শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৫ জানুয়ারি, ২০১৯ ২২:১৭

স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত হওয়ার ইতিহাসই বেশি

মোশাররফ হোসেন মুসা

স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত হওয়ার ইতিহাসই বেশি

সদ্য সমাপ্ত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অভূতপূর্ব বিজয় দেখে বিএনপি-জামায়াত তথা ঐক্যফ্রন্ট সমর্থক মহলে প্রচ- অসন্তোষ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তারা বিভিন্ন সভা-সেমিনার, অফিস-আদালত ও চায়ের টেবিলে আওয়ামী লীগের জয়ী হওয়া প্রসঙ্গে নানারকম বিরূপ মন্তব্য করে যাচ্ছেন। তারা ভুলে যান যে, যে কোনো দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত হয়ে থাকে। তবে বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাস এবং ক্ষমতায় থাকা শাসকদের শাসন-বৈশিষ্ট্য একইরকম হয় না। এ বিষয়ে কয়েকটি দেশের উদাহরণ প্রাসঙ্গিক হবে। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, ভারতে জাতি গঠনের প্রক্রিয়া বিলম্বে হওয়ায় বহিরাগতরা বার বার এ দেশটি দখলে নিতে সক্ষম হয়। সেজন্য ১৮৫৭ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনকে স্বাধীনতাযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে গণ্য করা হয়। এ আন্দোলনে অহিংস ও সহিংস দুই ধারার রাজনীতির উপস্থিতি ছিল। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দুই ধারার রাজনীতির সমন্বয় করে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হয়। স্বাধীনতার পর কংগ্রেস ভারতকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য একটি নির্দিষ্ট ডিজাইন গ্রহণ করে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার জন্য কতকগুলো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। সব মিলিয়ে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রায় ৫৪ বছর ক্ষমতায় থাকে। কংগ্রেসে গান্ধী পরিবারের আধিপত্যের মূলে রয়েছে ইন্দিরা গান্ধী ও রাজীব গান্ধীর নিহত হওয়ার ঘটনা। তুরস্কে জাতি গঠনের প্রক্রিয়া মধ্যযুগেই দেখতে পাওয়া যায়। ফলস্বরূপ তুর্কি শাসকরা একসময় উসমানিয়া সাম্রাজ্য ইউরোপ থেকে এশিয়ার ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত করতে সক্ষম হন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তারা অক্ষশক্তির পক্ষ নেয় এবং বলকান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। বলকান যুদ্ধে পরাজয়ের পর বিভিন্ন রাজ্যে জাতীয়তাবাদী শক্তি মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে এবং অনেক স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম ঘটে। ফলে সামরিক কর্মকর্তা কামাল পাশার নেতৃত্বে নব্য জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটে। তিনি ১৯২৩ সালে উসমানীয় সাম্রাজ্যের বিলুপ্তি ঘটিয়ে তুরস্ককে প্রজাতন্ত্র ঘোষণা দেন। তিনি জনগণের সঙ্গে বোঝাপড়া না করে তথা সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে পাশ কাটিয়ে কঠোর ধর্মনিরপেক্ষ শাসন চালু করেন। ১৯৩৮ সালে তার মৃত্যুর পর তার রিপাবলিকান পিপলস পার্টি ক্ষমতা হারায় এবং দীর্ঘ সামরিক শাসনের সূচনা ঘটে। বলার অপেক্ষা রাখে না, মুস্তফা কামাল আতাতুর্কের কঠোর ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির সূত্র ধরে বর্তমানে ইসলামপন্থি দল ক্ষমতায়। সৌদি আরবে তুর্কি শাসকদের বিরুদ্ধে আবদুল আজিজ ১৯০২ সালে আন্দোলন শুরু করেন এবং ১৯৩০ সালে বিজয় অর্জন করে ‘সৌদ’ পরিবারের শাসনের গোড়াপত্তন করেন। সেই সময় থেকে অদ্যাবধি ‘সৌদ’ পরিবার ক্ষমতায় রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু হলে শ্বেতাঙ্গদের বর্ণবাদী শাসন শুরু হয়। শ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে অহিংস ও সহিংস দুই ধারার রাজনীতি দেখা যায়। নেলসন ম্যান্ডেলার দল আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস দুই ধারার রাজনীতির সমন্বয় ঘটিয়ে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। নেলসন ম্যান্ডেলা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী হয়েও ক্ষমতায় গিয়ে সমাজতন্ত্র বাস্তবায়ন করেননি। তিনি ১৯৯৪ সালে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট পদে ক্ষমতায় ছিলেন। তিনি বহুধাবিভক্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে টিআরসি (Truth and reconciliation Commission) ফরমুলা বাস্তবায়ন করেন এবং স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। পাশের দেশ মিয়ানমারের (বার্মা) স্বাধীনতাযুদ্ধের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। কনবাউং বংশের (১৭৫২-১৮৮৫) শাসনকালে বার্মা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ফলে ব্রিটিশরা ১৮৮৫ সালে বার্মায় ঔপনিবেশিক শাসন শুরু করে। ব্রিটিশরা অন্যান্য দেশের মতো এখানেও বিভেদ নীতি গ্রহণ করে। মেজর জেনারেল অং সানকে মিয়ানমারের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান নেতা ও সমরনায়ক হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন এবং পরে অ্যান্টি ফ্যাসিস্ট ফ্রিডম লীগ (AFPFL) গঠন করেন। এ সংগঠনটি স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি বার্মার প্রতিরক্ষামন্ত্রী হন এবং মিত্রশক্তির পক্ষে যুদ্ধ করেন। ’৪৮ সালে ব্রিটিশ থেকে স্বাধীনতা লাভের মাত্র চার মাস আগে কয়েকজন বিশ্বস্ত সহযোগীসহ তাকে আততায়ীরা হত্যা করে। স্বাধীনতার পর দেশটি দীর্ঘ সামরিক শাসনের কবলে পড়ে। তার কন্যা অং সান সু চি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে অহিংস আন্দোলন শুরু করেন। তার দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) এর আগে নির্বাচনে জয়ী হয়েও ক্ষমতায় বসতে সক্ষম হয়নি। অবশেষে তিনি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে আপস-মীমাংসা করেন। বর্তমানে তার দল সামরিক বাহিনীর সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে দেশ শাসন করছে। কিন্তু শেখ হাসিনা এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তার দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসও অন্যান্য দেশের মতো নয়। এ দেশের জনগণ দুবার স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করেছে। একবার ব্রিটিশের বিরুদ্ধে, আরেকবার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে মুসলিম নেতৃবৃন্দের অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম ছিল। হিন্দুসহ অন্য ধর্মাবলম্বীদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে ধর্মীয় উন্মদনা ছিল, সেই সঙ্গে এ দেশের সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক মুক্তির বিষয়টিও ছিল। কিন্তু মুসলমানরা তাদের আন্দোলনে শুধু ধর্মকেই প্রাধান্য দিয়েছে। ফলে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। অর্থাৎ এ দেশের বাঙালি মুসলমানদের আত্মপরিচয়ের বিষয়টি সমাধান না হওয়ায় পাকিস্তানের বিরুদ্ধেও সংগ্রাম করতে হয়। স্বাধীনতার পর জনগণের সঙ্গে বোঝাপড়া না করে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রকে মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। ফলে ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে কী বোঝায় এবং কোন ধাঁচের সমাজতন্ত্র সে বিষয়ে জনগণ অন্ধকারে থেকে যায়। ’৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কিছু বিপথগামী সৈনিক পরিকল্পিতভাবে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। হত্যাকারীরা ক্ষমতা দখল করে ইতিহাসের চাকা পেছনের দিকে ঘোরাতে শুরু করে এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গকে ইসলামীকরণের চেষ্টা করে। অথচ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কোনো তত্ত্বের সঙ্গে হত্যাকারীদের রাজনৈতিক দর্শন মেলে না। হত্যাকারীরা যেসব দেশে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করে, সেসব দেশের কোনোটাই ইসলামী দেশ নয়। সেসব দেশে খ্রিস্টিয়ানিটি ও রেনেসাঁর হাত ধরে গণতন্ত্র ও মানবতা বহু আগেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। বঙ্গবন্ধু খুন হওয়ায় খুনিরা লাভবান হলেও দেশ পিছিয়েছে, গণতান্ত্রিক ধারা বিঘিœত হয়েছে এবং একাধিক দিবসের জন্ম ঘটেছে। আওয়ামী লীগের বড় সাফল্য যে, তারা বঙ্গবন্ধুকে দলের নেতা-কর্মীদের মাঝে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। আওয়ামী লীগ প্রায় সাড়ে ১৮ বছর ক্ষমতায় ছিল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, আওয়ামী লীগের ক্ষমতার সময়সীমা সুদে-আসলে আরও বৃদ্ধি পাবে। এটাই হয়তো ইতিহাসের অমোঘ নিয়ম।

লেখক : গণতন্ত্রায়ণ ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারবিষয়ক গবেষক।

ইমেইল : [email protected]


আপনার মন্তব্য