মঙ্গলবার, ৩ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ টা

আইসিইউ নিয়ে হাহাকার রংপুরে

অক্সিজেন নেই বরিশালে, মুমূর্ষুরা ঢলে পড়ছেন মৃত্যুর কোলে

নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর ও বরিশাল

আইসিইউ নিয়ে হাহাকার রংপুরে

বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডের সামনে অক্সিজেন সিলিন্ডারের জন্য রোগীর স্বজনদের দীর্ঘ অপেক্ষা -বাংলাদেশ প্রতিদিন

রংপুর বিভাগের আট জেলায় আইসিইউ শয্যা এখনো সোনার হরিণ। অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেকেই ইচ্ছে থাকলেও বেসরকারি আইসিইউ ব্যবহারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

রংপুর ডেডিকেটেড করোনা আইসোলেশন হাসপাতাল যাত্রা শুরু করে গত বছরের এপ্রিল মাসে। ১০০ শয্যার এ হাসপাতালে ১০টি আইসিইউ শয্যাসহ নারী ও পুরুষ রোগীদের জন্য ৯০টি সাধারণ শয্যা রয়েছে। এর মধ্যে দুটি আইসিইউতে সমস্যার কারণে রোগী রাখা হচ্ছে না। সোমবার দুপুর পর্যন্ত করোনা ডেলিকেডেট হাসপাতাল ও রমেক হাসপাতালের সাধারণ শয্যায় করোনা রোগী চিকিৎসা নিচ্ছিলেন ১৬২ জন এবং আইসিইউতে আটজন। স্বাস্থ্য বিভাগ জানায়, আইসিইউ শয্যা রয়েছে মোট ৪৪টি। এর মধ্যে রংপুরে আটটি ও দিনাজপুরে ১৬টি। রংপুরের দুটি বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ বেড রয়েছে ২০টি। কিন্তু সেখানে চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ভুক্তভোগী এক রোগীর স্বজন জানান, বেসরকারি হাসপাতালে প্রতিদিন আইসিইউ শয্যা ভাড়া ১১ হাজার টাকা দিতে হয়। এর পরে ওষুধ পরীক্ষা নিরীক্ষাসহ অন্যান্য খরচ রয়েছে। তাই ধনী ব্যক্তি ছাড়া বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ চিকিৎসা নেওয়া সাধারণ রোগীদের কাছে সোনার হরিণ।

রংপুরের মানবাধিকার কর্মী জোবাইদুল ইসলাম বলেন, রংপুর বিভাগে করোনা পরিস্থিতির অবনতির এই সুযোগে বেসরকারি হাসপাতালগুলো গলাকাটা ফি আদায় করছে। স্বাস্থ্য বিভাগের কোনো মনিটরিং না থাকায় করোনা দুর্যোগে হাসপাতালগুলো অমানবিক কাজ করছেন। বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মোতাহারুল ইসলাম বলেন, আইসিইউ বেড বাড়ানোর চাহিদাপত্র অনেক আগেই দেওয়া হয়েছে।

অক্সিজেন নেই বরিশাল শেবাচিমে : বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (শেবাচিম) করোনা ওয়ার্ডে অক্সিজেনের জন্য হাহাকার চলছে। অক্সিজেন সিলিন্ডারের জন্য সিরিয়াল লিখে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হচ্ছে রোগীদের। ততক্ষণে মুমূর্ষু রোগীরা ঢলে পড়ছেন মৃত্যুর কোলে। করোনা ওয়ার্ড মাস্টার বলছেন, রোগীর প্রভাবশালী স্বজনরা ২/৩টি সিলিন্ডার নিয়ে লুকিয়ে মজুদ রাখেন। অথচ অন্য মুমূর্ষু রোগীরা অক্সিজেনের অভাবে মারা যাচ্ছেন। এদিকে করোনা ওয়ার্ডে দুটি সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্ল্যান্ট থাকলেও কারিগরি ত্রুটির কারণে একটি প্ল্যান্ট পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ পাচ্ছেন না রোগীরা। অপরদিকে ভাড়া দিয়ে বনিবনা না হওয়ায় ইউনিসেফের বসানো অক্সিজেন প্ল্যান্টের কার্যক্রমই শুরু হয়নি। করোনা ওয়ার্ডে অক্সিজেন সিলিন্ডার ব্যবস্থাপনায় সমস্যার কথা স্বীকার করেছেন হাসপাতালের পরিচালক। তিনি দ্রুত এই সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। শেরেবাংলা মেডিকেলের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. মনিরুজ্জামান জানান, করোনা ওয়ার্ডে গতকাল  দুপুর পর্যন্ত চিকিৎসাধীন ছিলেন ৩১৯ জন রোগী। এর মধ্যে আইসিইউ সেবা পাচ্ছেন ২৫ জন রোগী। ১৫ জন রোগী পাচ্ছেন হাই ফ্লো ন্যাসল ক্যানোলা সেবা। সেন্ট্রাল অক্সিজেন সেবা পাচ্ছেন ৮৫ জন রোগী। বাকি ১৯৪ জন রোগীর সিলিন্ডার সেবা প্রয়োজন। দুপুর ১২টায় শেবাচিমের করোনা ওয়ার্ডের সামনে গিয়ে দেখা গেছে, অক্সিজেন সিলিন্ডার বহনকারী খালি ক্যারিয়ার (ট্রলি) নিয়ে তীর্থের কাকের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছেন অর্ধ শতাধিক রোগীর স্বজন। তারা সিরিয়ালে নাম লিখে অক্সিজেন সিলিন্ডারের জন্য অপেক্ষা করছেন। কিছুক্ষণ পর প্রায় অর্ধশত অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে করোনা ওয়ার্ডের সামনে আসে একটি পিকাপ। এ সময় সিলিন্ডার নিয়ে কাড়াকাড়ি হয় রোগীর স্বজনদের মধ্যে। রোগীর স্বজন মো. রুবেল বলেন, ‘করোনা ওয়ার্ডে কেয়ামত চলতেছে। অক্সিজেনের অভাবে ১০/১৫ মিনিট পর পর মুমূর্ষু রোগীরা মারা যাচ্ছে। দেখার কেউ নেই। রুবেল বলেন, গত শনিবার তার মায়ের জন্য একটি অক্সিজেন সিলিন্ডার পেয়েছিলেন। অক্সিজেন শেষ হয়ে যাওয়ার পর নতুন সিলিন্ডার পাওয়ার জন্য গত রবিবার ৮১ নম্বর সিরিয়ালে তার মায়ের নাম লিখিয়েছেন। গতকাল দুপুর পর্যন্ত দেড়শ’ মানুষের নাম অক্সিজেন সিলিন্ডারের সিরিয়ালে লিখিয়েছেন। তার মায়ের জন্য কখন সিলিন্ডার পাবেন তা অনিশ্চিত।

ফয়সাল নামে এক রোগীর স্বজন বলেন, তার রোগীর অক্সিজেন সিচুরেশন ৬০ থেকে ৭০। ডাক্তার বলেছে অক্সিজেন সিচুরেশন ৩০ থেকে ৩৫ না হলে অক্সিজেন সিলিন্ডার দেবেন না। সিচুরেশন ৩০ এ নেমে গেলে তখন সিলিন্ডার পেয়ে কি লাভ।

রোগীর স্বজন নুসরাত বেগম বলেন, গতকাল সকালে তার রোগীর জন্য ৮০ নম্বর সিরিয়ালে অক্সিজেন সিলিন্ডারের জন্য নাম লিখিয়েছেন। সকালে অক্সিজেন সিলিন্ডারের গাড়ি আসার পর সিলিন্ডার ভাগে পাননি। দুপুরেও সিলিন্ডারবাহী একটি গাড়ি এসেছে। কিন্তু তার রোগীর সিরিয়াল আসতে আসতে সিলিন্ডার শেষ হয়ে যায়।

সাইদুল ইসলাম নামে এক রোগীর স্বজন বলেন, কেউ কেউ ২/৩টি অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে লুকিয়ে মজুদ করে রাখেন। আর কোনো কোনো রোগী অক্সিজেনের অভাবে মারা যাচ্ছে।

আব্দুর রহমান নামে এক রোগীর স্বজন বলেন, অক্সিজেন সিচুরেশন কমে যাওয়ার পর রোগীরা যখন ছটফট করে তখন তাকে জরুরিভাবে অক্সিজেন দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সময় মতো অক্সিজেন সরবরাহ না পেয়ে অনেক রোগী মারা যাচ্ছেন। কোনো কোনো স্বজন অর্থের বিনিময়ে অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহ করার অভিযোগ করেন।

করোনা ওয়ার্ডের ওয়ার্ড মাস্টার মশিউর রহমান ফেরদৌস বলেন, বাঙালি কোনোদিন ভালো হবে না। কেউ কেউ ২/৩টি অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে লুকিয়ে মজুদ করে। আর কেউ অক্সিজেন সিলিন্ডার পায় না। কয়েক দিন আগে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ করোনা ওয়ার্ডে অক্সিজেন সিলিন্ডার তল্লাশি করেছে। এ সময় কোনো রোগীর শয্যার নিচে, কারোর পাটির নিচে আবার কেউ পেটিকোটের নিচে অক্সিজেন সিলিন্ডার লুকিয়ে রাখা অবস্থায় পেয়েছে।

এদিকে হাসপাতালের জন্য লিন্ডা বাংলাদেশ নামে একটি কোম্পানির অক্সিজেন ব্যাংক থাকলেও কারিগরি ত্রুটির কারণে পর্যাপ্ত ফ্লো সহ অক্সিজেন সরবরাহ পাচ্ছে না রোগীরা। সংশ্লিষ্টরা জানান, লিন্ডা বাংলাদেশের ৭ হাজার লিটার ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি অক্সিজেন ব্যাংক রয়েছে। এই ব্যাংক থেকে ৪২ মিলিমিটার ডায়ার সরবরাহ লাইন প্রয়োজন হলেও কর্তৃপক্ষ ২২ মিলিমিটার ডায়ার অক্সিজেন সরবরাহের পাইপলাইন স্থাপন করেছে। এ কারণে রোগীরা প্রয়োজনীয় অক্সিজেন টানতে পারছেন না ওই লাইন থেকে।

সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহের জন্য ২ মাস আগে ইউনিসেফের সহায়তায় স্পেক্ট্রা মেডিকেল চত্ত্বরে ১০ হাজার লিটার ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি অক্সিজেন ব্যাংক স্থাপন করে। কিন্তু ভাড়া এবং রিফিল নিয়ে আর্থিক বনিবনা না হওয়ায় স্পেক্ট্রার ওই অক্সিজেন ব্যাংক চালু হচ্ছে না। সেন্ট্রাল অক্সিজেনের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত হলে করোনা ওয়ার্ডে রোগী মৃত্যুর হার অনেক কমবে বলে আশা করেন স্থানীয় বাসিন্দা তাজুল ইসলাম।

করোনা ওয়ার্ডে অক্সিজেন সিলিন্ডার ব্যবস্থাপনায় কিছুটা সমস্যা রয়েছে বলে স্বীকার করেছেন হাসপাতালের পরিচালক ডা. এইচএম সাইফুল ইসলাম। অক্সিজেন সিলিন্ডারের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সেন্ট্রাল অক্সিজেন সেবা শিগগিরই স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

এই বিভাগের আরও খবর