Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ২২ জানুয়ারি, ২০১৭

প্রকাশ : বুধবার, ২০ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৯ জুলাই, ২০১৬ ২৩:৪১
কন্যা-জায়া-জননী
অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত
কন্যা-জায়া-জননী

নারী, পুরুষ, শিশু, বুড়ো এ নিয়েই পরিবার, যার বৃহৎ কলেবর অথবা কতগুলো পরিবারের সমন্বয়ে হয় সমাজ। পরিবারে যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকে তা সাধারণত নারী-পুরুষের মধ্যে অথবা আরও কঠিনভাবে বললে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে। কখনো কখনো শাশুড়ি ও পুত্রবধূর মাঝে। কিন্তু কখনো শাশুড়ি বা স্বামী নির্যাতিত হয় না।   নির্যাতিত হন অতিথি নারীটি যে কিনা পুত্রবধূ হয়ে সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশে এসে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করেন। স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি, দেবর, ননদসহ অনেককেই আপন করে নিতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠেন। যা অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। কেননা বাবা-মায়ের আদরের কন্যা দাদা-দিদার যত্নে লালিত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা আন্তরিক থাকেন, সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া। যেটুকু ব্যতিক্রম তার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জায়াকে তার পতিকে বেশি করে আপন করার প্রচেষ্টাকেই দায়ী করেন পুরো পরিবার। তাদের মনের ভয়, ছেলেটাকে কি হারিয়ে ফেললাম! না ছেলেটা হারিয়ে যাচ্ছে! যে মা-বাবা ২৫ বছর একটা ছেলেকে লালন-পালন করার পর ছেলে হারিয়ে যাবে ভাবেন, তাদের তো ভাবা উচিত, ছেলেটা যদি ভালো থাকে, থাক না তার বা আমাদের পছন্দের জায়ার কাছে। কিন্তু সেটাই কেউ মানতে চায় না। অর্থাৎ অবচেতন মনে মা-বাবাই ছেলের সুখ-শান্তি চাচ্ছেন না।

স্ত্রী-পুরুষের সমস্যাটি একটা বহুবিধ সমস্যার মিশ্র রূপ। লিঙ্গ বৈষম্যের বিভিন্ন দিক থাকলেও তারা একে অপরের থেকে স্বতন্ত্র নয়। বরং তারা একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত এবং একটি অন্যটিকে বাড়িয়ে তোলে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পরিবারে নারীদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার অভাবটি যেমন নারীদের কার্যকর উদ্যোগের ক্ষেত্রে বঞ্চনা ঘটায়, তেমনি তাদের নিজেদের ভালোভাবে জীবনযাপন করার ক্ষেত্রেও ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলে। এ দুই ধরনের বঞ্চনা কেবল সহ-চালক হয়ে একই সঙ্গে এগোয় না, এদের মধ্যে একটি কার্যকারণ সম্পর্কও থাকতে পারে। নারী-পুরুষের বৈষম্য পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকেই চলে আসছে। এ বৈষম্য শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়, লিঙ্গ সম্পর্কের মধ্যে কার্যকারণ যোগসূত্র স্থাপনের জন্যও এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

নারী আন্দোলন এবং নারী জাগরণের মূল উদ্দেশ্য ছিল, নারীদের অবস্থার উন্নতি ঘটানো। বিশেষ করে তারা যাতে ন্যায়সঙ্গত ব্যবহার এবং সম্মান ও মর্যাদা পান সেদিকে লক্ষ রাখা। অর্থাৎ নারীদের হিত সাধনই এ সমস্ত আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য। যদিও যুগ যুগ ধরে নারীদের স্বার্থ, দাবি, ভালোভাবে বেঁচে থাকার অধিকার ইত্যাদি বিষয়গুলো ভূলুণ্ঠিত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে, সেই লক্ষ্যে এ আন্দোলনগুলো ছিল খুবই যথার্থ এবং যুক্তিসঙ্গত। ভুলে গেলে চলবে না, ‘নারীর ভূমিকা শুধু নিষ্ক্রিয় থেকে সমাজকল্যাণের সুফলগুলো গ্রহণ করা নয়, তারা নিজেরাও সক্রিয়ভাবে সামাজিক বিবর্তনের এ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী। ’ এ সামাজিক পরিবর্তন শুধু মহিলাদেরই জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত বা উন্নত করে তা নয়, সেই সঙ্গে পুরুষও এবং তাদের ছেলেমেয়েরাও উপকৃত হয়। এটি নারী আন্দোলনগুলোর একটি অন্যতম তাত্পর্যপূর্ণ অবদান।

এ প্রসঙ্গে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক অমর্ত্য সেনের আন্তঃসম্পর্ক ও প্রসার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যা হলো— ‘নারীদের নিজেদের ভালো থাকার ব্যাপারটি আলোচনা করতে গেলে তাদের জীবন কারক-ভূমিকা ও সমৃদ্ধির মধ্যে যে সুনিবিড় যোগাযোগ রয়েছে সেগুলোর ওপর আলোকপাত করা প্রয়োজন। নানান সামাজিক কারণ নারী উন্নয়নের পথে বাধার সৃষ্টি করে বা তাদের বিভিন্ন ধরনের বঞ্চনার শিকার হতে বাধ্য করে। স্বাভাবিকভাবেই নারীদের কারক-ভূমিকা সেগুলোর আশু সংশোধনের প্রয়োজনীয়তার কথা অস্বীকার করতে পারে না। এভাবেই কারণ বা স্বউদ্যোগ নারী  উন্নয়নের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কে যুক্ত থাকে। অন্যদিক থেকে এ যোগসূত্রটিকে লক্ষ করলে দেখা যায় যে, একজন নারী, যার কর্মক্ষমতা সাংঘাতিকভাবে সীমাবদ্ধ, তার ভালো থাকার বিষয়টিও সে কারণেই এবং সেই অনুপাতেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তাই নারী কল্যাণের যে কোনো ব্যবহারিক পদক্ষেপ নারীর এ কারক-ভূমিকাকে অস্বীকার করতে পারে না। সুতরাং নারী আন্দোলনের কারক-ভূমিকার দিকটির সঙ্গে নারীদের ভালো থাকার বিষয়টি নিবিড়ভাবে যুক্ত। ’

এ ধরনের সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও কারক-মাধ্যম এবং ভালো থাকা, এ দুটি জিনিস অনেকটাই আলাদা। যেমন— একজন ব্যক্তির কারক হিসেবে যে ভূমিকা, রোগী হিসেবে তার ভূমিকা মূলগতভাবে বিপরীত। এটা সত্যি কথা যে, একজন কারককেও নিজেকে অন্তত কিছুটা রোগী হিসেবে দেখতে হয়। উদাহরণস্বরূপ একটি পুরনো সতর্কবাণীর কথা বলা যায়, ‘হে চিকিৎসক, নিজেকে সুস্থ কর’— এখানে চিকিৎসককে একই সঙ্গে কারক এবং রোগী দুজনের ভূমিকাই পালন করার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু তাই বলে কোনো ব্যক্তির কারক-ভূমিকার সঙ্গে আনুষঙ্গিক যেসব বিধি ও দায়িত্ব এসে পড়ে সেগুলোকে কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া যায় না। মহৎ লক্ষ্যে উপনীত হতে হলে একজন কারককে খুবই কার্যকরী ভূমিকা নিতে হয় এবং যেহেতু ব্যক্তির ভালো থাকার দিকটি ছাড়াও অন্যান্য উদ্দেশ্যও এখানে জড়িত থাকে, তাই এ লক্ষ্যগুলোর পরিধি ও পরিসর অনেক ব্যাপক ও বিস্তৃত হয়। তাই শুধু ব্যক্তিগত কল্যাণ বৃদ্ধির চেষ্টার থেকে কারকের ভূমিকা অনেক বিস্তৃত।

নারী আন্দোলনগুলো কারক-ভূমিকার দিকে জোর দিচ্ছে বলে এদের কর্মপরিধি ও ক্ষমতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। পুরনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে অগ্রাহ্য না করেও এর সঙ্গে বেশ কিছু তাত্পর্যপূর্ণ নতুন বিষয় যুক্ত হয়েছে। শুরুর দিকে চিন্তাভাবনাগুলো কেন্দ্রীভূত ছিল নারীর ভালো থাকার ওপর, আরও সঠিকভাবে বললে তাদের ‘খারাপ অবস্থা’ বা তাদের এ অবস্থার জন্য দায়ী বঞ্চনাগুলোর ওপর। এসব ধারণা অবশ্যই তুচ্ছ বা ভ্রান্ত ছিল না। নারীদের ভালো থাকার ক্ষেত্রে বঞ্চনাগুলো নিশ্চিতভাবেই গুরুতর এবং প্রায়শই খুব নির্মম। সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এদের দূরীকরণ একান্তভাবেই প্রয়োজনীয়। নারী বঞ্চনার দিকটির ওপর আলোকপাত করা এবং এসব বৈষম্যকে দূর করার জন্য লড়াই করার যথেষ্ট সঙ্গত কারণ রয়েছে। কিন্তু এসব সত্ত্বেও শুধু ভালো থাকার দিক থেকে নারীদের বঞ্চনার দিকটিকে বোঝার চেষ্টা করলে বা তাদের ‘রোগী’ হিসেবে দেখার ওপর জোর দিলে তাদের নিজেদের মধ্যে পরিবর্তন সাধনের কারক-মাধ্যম রূপে কাজ করার যে অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে সেটিকে ভুলে যাওয়া বা এড়িয়ে যাওয়া হয়। এ ক্ষমতাটি তার নিজস্ব জীবনে, সমাজের অন্যান্য নারীদের জীবনে, বস্তুত সমাজের সব নারী, পুরুষ ও শিশুর জীবনে অসামান্য পরিবর্তন ঘটাতে পারে। অনেক জায়াজীবী অর্থাৎ স্ত্রীর উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল স্বামীও কিন্তু তাদের স্ত্রীদের নির্যাতন করতে ভুলেন না। তবে দরিদ্র স্বামীদের চেয়ে তাদের নির্যাতন অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সুনিপুণ। শুধু নির্যাতিতা তা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেন। পৃথিবীর সৃষ্টি থেকে, ধর্ম প্রবর্তনের মূল থেকে এ বৈষম্যগুলো সমাজপতিরা বা বিদুষী ব্যক্তিবর্গ সমাজে ছোঁয়াছে রোগের বীজের মতো বপন করে গেছেন। যেগুলো হলো— প্রাণে বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে বৈষম্য, পরিবারের সুযোগ-সুবিধা, ঘরের কাজকর্মের অসম বণ্টন, পরিবারের মধ্যে হিংসা ও শারীরিক নির্যাতন।

তথাকথিত এক শিক্ষিত ২৭ বছরের যুবক হিসেবে যেখানে ২৩ বছর বয়সে এমবিবিএস পাস করে (মুক্তিযুদ্ধে এক বছর ব্যয় না হলে ২২ বছরে), চার বছর আমার প্রিয়, স্পষ্টবাদী শিক্ষক অধ্যাপক নূরুল আমিন স্যারের অধীনে কাজ করে যখন সোভিয়েত ইউনিয়নে পিএইচডি করতে যাই, তখন সেখানকার রুশ ভাষার শিক্ষিকা অধ্যাপক দিনা নিকোলায়েভনা অনেক কথার ফাঁকে জিজ্ঞেস করলেন মা কী করেন? যেহেতু বাবা ১৯৭১ এর ১৩ নভেম্বর স্বাধীনতা বিরোধীদের দ্বারা মানসিক এবং শারীরিক নির্যাতিত হয়ে প্রচুর রক্তক্ষরণের জন্য পরলোকগমন করেন। হয়তোবা তার ধারণা ছিল মা নিশ্চয়ই বড় কোনো চাকরি বা ব্যবসা করেন। অপদার্থ এবং অশিক্ষিত ২৭ বছরের যুবক হিসেবে আমার জবাব ছিল, ‘কিছুই করেন না’। সে হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করল কিছুই করেন না। তার মানে তিনি বসে থাকেন, তোমরা খাওয়া-দাওয়া তার মুখে তুলে দাও। লজ্জিত হয়ে বললাম, তিনি ঘরের রান্নাবান্নাসহ আমাদের সাত ভাইবোনের দেখার সব কাজ করে থাকেন। রাশিয়ান ভাষায় ‘দমা খাজাইকা’ অর্থাৎ গৃহকর্ত্রী। তার চোখ ছানাবড়া হয়ে উঠল। তিনি বলে উঠলেন— ‘আমি হলে তা কিছুতেই করতে পারতাম না। ’ এটা সবচেয়ে কঠিন কাজ। যে কোনো কাজের চেয়ে এখানে অনেক বেশি ক্যালরি খরচ হয় এবং তাকে অনেক ক্যালরি গ্রহণ করতে দেওয়া উচিত।

গৃহকর্ত্রী অর্থাৎ মা, দাদি বা স্ত্রী তারা যদি মানসিক শান্তিতে থাকেন তাহলে ওই পরিবার সুখী হতে বাধ্য। যেমনটি যে কোনো পরিবারে যদি একটি শিশু থাকে তাহলে সে পরিবারে হাসির খোড়াক থাকে। সর্বশেষ মনে রাখতে হবে একজন নারী মানেই স্ত্রী, মাতা বা দাদি-দিদা অথবা আপনারই সর্বেসর্বা কন্যা। বাবার কাছে কন্যার তুলনা মিলে না। অধ্যাপক দিনা নিকোলায়েভনার এ বক্তব্য থেকে আমি ‘মা’ সম্পর্কে তথা নারী সম্পর্কে এক বিশাল শিক্ষা গ্রহণ করি। যে শিক্ষা আমাকে কিছুটা হলেও মানবিক গুণাবলির প্রতি আকৃষ্ট করেছিল। তারপরে যেই পরিবেশে বড় হয়েছি অর্থাৎ যে দেশে নারীরা নির্যাতনের শিকার, সেখানে অতি দ্রুত সব বদলায় না। অর্থাৎ কয়লা ধুলে ময়লা যায় না। আমি ব্যক্তিগতভাবে আমার মা, স্ত্রী ও কন্যা তাদের কাছে ঋণী। আমি যখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি তখনো রান্নাঘরে বসে আমার মায়ের কাছে অঙ্ক শিখতাম। যেখানে আমার মা তদানীন্তন আমলে শুধু পঞ্চম শ্রেণি পাস ছিলেন। তখন নাকি চতুর্থ শ্রেণিতে বৃত্তি পরীক্ষা হতো। মা বৃত্তিও পেয়েছিলেন, গ্রামে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার সুযোগ ছিল। তাই করতে পেরেছিলেন, কাছাকাছি উচ্চ বিদ্যালয় না থাকায় তার আর লেখাপড়া হয়নি। এমনকি আমার দাদু তাকে কুমিল্লা শহরে কোনো আত্মীয়ের বাসায়ও রাখতে পারেননি। অবশেষে তার জন্য জুটল বাল্যবিবাহ।

আমার স্ত্রী ডাক্তার। বর্তমানে সে বেশ জনপ্রিয় একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ। তার কাছে আমার ঋণ অপরিসীম। আমার আজকের এ অবস্থান সম্পূর্ণভাবে তার জন্যই। বয়সে যেমন আমার ছোট, মেডিকেল কলেজেও আমার চার বছরের জুনিয়র। অত্যন্ত মেধাবী ও মেজাজী। ছোটবেলা থেকেই আমার একটা বদনাম ছিল, আমি মেজাজী। কিন্তু তুলনামূলকভাবে আমি শান্ত। আমি কেন তার কাছে ঋণী। ১৯৮৭ সালের ঘটনা। ১৯৮৪ সালে আমি সহকারী অধ্যাপক হিসেবে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে যোগদান করি। ১৯৮৭ সালের ২৫ মার্চ মন্ত্রণালয় স্বাক্ষরিত অফিস আদেশ, অতি দ্রুত ২৫ মার্চ বেলা ৩টার মধ্যে আমার হাতে পৌঁছে যায়। আদেশটি হলো আমিসহ চারজনের বদলির আদেশ। দুজনকে রংপুর, দুজনকে রাজশাহী। আমাকে রংপুরে। সরকারি চাকরি করি। রংপুরে যাব। আর যখন শাস্তিযোগ্য বদলি, তখন চট্টগ্রামে থাকার চেষ্টা করব এ মানসিকতা এবং মানসিক দ্বন্দ্ব আমাকে তীব্র যন্ত্রণা দিচ্ছিল। আমার অনুমতি ছাড়াই, প্রকৌশলী মনোয়ার হোসেন সাহেব, যিনি আমার শিক্ষকের (অধ্যাপক নূরুল আমিন) বন্ধু। তার চকবাজারে বাসা। তার মায়ের গলায় ক্যান্সার ছিল। আমি দেখাশোনা করতাম। সেই সুবাদে তিনি তখনকার মন্ত্রী সাকা চৌধুরীকে অনুরোধ করেছিলেন। মন্ত্রীর জবাব শোনার পরে... আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, বদলিস্থলে যাব না। চাকরিকে বঙ্গোপসাগরে বিসর্জন দিয়ে আমার রিজিক রোজগারী পেশায় মনোনিবেশ করব।

নিষ্ঠুর বদলির আদেশ। ২৫ মার্চ স্বাক্ষরিত এবং ৩০ মার্চের মধ্যে যোগদান করতে হবে অন্যথায় তাত্ক্ষণিক অব্যাহতি। অর্থাৎ আমাকে ৭ থেকে ১০ দিনের যে ট্রানজিট দেওয়ার কথা তাও দেওয়া হয়নি। আমার দুঃখ হয় আমাদের বড় ভাই ডা. এহসান সোহবান চৌধুরী অর্থাৎ এহসান ভাইয়ের জন্য এ রকম মেধাবী কোনো ডাক্তার তখনকার দিনে রেডিওলজিতে আসেন না। তিনি শেষতক চাকরি ছেড়ে দিলেন। এতে ক্ষতি হয়েছে পেশার এবং ভবিষ্যৎ ছাত্রদের। তারপরও আমি রংপুরে কাজ করতে যাই, শুধু আমার স্ত্রীর অনুরোধে। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল সহকারী অধ্যাপক হিসেবে চাকরি ছেড়ে দিয়ে যথেষ্ট অর্থবিত্ত হবে, কিন্তু অধ্যাপক হওয়া যাবে না। তার অটল বিশ্বাস আমি চাকরি করলে অধ্যাপক হব এবং সবগুলোই পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়েই হয়েছি। কিন্তু সে কখনো বলেনি আমি একমাত্র চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হতে পারব। আমার একমাত্র কন্যার কাছেও আমি ঋণী, এ কারণে যে তার মধ্যে হলিক্রস অর্থাৎ মিশনারি স্কুলে পড়ার জন্য কিছু মানবিক মূল্যবোধ গড়ে উঠেছে, চাহিদা কমেছে, কিন্তু জেদ মাকে ছাড়িয়ে গেছে। পরবর্তীতে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সুপারিশে দিল্লির সরকারি মেডিকেল কলেজে লেডি হার্ডিঞ্জে পড়তে গিয়ে আরও কিছু উন্নতি হয়েছে সর্বদিকে। যেটা হয়তো কুমিল্লা বা সিলেট মেডিকেল যেখানে ভর্তি হয়েছিল, সেখানে থেকে কোনোক্রমেই হতো না।

যেখানে নারীরা সমাজে সম্মানিত, সমাদৃত হওয়ার কথা সেখানে কিছু কিছু ক্ষেত্রে নির্মম নারীবিরোধী পক্ষপাতী নিদর্শনগুলো খুব সুস্পষ্টভাবে উঠে আসে না। যে কোনো শ্রমের ব্যাপারেও নারীদের ওপর শ্রমের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়, যাকে ‘শ্রম-বিভাজন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেনের ভাষায়— ‘আমি যখন ১৯৭০ সালে লিঙ্গ বৈষম্য নিয়ে প্রথম কাজ করি, তখন দেখে প্রায় হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম যে বহু ব্যবহূত ঐধহফনড়ড়শ ড়ভ ঐঁসধহ ঘঁঃত্রঃরড়হ জবয়ঁরত্বসবহঃ বইটিতে ভিন্ন ভিন্ন পেশায় নিযুক্ত লোকদের ‘ক্যালোরির প্রয়োজনীয়তা’ সম্বন্ধে বলতে গিয়ে গৃহকর্মকে বেছে নেওয়া হয়েছে একটি ‘পরিশ্রমহীন কাজ’ হিসেবে, যাতে নাকি খুব সামান্যই শক্তির দরকার হয়ে থাকে। এ প্রভাবশালী নির্দেশিকা ডঐঙ (ডড়ত্ষফ ঐবধষঃয ঙত্মধহরংধঃরড়হ) ও ঋঅঙ (ঋড়ড়ফ ধহফ অমত্রপঁষঃঁত্ব ঙত্মধহরংধঃরড়হ) দ্বারা যৌথভাবে নিযুক্ত একটি উচ্চ পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছিল।   এক্ষেত্রে মনে হতেই পারে যে, গৃহকর্মকে চমকপ্রদভাবে ‘শারীরিক পরিশ্রমহীন’ কাজ হিসেবে নির্ণয় করার পেছনে এ সুমহান কমিটির সম্ভ্রান্ত সদস্যদের অনভিজ্ঞতা কিছু ভূমিকা পালন করেছিল। ’ যদিও আমার রাশিয়ান ভাষার শিক্ষক অধ্যাপক দিনা নিকোলায়েভনা বলেছিলেন, গৃহকর্তার কাজে অধিক ক্যালরি ব্যয় হয়, তাই তাদের পর্যাপ্ত ক্যালরি দেওয়া উচিত। সম্মানিত হোক নারী সমাজ, জয় হোক নারী জাতির।

লেখক : সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow