শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২০ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৯ এপ্রিল, ২০১৯ ২৩:৪০

ধর্মতত্ত্ব

শবেবরাত : ইবাদতের সোনালি মুহূর্ত

মুফতি মনসুরুল হক

শবেবরাত : ইবাদতের সোনালি মুহূর্ত

আমরা আল্লাহর আবদ ও বান্দা। আমাদের পুরো জীবনের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে তাঁর বন্দেগির হক আদায় করা। আমাদের সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্যও তাই। এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে আল্লাহ আমাদের ইবাদত ও বন্দেগির এমন কিছু সোনালি পর্ব দান করেছেন, যার সদ্ব্যবহার করতে পারলে আমরা অল্প সময়েই প্রভূত কল্যাণের অধিকারী হতে পারি। শবেবরাত সেই সোনালি মুহূর্তগুলোরই একটি। শাবানের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতকেই বলা হয় শবেবরাত। আরবিতে ‘লাইলাতুল বারাআত’ বা ‘মুক্তির রজনী’। আল্লাহর অপার অনুগ্রহ এ রাতে রহমতের বৃষ্টি হয়ে তাঁর বান্দাদের ওপর ঝরে পড়ে। এ রাতে আল্লাহ বান্দাদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দান করেন এবং শিরককারী ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সব বান্দাকে ক্ষমা করে দেন।

শবেবরাতের শরয়ি প্রমাণ : লাইলাতুল বারাআতের ফজিলত নির্ভরযোগ্য হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। সম্মিলিত কোনো রূপ না দিয়ে এবং এ রাত উদ্যাপনের বিশেষ কোনো পন্থা উদ্ভাবন না করে সাধ্যানুযায়ী বেশি বেশি ইবাদত করাও নির্ভরযোগ্য বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত। হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ মধ্য শাবানের রাতে সৃষ্টির দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’ দেখুন ‘ইবনে হিব্বান’। ‘ইমাম মুনজিরি, ইবনে রজব, নুরুদ্দিন হাইসামিসহ অন্যান্য হাদিসবিশারদ এ হাদিসটিকে আমলযোগ্য সহি বলেছেন।’ দেখুন ‘তারগিব তারহিব’, ‘মাজমাউজ জাওয়ায়েদ’। শায়খ নাসিরুদ্দিন আলবানিও এ হাদিসকে সহি বলেছেন এবং এ হাদিসের সমর্থনে আরও আটটি হাদিস এনে বলেছেন, ‘যদি কেউ এ-জাতীয় কথা বলে (যে মধ্য শাবানের রাতের ফজিলতসংক্রান্ত কোনো সহি হাদিস নেই), তাহলে নিশ্চয় তাড়াহুড়া বা হাদিসের সূত্রগুলো অনুসন্ধানে যথাযথ শ্রম ব্যয় না করার কারণে এমনটি বলে থাকবে।’ দেখুন ‘সিলসিলাতুল আহাদিসিস সাহিহা’।

মাজহাবসমূহে শবেবরাত : চার মাজহাবের ওলামায়ে কিরাম শবেবরাতের ইবাদতকে মুস্তাহাব বলেছেন। এখানে প্রতিটি মাজহাবের নির্বাচিত  কিছু বর্ণনা উল্লেখ করা হচ্ছে-

হানাফি মাজহাব : আল্লামা শামি, ইবনে নুজাইম, আল্লামা শারামবুলালি, শায়খ আবদুল হক দেহলভি, মাওলানা আশরাফ আলী থানভি, মাওলানা আবদুল হাই লাখনৌভি, মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.)-এর মতো গ্রহণযোগ্য ও বিশিষ্ট সব আলেমের মতে- ‘লাইলাতুল বারাআতে সাধ্যানুযায়ী জাগ্রত থেকে একাকী ইবাদত করা মুস্তাহাব।’ দেখুন ‘আদ দুররুল মুখতার’, মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি-কৃত ‘লাইলাতুল বারাআতের হাকিকত’।

শাফেয়ি মাজহাব : ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর মতে- ‘শাবানের ১৫তম রাতে অধিকহারে দোয়া কবুল হয়।’ দেখুন ‘কিতাবুল উম্ম’।

হাম্বলি মাজহাব : ইবনে রজব হাম্বলি (রহ.)সহ এ মাজহাবের ওলামায়ে কিরামের মতে- ‘লাইলাতুল বারাআতে ইবাদত করা মুস্তাহাব।’ দেখুন ‘লাতায়িফুল মাআরিফ : ওজায়িফু শাহরি শাবান’।

মালিকি মাজহাব : ইবনুল হাজ্জ মালিকি (রহ.) বলেন, ‘সলফে সালিহিন তথা পূর্বযুগের অলিগণ এ রাতকে যথেষ্ট সম্মান করতেন এবং এর জন্য আগে থেকে প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন।’ দেখুন ‘আল মাদখাল’, পরিচ্ছেদ ‘লাইলাতু নিসফি শাবান’।

শবেবরাতের আমল : এ রাতের আমল সম্পর্কে হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস থেকে জানা যায়, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ রাতে নামাজ পড়েছেন এবং দীর্ঘ সিজদা করেছেন। এ থেকে বোঝা যায়, এ রাতে দীর্ঘ সিজদায় দীর্ঘ নফল নামাজ পড়া শরিয়তের দৃষ্টিতে কাম্য। ইমাম বায়হাকি (রহ.) এ হাদিস সম্পর্কে বলেন, ‘এটি জায়িদ মুরসাল, যা গ্রহণযোগ্যতার মানে উত্তীর্ণ।’ দেখুন ‘শুয়াবুল ইমান’। তবে বর্তমানে কিছু অনির্ভরযোগ্য বইপুস্তকে মনগড়া বিভিন্ন পদ্ধতির নামাজের উল্লেখ পাওয়া যায়। বলা হয়, এত রাকাত নামাজ এভাবে পড়লে এই নেকি। অমুক সূরা দিয়ে নামাজ পড়লে এই ফজিলত। এসবের শরয়ি কোনো ভিত্তি নেই। বরং স্বাভাবিক নফল নামাজের মতোই যতক্ষণ আগ্রহ হয় নামাজ আদায় করবে। সেই সঙ্গে দোয়া, তিলাওয়াত ও ইস্তিগফারের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেবে। লক্ষ্য রাখবে, এসব ইবাদত করতে হবে একাকী। সমবেতভাবে এ রাতে ইবাদত করার শরয়ি কোনো ভিত্তি নেই। ইবাদতের পাশাপাশি এ রাতে প্রয়োজনমতো ঘুমিয়ে নেবে। এমন যেন না হয়, দীর্ঘ ইবাদত করতে করতে ক্লান্ত হয়ে ফজরের নামাজ আদায়েই কষ্ট হয়ে গেল। রাতে ইবাদতের সঙ্গে পরদিন রোজা রাখতে পারলে রাখবে। হজরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) থেকে বর্ণিত। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যখন মধ্য শাবানের রাত (১৪ তারিখ দিবাগত রাত) উপস্থিত হয়, তখন তোমরা ইবাদত করো আর দিনে রোজা রেখো।...’ দেখুন ‘ইবনে মাজাহ’। এ বর্ণনাটির সনদ যদিও জয়িফ, তবে মুহাদ্দিসদের মতে ফাজায়েলের ক্ষেত্রে কিছু শর্তের সঙ্গে জয়িফ হাদিস আমলযোগ্য। তা ছাড়া ১৫ শাবানের দিনটি ‘আইয়ামে বিজ’-এর অন্তর্ভুক্ত। সারা বছরই এসব দিনে রোজা রাখার কথা সহি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। সে হিসেবেও এ দিনে রোজা রাখাটা ফজিলতপূর্ণ।

শবেবরাতে বর্জনীয় : এ রাতকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের রুসুম-রেওয়াজ প্রচলিত। যেমন : হালুয়া-রুটি-শিরনি বিতরণ, আতশবাজি, দলবেঁধে ঘোরাঘুরি, মাইকে শবিনা পাঠ, আলোকসজ্জা, মসজিদে বা বাড়িতে একত্র হয়ে উচ্চৈঃস্বরে প্রচলিত মিলাদ-কিয়াম করা, জামাতের সঙ্গে নফল নামাজ আদায় ইত্যাদি।

এসব কর্মকাণ্ড ভিত্তিহীন ও অনর্থক। এসব বাদ দিয়ে ইবাদতের জন্য আল্লাহ-প্রদত্ত এই সোনালি মুহূর্তকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

লেখক : শায়খুল হাদিস ও প্রধান মুফতি জামি‘আ রাহমানিয়া আরাবিয়া।


আপনার মন্তব্য