ফুটবল মাঠে আমরা যে জার্সিটা দেখি সেটা শুধু একটি দেশের পরিচয় বহন করে না, অনেক সময় তার ভাঁজে লুকিয়ে থাকে বহু প্রজন্মের অভিবাসন, বাস্তুচ্যুতি, সংগ্রাম আর নতুন শিকড় গড়ার গল্প। একেকটি গোল, একেকটি দৌড় কিংবা বিজয়ের উল্লাসের পেছনে জড়িয়ে থাকে সীমান্ত পেরোনো অসংখ্য পরিবারের ইতিহাস। আধুনিক বিশ্বকাপ তাই এখন শুধু ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই নয়; এটি বৈশ্বিক অভিবাসনের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি, যেখানে জন্মভূমি, বংশপরিচয় ও আত্মপরিচয়ের গল্প মিলেমিশে তৈরি এক বিশ্বমানচিত্র ...
১৮৮৩ সালে ইতালি থেকে আসা এক বিশাল অভিবাসী স্রোতের সঙ্গে ভেসে অ্যাঞ্জেলো এবং তাঁর স্ত্রী রোসা আর্জেন্টিনায় এসে পৌঁছান। দারিদ্র্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অতিরিক্ত জনসংখ্যার হাত থেকে বাঁচতে এ দম্পতি নিজেদের মাতৃভূমি ছেড়েছিলেন। তাঁরা রোজারিওতে বসতি স্থাপন করেন এবং আর কখনো পেছনে ফিরে তাকাননি। চার প্রজন্ম পর তাঁদের এ পরিবারই বিশ্বকে উপহার দেয় লিওনেল আন্দ্রেস মেসিকে, যিনি বিশ্বের দেখা অন্যতম সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবলার।
মেসি একাই নন। আর্জেন্টিনার স্কোয়াডের আরও পাঁচজন খেলোয়াড় তাঁদের ইতালীয় বংশোদ্ভূত সূত্রের সন্ধান পান। তাঁদের মধ্যে তিনজন হলেন হুলিয়ান আলভারেজ, রদ্রিগো ডি পল এবং জিওভানি লো সেলসো। এমনকি ইতালীয় পাসপোর্টও বহন করেন তাঁরা। আর্জেন্টিনার এ গল্পটি মোটেও ব্যতিক্রমী কিছু নয়। সিডনিভিত্তিক থিংক ট্যাংক ‘ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস’-এর মতে, এ বিশ্বকাপের প্রায় ২৩ শতাংশ খেলোয়াড় বিদেশি ঐতিহ্যের (ফরেন হ্যারিটেজ) অধিকারী। এর অর্থ হলো, ২৭৭ জন খেলোয়াড়ের এমন বংশপরিচয় রয়েছে যা তাঁদের বর্তমান প্রতিনিধিত্বকারী দেশ ছাড়া অন্তত অন্য একটি দেশের সঙ্গে যুক্ত করে। অনেক খেলোয়াড়ের শিকড় তো আবার একাধিক দেশের সীমানাজুড়ে বিস্তৃত।
বিশাল আকারের অভিবাসন এবং ঔপনিবেশিক ইতিহাস দ্বারা আকৃতি পাওয়া দেশগুলোই এ তালিকায় আধিপত্য বিস্তার করছে। এ ক্ষেত্রে ২১ জন বিদেশি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড় নিয়ে ফ্রান্স সবার শীর্ষে রয়েছে, যার পরেই রয়েছে কানাডা (২০), ইংল্যান্ড (১৭), অস্ট্রেলিয়া (১৭), সুইজারল্যান্ড (১৬), নেদারল্যান্ডস (১৫), জার্মানি (১৫), মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (১৩), নিউজিল্যান্ড (১২) এবং বেলজিয়াম (১০)। এ তালিকা থেকে দুটি ধরন বা প্যাটার্ন ফুটে ওঠে। প্রথমটিতে রয়েছে সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো-ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, যারা যুদ্ধোত্তর ইউরোপ পুনর্গঠনের জন্য তাদের উপনিবেশগুলো থেকে শ্রমিক সংগ্রহ করেছিল। কয়েক দশক পরে সেসব অভিবাসীর সন্তান এবং নাতি-নাতনিরা এখন সেই দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব করছে, যা পুনর্গঠনে তাঁদের পরিবার সাহায্য করেছিল।
কিলিয়ান এমবাপ্পে এই ইতিহাসেরই এক ফসল, যিনি প্যারিসে জন্মগ্রহণ করেছিলেন; তাঁর বাবা ক্যামেরুনীয় বংশোদ্ভূত এবং মা আলজেরিয়ান কাবিল বংশের ফরাসি নাগরিক। ইংল্যান্ডের মার্কাস রাশফোর্ডের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য, যাঁর দাদার পরিবার ১৯৫০-এর দশকে ‘উইন্ডরাশ প্রজন্মের’ অংশ হিসেবে ক্যারিবিয়ান অঞ্চল থেকে এসেছিলেন এবং যুদ্ধোত্তর শ্রমের জন্য ব্রিটেনের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন। নেদারল্যান্ডসের সাতজন খেলোয়াড় তাঁদের বংশসূত্রের খোঁজ পান সুরিনামে, যা ডাচরা ১৬৬৭ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত শাসন করেছিল। জার্মানির যুদ্ধোত্তর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বিদেশি শ্রমিকের ওপর নির্ভরশীল ছিল, বিশেষ করে তুরস্ক, মরক্কো এবং যুগোস্লাভিয়া থেকে আসা শ্রমিকদের ওপর। সেই ইতিহাস আজকের জার্মানি স্কোয়াডে স্পষ্ট দৃশ্যমান। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্কোয়াডে যথাক্রমে অন্তত ১২ জন করে বিদেশি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড় রয়েছেন। বহু সাংস্কৃতিক কানাডার ২০ জন খেলোয়াড় ঘানা, আয়ারল্যান্ড, জ্যামাইকা এবং হাইতিসহ অন্তত ১৪টি দেশের সঙ্গে তাঁদের বংশসূত্রের যোগসূত্র খুঁজে পান।
বিদেশি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের সঙ্গে বাস্তুচ্যুতির গল্পও জড়িয়ে থাকে। আলফোনসো ডেভিস ঘানার শরণার্থী শিবিরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যখন তাঁর বাবা-মা লাইবেরিয়ার গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে এসেছিলেন; তাঁর বয়স যখন পাঁচ বছর, তখন তাঁর পরিবার কানাডার এডমন্টনে পুনর্বাসিত হয়। অস্ট্রেলিয়ার আওয়্যার মাবিল ১৯৯৫ সালে কেনিয়ার একটি শরণার্থী শিবিরে জন্মগ্রহণ করেন, যাঁর বাবা-মা সুদানের রাজনৈতিক সহিংসতা থেকে বেঁচে পালিয়ে এসেছিলেন। এ বৈশ্বিক অভিবাসন কেবল ধনী ফুটবল দেশগুলোকেই নতুন রূপ দেয়নি। তুলনামূলকভাবে ছোট দলগুলো এখন ইউরোপে বড় হওয়া এবং তৈরি হওয়া খেলোয়াড়দের নিয়ে দল গঠন করছে। মরক্কোর প্রায় অর্ধেক খেলোয়াড় স্পেন এবং ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করেছেন, যে দুটি শক্তি বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে মরক্কোকে উপনিবেশ বানিয়েছিল। মরক্কোর এ গল্পটি কোনো ব্যতিক্রম নয়। এ টুর্নামেন্টের প্রায় প্রতি চারজন খেলোয়াড়ের মধ্যে একজন অর্থাৎ ১,২৪৮ জনের মধ্যে ২৯২ জন তাঁদের প্রতিনিধিত্ব করা দেশের বাইরে জন্মগ্রহণ করেছেন। পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু করার আগে এ খেলোয়াড়দের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ইউরোপে জন্মগ্রহণ করেছেন, প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং বড় হয়েছেন। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ বিশ্বকাপের ১২৪ জন খেলোয়াড় একটি দেশের হয়ে যুব পর্যায়ে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরু করলেও পরবর্তী সময়ে অন্য একটি দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। অনেকের জন্য এ সিদ্ধান্তটি ছিল নিজের পারিবারিক শিকড়ে ফিরে যাওয়ার মতো। আসলে বিশ্বকাপগুলোতে বরাবরই বিদেশি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়রা অংশ নিয়েছেন। শুরুর দিকের আসরগুলো থেকে শুরু করে ২০১৮ সাল পর্যন্ত টুর্নামেন্টগুলোতে গড়ে প্রায় ৪৭ জন করে এমন খেলোয়াড় থাকতেন। ১৯৯৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে সেই গড় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৭২-এ। ২০২২ সালের বিশ্বকাপে ১৩৭ জন বিদেশি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড় মোট খেলোয়াড়ের প্রায় ১৭ শতাংশ ছিলেন, যা সেই সময়ে একটি রেকর্ড ছিল। বর্তমান আসরটি সেই রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে। একইভাবে চলতি আসরে অন্য সময়ের তুলনায় শরণার্থী থেকে তারকা ফুটবলারের সংখ্যাও বেশি। যারা জীবনের একটা কঠিন সময় পাড়ি দিয়ে নিজের ইচ্ছাশক্তি আর প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বফুটবলের ইতিহাসে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে তুলেছেন।
অ্যান্তনিও রুডিগার, জার্মানি
বিশ্বফুটবলের চূড়ায় পৌঁছানোর এক অনন্য দৃষ্টান্ত অ্যান্তনিও রুডিগার। সিয়েরা লিওনের গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচতে তাঁর বাবা-মা যখন জার্মানিতে আশ্রয় নেন, তখন শরণার্থী শিবিরে জন্ম নেওয়া এ শিশুটিই যে একদিন বিশ্বমঞ্চ কাঁপাবে, তা হয়তো কেউ ভাবেনি। সেই কঠিন অতীত পেছনে ফেলে রুডিগার আজ জার্মানির রণভাগের প্রধান ভরসা এবং রিয়াল মাদ্রিদের মতো ক্লাবের হয়ে দুইবার উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, লা লিগা ও কাব বিশ্বকাপ জয়ী এক তারকা ডিফেন্ডার। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপেও ৩৩ বছর বয়সি এ ডিফেন্ডার তাঁর চেনা আগ্রাসি ট্যাকল ও দুর্দান্ত গতি নিয়ে জার্মানির রণভাগ আগলে রাখছেন। গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলোতে তাঁর নিখুঁত পাসিং ও ৯০ মিনিটের কিয়ারেন্স জার্মানি দলকে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে, যা তাঁকে আজকের ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার হিসেবে প্রমাণ করেছে। শরণার্থী শিবির থেকে বিশ্বমঞ্চের মহাকাব্যিক যাত্রা রুডিগারের সেরা অর্জন।

ভিক্টর মোসেস, নাইজেরিয়া
নাইজেরিয়ার ধর্মীয় দাঙ্গায় মাত্র ১১ বছর বয়সে বাবা-মাকে হারিয়ে ভিক্টর মোসেস প্রাণ বাঁচাতে আত্মীয়র সহায়তায় শরণার্থী হিসেবে যুক্তরাজ্যে আশ্রয় নেন। কিশোর বয়সেই নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর হিসেবে বিশ্বফুটবলে নাইজেরিয়ার সফল নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ক্রিস্টাল প্যালেসের একাডেমি থেকে মোসেস ক্যারিয়ারের সোনালি সময় কাটিয়েছেন চেলসিতে, যেখানে অ্যান্তোনিও কন্তের অধীনে রাইট উইং-ব্যাক পজিশনে তিনি হয়ে উঠেন অপ্রতিরোধ্য। চেলসির হয়ে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ জয়, দুইবার উয়েফা ইউরোপা লিগ এবং এফএ কাপের শিরোপা ছোঁয়ার পাশাপাশি জাতীয় দলের জার্সিতে ২০১৩ সালে আফ্রিকান কাপ অব নেশনস জয় তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা শ্রেষ্ঠত্ব। ২০১৪ ও ২০১৮ বিশ্বকাপে নাইজেরিয়ার আক্রমণভাগের মূল অস্ত্র হিসেবে খেলা মোসেস ২০১৮ সালের পর অবসর নেন। তবে ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে সুপার ইগলসদের ডাগআউটে এবং মাঠের আবহে তাঁর অভিজ্ঞতা তরুণদের অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে।

আসমির বেগোভিক, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা
বসনিয়ার বলকান যুদ্ধ থেকে বাঁচতে মাত্র চার বছর বয়সে সপরিবারে দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া আসমির বেগোভিক আজ বিশ্বফুটবলের এক অতি পরিচিত নাম। শরণার্থী হিসেবে জার্মানি ও পরে কানাডায় আশ্রয় নেওয়া এ গোলরক্ষক ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম সেরা গোলকিপার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। চেলসির হয়ে প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা জয় করা বেগোভিক তাঁর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে স্টোক সিটি, বোর্নমাউথ এবং এভারটনের মতো ক্লাবের গোলপোস্টের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছেন। ২০১৪ সালে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জনে নেতৃত্ব দেন। ২০১৩ সালে স্টোক সিটির হয়ে ৯৮ গজ দূর থেকে করা তাঁর অবিশ্বাস্য গোলটি গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে জায়গা করে নিয়েছিল। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে এসেও ৩৯ বছর বয়সি এ অভিজ্ঞ গোলকিপার মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করছেন।

বার্নার্ড কামুঙ্গো, যুক্তরাষ্ট্র
তানজানিয়ার এক শরণার্থী শিবিরে ১৪ বছর চরম অভাব আর অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটিয়ে দেওয়া বার্নার্ড কামুঙ্গোর ‘রিসেটেলমেন্ট’ প্রোগ্রামের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। এরপর সেই ফুটবলই ওয়ে ওঠে নিজের ভাগ্যবদলের হাতিয়ার। মেজর লিগ সকারের ক্লাব এফসি ডালাসের হয়ে মাঠ কাঁপানো কামুঙ্গো তাঁর গতি আর উইং দিয়ে বক্সে ঢুকে পড়ার ক্ষমতার কারণে আমেরিকান ফুটবলের অন্যতম ফরোয়ার্ড হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনূর্ধ্ব-২৩ দলে দারুণ পারফরম্যান্সের পর ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দলেও তাঁর অভিষেক ঘটে। ২০২৬ সালের হোম বিশ্বকাপে আমেরিকার দলটিতে কামুঙ্গোর মতো তরুণ ও লড়াকু ফুটবলারের উপস্থিতি পুরো স্কোয়াডকে অন্যরকম এক মানসিক শক্তি জুগিয়েছে।

আউয়ের মাবিল, অস্ট্রেলিয়া
দক্ষিণ সুদানের গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচতে আউয়ের মাবিলের পরিবার যখন কেনিয়ায় আশ্রয় নেয়, তখন কাদার মধ্যে প্লাস্টিকের ব্যাগ মুড়িয়ে বানানো বল দিয়ে তিনি ফুটবল খেলা শুরু করেছিলেন। ২০০৬ সালে শরণার্থী হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে আসার পর সেই ফুটবলই হয়ে ওঠে তাঁর ভাগ্য বদলের চাবিকাঠি। ঘরোয়া লিগে অ্যাডিলেড ইউনাইটেডের হয়ে নজরকাড়ার পর তিনি ডেনিশ ক্লাব মিডল্যান্ডে যোগ দেন, যেখানে তিনি ডেনিশ সুপারলিগা এবং ডেনিশ কাপ জয়ের স্বাদ পান, এমনকি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের মঞ্চেও নিজের দক্ষতার প্রমাণ দেন। অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় দল ‘সকারুজ’-এর হয়ে তাঁর সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত ২০২২ বিশ্বকাপের কোয়ালিফায়ারে, পেরুর বিপক্ষে পেনাল্টি শুটআউটে তাঁর নেওয়া স্নায়ুচাপের গোল অস্ট্রেলিয়াকে বিশ্বকাপের টিকিট এনে দিয়েছিল।

এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গা, ফ্রান্স
অ্যাঙ্গোলার শরণার্থী শিবিরে জন্ম নেওয়া এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গার শৈশব কেটেছে যুদ্ধ আর অনিশ্চয়তার ছায়ায়। মাত্র দুই বছর বয়সে সপরিবারে ফ্রান্সে আশ্রয় নেওয়া এ ফুটবলার আজ বিশ্বফুটবলের মাঝমাঠের অন্যতম সেরা এক বিস্ময়বালক। রেনেসের হয়ে ক্যারিয়ার শুরু করে স্প্যানিশ রিয়াল মাদ্রিদের নজর কাড়েন। রিয়ালের জার্সিতে দুইবার উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, লা লিগা, উয়েফা সুপার কাপ ও ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপসহ সব বড় ট্রফি জিতে নিজের ক্যাবিনেট সমৃদ্ধ করেছেন এ মিডফিল্ডার। মাঝমাঠে বল কেড়ে নেওয়া, নিখুঁত ড্রিবলিং ও রক্ষণ থেকে আক্রমণে ওঠার অবিশ্বাস্য ক্ষমতার কারণে তিনি ফুটবলের অন্যতম বহুমুখী বা ‘ভার্সাটাইল’ খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিত। চলমান ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপেও ফ্রান্সের মাঝমাঠের মূল ভরসা তিনি।

মোহামেদ টর, অস্ট্রেলিয়া
কেনিয়ার শরণার্থী শিবিরে জন্ম নেওয়া মোহামেদ টরের ফুটবলার হয়ে ওঠার গল্প যেন স্বপ্ন ছোঁয়ার নথি। গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচতে তাঁর পরিবার যখন লাইবেরিয়া ছাড়ে, তখন শরণার্থী শিবিরের ধুলোবালিই ছিল তাঁর প্রথম খেলার মাঠ। সেখান থেকে পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে আসার পর ফুটবলকেই তিনি নিজের জীবন বদলের প্রধান হাতিয়ার করে তোলেন। ঘরোয়া ফুটবলে সেন্ট্রাল কোস্ট মেরিনার্সের হয়ে দুর্দান্ত পারফরম, পরে ফরাসি ক্লাব রেঁসের রাডারে আসা ও ইউরোপীয় ফুটবলে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। তাঁর গতি, ড্রিবলিং এবং নিখুঁত ফিনিশিংয়ের কারণে খুব দ্রুতই তিনি অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় দল ‘সকারুজ’-এর আক্রমণভাগের অন্যতম প্রধান হন। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে ২০ বছর বয়সি এ তরুণ অস্ট্রেলিয়ার বড় ভরসা।

নেস্ট্রয় ইরানকুন্ডা, অস্ট্রেলিয়া
তানজানিয়ার এক শরণার্থী শিবিরে জন্ম নেওয়া নেস্ট্রয় ইরানকুন্ডার শৈশব ছিল যুদ্ধ আর অনিশ্চয়তার চাদরে ঢাকা। বুরুন্ডির গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচতে তাঁর বাবা-মা যখন দেশ ছাড়েন, তখন হয়তো ভাবেননি তাঁদের এ সন্তান অস্ট্রেলিয়ার ফুটবল ইতিহাসের বিস্ময়বালক হয়ে উঠবে। শরণার্থী হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড ইউনাইটেডের হয়ে মাত্র ১৫ বছর বয়সে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক ঘটে এ ক্ষিপ্রগতির উইঙ্গারের। তাঁর বুলেট গতির শট, অবিশ্বাস্য ড্রিবলিং আর গোল করার সক্ষমতা তাঁকে দ্রুতই নজরে নিয়ে আসে, ফলশ্রুতিতে ২০২৪ সালে ১৮ বছর বয়সে জার্মান বায়ার্ন মিউনিখ তাঁকে দলে ভেড়ায়। অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় দলের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতাদের একজন হওয়া ইরানকুন্ডা। আর ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে ২০ বছর বয়সি এ তরুণ উইঙ্গার অস্ট্রেলিয়ার আক্রমণভাগের প্রধান এক্স-ফ্যাক্টর হিসেবে আলো ছড়াচ্ছেন।

আলপনসো ডেভিস, কানাডা
বিশ্বফুটবলের আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র আলপনসো ডেভিস। ঘানার এক শরণার্থী শিবিরে জন্ম নেওয়া এ ফুটবলারের শৈশব কেটেছে চরম অনিশ্চয়তায়, যেখান থেকে তিনি মাত্র পাঁচ বছর বয়সে সপরিবারে কানাডায় পাড়ি জমান। গতি আর ক্ষিপ্রতার জন্য ডেভিস আজ শুধু কানাডার অধিনায়কই নন, বরং আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা লেফট-ব্যাক ও উইঙ্গার হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। জার্মান জায়ান্ট বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, একাধিক বুন্দেসলিগা এবং ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপের শিরোপা জিতে ক্লাব ফুটবলের সর্বোচ্চ চূড়া স্পর্শ করেছেন। আন্তর্জাতিক মঞ্চে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে কানাডার ইতিহাসের প্রথম গোলটি এসেছিল তাঁর পা থেকে, যা কানাডার নায়কে পরিণত করে। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে ২৫ বছর বয়সি এ মহাতারকাকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে কানাডার সব স্বপ্ন। যদিও হ্যামস্ট্রিং ইনজুরির কারণে গ্রুপ পর্বের সুইজারল্যান্ড, কাতার ও বসনিয়ার বিপক্ষে ম্যাচগুলোতে ডাগআউটে বসেছিলেন, তবু মাঠের বাইরে তাঁর উপস্থিতি দলকে উজ্জীবিত রেখেছে। গ্রুপ রানার্সআপ হিসেবে কানাডা রাউন্ড অব ৩২-এর নকআউট পর্ব নিশ্চিত করেছে।

এরমেদিন দেমিরোভিচ, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা
ইউরোপের বলকান যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা থেকে জার্মানিতে আশ্রয় নিয়েছিল এরমেদিন দেমিরোভিচের পরিবার। জার্মানির হামবুর্গে জন্ম নেওয়া এ স্ট্রাইকারকে অনেকে হয়তো ভুলবশত অন্য কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের ভাবেন, তবে তাঁর শিকড় মূলত বসনিয়ায়। শরণার্থী জীবনের কঠিন পটভূমি থেকে উঠে এসে দেমিরোভিচ আজ বিশ্বফুটবলের অন্যতম এক প্রতিভাবান ও বিপজ্জনক ফরোয়ার্ড। জার্মান বুন্দেসলিগায় অগসবার্গ এবং পরে ভিএফবি স্টুটগার্টের হয়ে তাঁর গোলবন্যা ও দুর্দান্ত পারফরম্যান্স তাঁকে ইউরোপীয় ফুটবলের শীর্ষ স্তরে প্রতিষ্ঠিত করেছে। জাতীয় দলের জার্সিতে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি উয়েফা নেশনস লিগে তাঁর পারফরম্যান্স ছিল নজরকাড়া। মাঠের যেকোনো পজিশন থেকে জাল খুঁজে নেওয়ার ক্ষমতা এবং রক্ষণকে ব্যস্ত রাখার আগ্রাসি মেজাজের কারণে তিনি ফুটবলের অন্যতম সেরা ‘নাম্বার নাইন’ হিসেবে সমাদৃত। ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের এ মৌসুমেও ২৮ বছর বয়সি এ তারকা স্ট্রাইকার তাঁর নিজের ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মে রয়েছেন।

আলী আল-হামাদি, ইরাক
ইরাকের যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে মাত্র এক বছর বয়সে বাবা-মায়ের সঙ্গে দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া আলী আল-হামাদির গল্পটি কেবল একজন ফুটবলারের উত্থান নয়, বরং এক শরণার্থীর বিশ্বমঞ্চ জয়ের মহাকাব্য। সাদ্দাম হোসেনের শাসনের শেষভাগে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাক থেকে পালিয়ে যুক্তরাজ্যে আশ্রয় নেওয়া এ শিশুটিই পরে লিভারপুলের রাস্তায় ফুটবল পায়ে নিজের স্বপ্ন বুনতে শুরু করে। ট্রানমেয়ার রোভার্স ও সোয়ানসি সিটির একাডেমি থেকে নিজেকে তৈরি করে উইম্বলডনে দুর্দান্ত গোলবন্যা বইয়ে দেওয়ার পর, ইংলিশ ক্লাব ইপসউইচ টাউনের হয়ে তাঁর ক্যারিয়ার নতুন উচ্চতা ছোঁয়, যেখানে প্রিমিয়ার লিগে ওঠার লড়াইয়ে তাঁর অবদান ছিল ব্যাপক। ইরাকের জাতীয় দলের জার্সি গায়ে ২০২৩ সালে আরব উপসাগরীয় কাপ (গলফ কাপ) জয় আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাঁর সেরা অর্জন। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে ২৪ বছর বয়সি এ স্ট্রাইকার ইরাকের আক্রমণভাগের মূল ভরসা এবং এশিয়ান ফুটবলের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।