উত্তরের অধিকাংশ চরে পশু কোরবানি হয়নি। তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমার নদীর শত শত চরে ছিল না উৎসবের রং, ছিল না ঈদের আনন্দ। অনেকের হাঁড়িতে উঠেনি কোরবানির মাংস। আবার কোথাও নদীভাঙন আতঙ্কে মানুষ রাত জেগে পাহারা দিয়েছেন বসতভিটা। জানা গেছে, রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলা, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও গাইবান্ধায় প্রায় ৭০০টি চর রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চর কুড়িগ্রামে, প্রায় ৪৫০টি। প্রতিটি চরে বসবাস করে ১৫০-৫০০ পরিবার। এসব চরবাসীর প্রধান জীবিকা কৃষিকাজ। কিন্তু এবার আলু, ধান, ভুট্টায় উৎপাদন খরচই উঠছে না। এ কারণে অধিকাংশ চরেই হয়নি পশু কোরবানি। ঈদের আনন্দ যেন হারিয়ে গেছে। লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের গোবর্ধান এলাকার কৃষক মকবুল হোসেন (৬৮) বলেন, কয়েক দফা কালবৈশাখিতে সবজি নষ্ট হয়ে গেছে। ‘প্রতি মণ ধান উৎপাদনে খরচ পড়েছে প্রায় ৯৫০ টাকা। অথচ বিক্রি করতে হচ্ছে ৮০০-৮৫০ টাকায়। ধান, আলু, ভুট্টা সবখানেই ক্ষতির শিকার হয়েছেন। মনে কোনো শান্তি নেই। ঈদের আনন্দও নেই।’
লালমনিরহাট সদর উপজেলার ধরলা নদী চর ফলিমারীতে প্রায় ৩০০ পরিবারের বসবাস। কয়েকদিন ধরে নদীভাঙন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে চরে। ঈদের দিনেও চলেছে ভাঙন। উৎসবের বদলে উৎকণ্ঠাই এখন সঙ্গী। গত বছর এ চরে দুটি গরু ও তিনটি ছাগল কোরবানি হলেও এবার কোনো পশু কোরবানি হয়নি। চরের বাসিন্দা সাহেদা বেওয়া বলেন, ‘এক সপ্তাহ আগে নদী আমাদের তিন বিঘা জমি আর বসতভিটা গিলে নিয়েছে। বাকি জমিও ভাঙনের মুখে। এমন অবস্থায় ঈদের আনন্দ কই? তিনি জানান, সরকার থেকে ১০ কেজি চাল পেয়েছেন। সেটাই এখন বড় ভরসা। রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার তিস্তা নদীর বুকে চর টেপামধুপুরের কৃষক আলী (৬৫) সাত সদস্যের পরিবারের কাউকেই নতুন পোশাক কিনে দিতে পারেননি। গত বছর গরু কোরবানি দিয়েছিলেন। এবার বাজার থেকে মাংস কেনার সামর্থও নেই। তিনি বলেন, ‘আলুতে সর্বনাশ হয়েছে। ধানও বাঁচাতে পারল না। উৎপাদন খরচই উঠছে না। ভুট্টার দাম কম, তামাকের দাম কম; সব মিলিয়ে আমরা নিঃস্ব হয়ে গেছি। ২৫ বিঘা জমিতে চাষাবাদ করা এ কৃষকের মাথায় এখন ৩ লাখ টাকার ঋণ। তিনি বলেন, আমাদের পরিবারে এবার ঈদ নেই।’
কুড়িগ্রাম চর উন্নয়ন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, এ বছর অধিকাংশ চরেই পশু কোরবানি হয়নি। গত বছর অনেক চরে কোরবানি হলেও এবার কৃষিপণ্যের মূল্য কম থাকায় তা হয়নি। কৃষি সম্পসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর অঞ্চলে প্রায় ১২ লাখ কৃষি পরিবার রয়েছে। এর মধ্যে ৪ লাখ পরিবার চরাঞ্চলে বসবাস করে। ধান, আলু ও ভুট্টা এসব এলাকার প্রধান ফসল। রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘এবার ফসল উৎপাদন ভালো হলেও বাজারদর কম। এর প্রভাব পড়েছে ঈদ উদ্যাপনেও।