শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৫ জানুয়ারি, ২০১৭ ২৩:৩৮

রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প ও বাস্তবতা

প্রফেসর ড. শাহিদা রফিক

রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প ও বাস্তবতা

পৃথিবীর বুকে প্রথম প্রাণ এবং প্রাণীর সৃষ্টি হয়েছিল পরিবেশ ও প্রকৃতির মহাসাম্য স্থাপনের মধ্য দিয়ে। এই ভারসাম্য বজায় রাখছে প্রকৃতি ও পরিবেশ। আজ মানুষের হাতে এই পরিবেশ দূষিত হচ্ছে আর দূষিত পরিবেশ প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট করছে। বিপন্ন হচ্ছে মানুষসহ গোটা জীব জগতের অস্তিত্ব। পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং বাড়তি জনসংখ্যার জন্য শক্তি উৎপাদন। ফলে প্রাকৃতিক সম্পদ পানি, মাটি এবং বাতাসের ওপর পড়ছে বাড়তি চাহিদার চাপ। ক্রমবর্ধমানহারে বিদ্যুত্শক্তি উৎপাদনের জন্য শুরু হয়েছে বন সম্পদ বিনষ্টি কর্মকাণ্ড। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উদ্ভিদ এবং প্রাণী জগৎ। এর প্রভাব পড়ছে আমাদের প্রাকৃতিক, ভৌগোলিক, আইনগত, অর্থনৈতিক, জনস্বাস্থ্যসহ সামগ্রিক পরিবেশে। রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প এর একটি উত্কৃষ্ট উদাহরণ।

সুন্দরবন রিজার্ভ ফরেস্ট বাংলাদেশের জাতীয় ঐতিহ্য, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনভূমি। এর অবস্থান বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে, পূর্বে বলেশ্বর নদী এবং পশ্চিমে হরিণডাঙার মধ্যবর্তী স্থানে, বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষে। এর মোট আয়তন ১০,০০০ বর্গকিলোমিটার। মোট সম্পত্তির শতকরা ৬০ ভাগ বাংলাদেশের এবং বাকিটা ভারতের। উন্মুক্ত বালুতটসহ মোট জমির পরিমাণ ৪১৪.২৫৯ হেক্টর (৭০ ভাগ) এবং পানি দারা আচ্ছাদিত জমির পরিমাণ ৩০ ভাগ (১৮৭.৪১৩ হেক্টর)। দক্ষিণে ১৩৯.৭০০ হেক্টর এলাকাজুড়ে বন্যপ্রাণীর তিনটি অভয়ারণ্য রয়েছে। এলাকাটি বিপন্ন প্রজাতির জন্য মূল প্রজনন এলাকা হিসেবে পরিচিত। বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী অঞ্চলে একটি টিপিক্যাল ভৌগোলিক অবস্থানে সুন্দরবন একটি অনন্য জৈব জলবায়ু অনুকূল অঞ্চল। প্রাকৃতিক সম্পদ ও সৌন্দর্যে ভরপুর এই সুন্দরবন আন্তর্জাতিকভাবে ন্যাশনাল হেরিটেজ নামে স্বীকৃত। বাংলাদেশের এই সুন্দরবন ফরেস্ট রিজার্ভ, যুগ যুগ ধরে লোনা পানির জোয়ার-ভাটার অবিরাম ঘাত-প্রতিঘাতে বিধৌত এক একটি মোজায়িক, প্রকৃতির এক অসাধারণ শিল্পকর্ম। স্থানটি জলজ ও স্থলজ এবং সামুদ্রিক প্রাণীদের আবাসস্থল, মাইক্রো এবং ম্যাক্রো উদ্ভিদ ও প্রাণী জগতের অভয়ারণ্য। সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার, গঙ্গা এবং ঈশ্বরদীর ডলফিন, মোহনার কুমির এবং বিপন্ন নদী-চরকচ্ছপসহ প্যানথারাটাইগ্রস প্রজাতির আন্তর্জাতিকমানের একমাত্র নিরাপদ আবাসস্থল।    

ক্রমপরিবর্তনশীল পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সুন্দরবনের কুশলী ভূমিকা রয়েছে। ব-দ্বীপ গঠন এবং গঠিত ব-দ্বীপের সুরক্ষা বর্ম এ সুন্দরবন। এটি বাংলাদেশের জন্যও একটি সুরক্ষাবাঁধ। এর সুরক্ষা প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে মৌসুমি বৃষ্টিপাত, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, ব-দ্বীপ সংরক্ষণ, জোয়ার-ভাটার অনুকূলে উদ্ভিদ ও প্রাণী জগতের উপনিবেশ রচনা। বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই ব-দ্বীপ তিনটি বড় নদী যেমন— গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার পলল জমা থেকে গঠিত, বঙ্গীয় অববাহিকার একটি পলল আচ্ছাদন। বিশ্বের ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে এটি প্রকৃতির এক অনন্য স্থাপনা। এখানে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণ হলে বিপর্যস্ত হবে আমাদের প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক পরিবেশ, বিপন্ন হবে জনস্বাস্থ্য এবং প্রাণী জগৎ। আমাদের অর্থনীতিতেও এটি একটি বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জ্বালানি দহনের ফলে নির্গত হয় জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ দূষণ নানা রাসায়নিক পদার্থ। এসব রাসায়নিক পদার্থ দুরারোগ্য ব্যাধির কারণ। এতে বাতাস, খাদ্যদ্রব্য দূষিত হচ্ছে। কয়লা দহনের ফলে দূষণকারী পদার্থগুলোর মধ্যে রয়েছে— কার্বন ডাই-অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনো-অক্সাইড, সিসা, পারদ এসব। আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদের অন্যতম সম্ভব হলো বাতাস।

ঝুলজাতীয় কার্বন কণা, বিষাক্ত ধাতু, জটিল জৈব ও যৌগ নিউক্লিয় আবর্জনা, জীবাশ্ম জ্বালানি অর্থাৎ কয়লা তেল এসব পুড়িয়ে কার্বন ডাই-অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড এসব বাতাসে ছড়িয়ে দেওয়া, নাইট্রাইস অক্সাইড, আলোক রাসায়নিক ধোঁয়াশা সবই বাতাস দূষণের প্রধান উপকরণ। বাতাসের কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যাচ্ছে বৈশ্বিক আবহাওয়ার তাপমাত্রা। এটিই গ্লোবাল ওয়ার্মিং। কয়লা ও তেল দহনের ফলে নির্গত গ্যাসের মিশ্রণের সৃষ্টি হয় ধোঁয়াশা। এ ধোঁয়াশা মাথাব্যথা, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, দীর্ঘস্থায়ী ব্রঙ্কাইটিস, ফুসফুসের ক্যান্সার এসবের জন্য দায়ী। অক্সাইড ও হাইড্রো কার্বনের বিক্রিয়ায় সৃষ্টি হয় ওজোন গ্যাস ও পারক্সি এসিটাল নাইট্রাইট। এসব বায়ুদূষক বাতাসে ছড়িয়ে থাকে। কয়লা চালিত বিদ্যুেকন্দ্র বিশ্বের কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের প্রধান উৎস এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

পানির দূষণ : পানির দূষণ সভ্যতার এক অভিশাপ। পানির দূষণ হচ্ছে কয়লা বিদ্যুৎ প্লান্ট থেকে ভারী ধাতু, হ্যালোজেন নিষিক্ত হাইড্রোকার্বন, কার্বন ডাই-অক্সাইড, পেট্রোলিয়াম, কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা সর্বোপরি বিদ্যুৎ প্রকল্প সংলগ্ন নির্গম নালি বেয়ে আসা দূষিত তরল আবর্জনা দ্বারা। কয়লা বিদ্যুৎ প্লান্ট কর্তৃক পানি দূষণ নিয়ে বিশ্ব সমাজ আজ চিন্তিত। পানি দূষণের ফলে ছড়িয়ে পড়ছে নানা সংক্রামক রোগ। বর্তমানে বাতাস দূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহূত প্রযুক্তিসমূহ এই বিষাক্ত গ্যাস নিগর্মণ করতে যথেষ্ট পরিণত নয়। একটি টিপিক্যাল কয়লাচালিত বিদ্যুেকন্দ্র থেকে বছরে প্রায় ১২৫০০০ টন ছাই এবং ১৯৩০০০ টন বিষাক্ত কর্দন উৎপাদিত হয় যা পরিবেশ দূষণ করে। এই বর্জ্য থেকে বিষাক্ত পদার্থসমূহের মধ্যে রয়েছে আর্সেনিক, পারদ, ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম ইত্যাদি। এগুলো পানি ও এর উৎসকে যেমন— পুকুর, নদী, হ্রদ পানিকে কলুষিত করে এবং এই পানি পান করা মানুষের অত্যাবশ্যক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতিসাধন করে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১০০ শিশু যারা কয়লাচালিত বিদ্যুেকন্দ্রের বর্জ্য থেকে উত্পন্ন আর্সেনিক দূষিত ভূগর্ভস্থ পানি পান করেছে তারা প্রত্যেকেই ক্যান্সারের ঝুঁকিতে রয়েছে। কয়লা প্লান্টের নিঃসরিত বর্জ্য ইকো ইস্টেমকে আংশিক বা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কয়লা প্লান্টে শীতলীকরণ প্রক্রিয়ায় ব্যবহূত ৭০-১৮০ বিলিয়ন গ্যালন পানি বিদ্যুেকন্দ্রে প্রবাহিত হয়ে জলাশয়, হ্রদ, নদী বা সমুদ্রে এসে পড়ে। প্লান্টে ব্যবহূত এই পানি নদী, জলাশয় বা সমুদ্রের পানির স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে উষ্ণ, ২০০-২৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হওয়ায় পানির তাপ দূষণ করে। এতে সামুদ্রিক প্রজাতির প্রজনন ও কর্মক্ষমতা লোপ পায়। এমনকি এদের হার্টের সমস্যা ও শ্বসন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। পানির তাপমাত্রা বেড়ে গেলে সামুদ্রিক প্রাণীর প্রবৃদ্ধি হ্রাস পায়।

-কয়লাভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্রে শীতলীকরণ পানিতে শ্যাওলা বৃদ্ধি-হ্রাস করার জন্য ক্লোরিন এবং অন্যান্য বিষাক্ত পদার্থ যোগ করা হয়। এসব বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ পরিত্যক্ত পানির সঙ্গে নদী বা সমুদ্রে এসে পড়ে এবং পরিবেশ দূষিত করে।   

পরিবেশ দূষণের কবলে সুন্দরবন : সুন্দরবন বিশ্বের বিপন্ন জলজ ও স্থলজ প্রজাতির বিশেষ করে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের একটি নিরাপদ আবাসস্থল। এক বাঘশুমারি অনুযায়ী এখানে বাঘের সংখ্যা ইতিমধ্যেই ৪৫০ থেকে হ্রাস পেয়ে ১০০ পর্যন্ত পৌঁছেছে। সুন্দরবনে ৩৩৪টি উদ্ভিদ প্রজাতি, ২৪৫টি প্রজন্মের ৭৫টি উদ্ভিদ প্রজাতি, ১৬৫ প্রজাতির শ্যাওলা গুল্ম, ১৩টি প্রজাতির অর্কিড রয়েছে। এ ছাড়াও রয়েছে ৬৯৩ প্রজাতির বন্যপ্রাণী, ৫৯ প্রজাতির সরীসৃপ, ৪৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী। এ ছাড়া ৮টি প্রজাতির উভয়চর প্রাণী, ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি, ১৪ প্রজাতির কাঁকড়া এবং নানা প্রজাতির মলাস্কা। স্থানটি বিরল প্রজাতির পক্ষীকুলের জন্যও একটি অভয়ারণ্য। এখানে রয়েছে নানা রঙের, নানা ধরনের, জলপথ ধরে বিচরণকারী অসংখ্য পক্ষীকুল। বিচিত্র পাখি দর্শনের জন্য এটি একটি আকর্ষণীয় স্থান। সর্বাধিক আকর্ষণীয় পাখির প্রজাতির মধ্যে রয়েছে ৩১৫ ধরনের জলকুক্কুট, র‌্যাপ্টার্স, ৯টি প্রজাতির মাছরাঙ্গা, ম্যাগনিফিসেন্ট সাদা পেটের সমুদ্র ঈগলসহ জানা-অজানা বন্যপাখি। এখানে বিদ্যুেকন্দ্র হলে বিপন্ন হবে এসব বন্য পক্ষীকুল।

সুন্দরবনে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প প্রচলিত আইনের খেলাপ

আইনগত সুরক্ষা নীতিমালা : ঐতিহাসিকভাবেই উনিশ শতক থেকে এ ভূমির জমি, বনভূমি এবং জলজ পরিবেশ সুরক্ষার জন্য আইন কার্যকর রয়েছে। এর নাম ‘বণ্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও সংশোধন আইন’। যে তিনটি অভয়ারণ্য নিয়ে সুন্দরবন গঠিত হয়েছে সে তিনটি অভয়ারণ্যই ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও সংশোধন ১৯৭৪ সালের আইন অনুযায়ী এটি পরিচালিত হচ্ছে। তবে এরও আগে ১৮৭৪ সালে প্রথম ফরেস্ট রিজার্ভ আইন প্রণীত হয়। ১৯২৭ সালে সংশোধিত এটি ‘বনসম্পদ নিয়ন্ত্রণ’, ‘বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ’ আইন নামে পরিচিত এবং ১৯৭৪ সালে এটি পুনঃসংশোধিত হয়। বর্তমানে এ বনসম্পদের কার্যক্রম উক্ত আইন দ্বারা পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। নিয়ন্ত্রণ আইনগুলো হলো রিজার্ভ ফরেস্টে অনধিকার প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, নিয়ন্ত্রিত মত্স্য সম্পদ আহরণ, মধু আহরণ এবং বন্যপ্রাণী শিকার ও বনজ উত্পন্ন সম্পদ আহরণ। উক্ত আইন অনুযায়ী এ রিজার্ভ ফরেস্ট ধ্বংস হয় এমন কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা যাবে না। এসব বিদ্যমান আইন থাকা সত্ত্বেও সুন্দরবন সংলগ্ন রামপালে বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপনার জন্য ২০১০ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এবং ভারতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার করপোরেশনের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুেকন্দ্রের জন্য বাংলাদেশ সরকারকে ২০০০ একর খামার জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। অভিযোগ রয়েছে যে, এটি ‘রামসার কনভেনশন’ চুক্তির বরখেলাপ। ‘বৈশ্বিক পরিবেশবান্ধব রামসার চুক্তি’ অনুযায়ী সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং সংবেদনশীল জলাভূমিতে কোনো প্রকল্প স্থাপন করা যাবে না। যেটি জলাভূমি এবং বনাঞ্চলের ক্ষতিসাধন করে। বাংলাদেশ এ চুক্তিতে ১৯৯২ সালে স্বাক্ষর করে। ইতিপূর্বে বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পটি দেশের বিদ্যমান নীতির সঙ্গে সঙ্গতিশীল নয় বলে এর অনুমোদন প্রত্যাখ্যান করেছে। এ ছাড়াও তহবিল সংগ্রহ এবং প্লান্টটির মালিকানার বিষয়টিও চুক্তিতে স্পষ্ট নয়। ফলে এ প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। উপরন্তু হাই কোর্টের একটি বেঞ্চ রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এ মর্মে সরকারের প্রতি রুল জারি করেছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী রিজার্ভ ফরেস্টের ২৫ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে কোনো প্রকল্প স্থাপন করা যাবে না। কিন্তু উক্ত প্রকল্পটি নির্ধারিত স্থানটি সুন্দরবন থেকে মাত্র ৯ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত।   

স্বাস্থ্যগত কারণ : কয়লাচালিত বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে নিঃসরিত সালফার ডাই-অক্সাইড ছোট ছোট আম্লিক বস্তু কণার আকারে নিঃশ্বাসের সঙ্গে মানুষের ফুসফুসে প্রবেশ করে এবং পরবর্তীতে রক্তস্রোতে শোষিত হয় যা ক্যান্সারের অন্যতম কারণ। এটি এসিড বৃষ্টি ঘটায় যা ফসল, বনভূমি ও মাটির মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে এবং মাটির উর্বরতা কমায়। নাইট্রোজেন অক্সাইড ভূমিতে ওজোন স্তর বা ধোঁয়াশা তৈরি করে যেটি ফুসফুসের টিস্যু বার্ন করে দেয় অ্যাজমা বা হাঁপানি তৈরি করে এবং দীর্ঘস্থায়ীভাবে শ্বাসযন্ত্রের ক্ষতি করে দেয়। একটি টিপিকাল পাওয়ার প্লান্ট থেকে বছরে প্রায় ৩০০০ নাইট্রোজেন পার অক্সাইড নির্গত হয়। সিলেকটিভ বা কেটালেটিব প্রযুক্তিতে এটি সম্পূর্ণভাবে নিঃসরণ বন্ধ করা যায় না। নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড সমৃদ্ধ বস্তুকণা ক্রনিক, ব্রংকাইটিস, হাঁপানি, ঝাপসা দৃষ্টি এমনকি অকাল মৃত্যুও ঘটাতে পারে। কয়লা প্লান্টে নিঃসরিত পারদ মস্তিষ্কের এবং হার্টের ক্ষতি করে।

অর্থনৈতিক কারণ : আইইইএফএ ২০১৬ প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রকল্প থেকে উত্পন্ন বিদ্যুতের দাম বর্তমানে গড় বিদ্যুতের দামের চেয়ে ৩২% শতাংশ বেশি হবে। অর্থনৈতিক দিক থেকেও এটি সাশ্রয়ী নয়। এবং জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশ এবং ভারতের ভর্তুকি সত্ত্বেও এ প্রকল্প থেকে উত্পন্ন বিদ্যুতের দাম গড়পড়তা বেশি।

পশুর নদীর তীরে ফসলি জমিতে বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণ করলে অর্থনৈতিক বিপর্যয় নেমে আসবে। উল্লেখ্য, ২.৫ মিলিয়ন বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ এলাকাটিতে বসবাস করে এবং সুন্দরবনের ওপর জীবিকানির্বাহ করে। এদের মধ্যে রয়েছে— কাঠুরিয়া, জেলে, মধু সংগ্রহকারী মৌয়াল এবং বনসম্পদ উত্পন্ন সম্পদ আহরণকারী মানুষ ইত্যাদি।  বিদ্যুৎ প্রকল্পটি হলে এর সামাজিক পরিবেশ বিনষ্ট হবে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এটি একটি বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

লেখক : প্রাক্তন ডিন, ফ্যাকাল্টি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি এবং প্রাক্তন ডিরেক্টর, নবায়নযোগ্য শক্তি

ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 


আপনার মন্তব্য