক্ত খাবারে কিছুটা সমস্যা হলেও এখন ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি।’ তার স্বামী টাজ মজা করে বলেন, ‘আমি এখন লুঙ্গি পরা শিখে গেছি। লুঙ্গি পরেই গ্রামে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আমরা আগে একবার এসেছিলাম। সুযোগ পেলে আবারও আসব।’ জাফর তুহিনের এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে এক ভিন্ন গল্প। তার বাবা ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষক। ২০০৫ সালে তিনি নরসিংদী ছেড়ে ঢাকায় পড়াশোনার জন্য যান।

সরকারি তিতুমীর কলেজে ভর্তি হন। পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করে নিজের খরচ চালাতেন। সুযোগ পেলেই বেড়িয়ে পড়তেন দেশের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণে। শ্রীমঙ্গল থেকে শুরু করে বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ে। একসময় ‘নিশিদল’ নামে ভ্রমণপ্রেমীদের একটি দল গঠন করেন তিনি। পরে একটি আন্তর্জাতিক রেস্তোরাঁয় কাজ করার সময় এক মার্কিন পর্যটকের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। তার মাধ্যমে ‘কাউচসার্ফিং’ প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হন। সেখান থেকেই বিদেশি পর্যটকদের আতিথ্য দেওয়ার অভিজ্ঞতা শুরু হয়। করোনা মহামারির সময় গ্রামে ফিরে এসে তিনি এই উদ্যোগকে বাস্তবে রূপ দেন। বর্তমানে তার ‘তাঁবু ট্যুর’ নামে একটি ভ্রমণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যার প্রোফাইল আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম ট্রিপ অ্যাডভাইজার ও এয়ারবিএনবিতেও যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটকরা তার মাধ্যমে একদুয়ারিয়া গ্রামে বেড়াতে আসছেন। স্থানীয় বাসিন্দারাও বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখছেন। গ্রামের বাসিন্দা হিমেল বলেন, ‘আগে কখনো বিদেশি পর্যটক দেখিনি। এখন তাদের আগমনে গ্রামে নতুন এক আনন্দের আবহ তৈরি হয়েছে।’