Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ২৩:১৪

বাঙালিরা বাংলা চায় নাকি হিন্দি চায়

তসলিমা নাসরিন

বাঙালিরা বাংলা চায় নাকি হিন্দি চায়

কানাডায় দুটো ভাষা, ইংরেজি আর ফরাসি। এই দুটো মাত্র ভাষার মানুষের এক দেশে থাকা নিয়ে কম ঝগড়া-ঝাঁটি, কম বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হয়নি। বেলজিয়ামে তিনটে ভাষা, ফরাসি, জার্মান আর ফ্লেমিশ। এই তিন ভাষাভাষীর মধ্যে হিংসে, দ্বেষ, রেশারেশির শেষ নেই। অথচ আশ্চর্য, এই পৃথিবীরই একটি দেশ ভারত, যেখানে ৭৮০টি ভাষা। এই ভাষার জন্য বিচ্ছিন্ন হতে কেউ চায়নি। এখানেই ভারতের মহত্ত্ব। শুধু ভাষাই নয়, ভারত টিকে আছে হরেক রকম ধর্ম, বর্ণ, মত, পথ নিয়ে।

পৃথিবীতে মোট ৭১১১টি ভাষা। প্রতি দু’সপ্তাহে একটি করে ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। গত ৫০ বছরে ভারতের ২২০টি ভাষা হারিয়ে গেছে। এথনোলগের মতে, ভারতের জীবিত ভাষার সংখ্যা এখন ৪১৫। অফিশিয়াল ভাষা ২৩টি। হিন্দি, বাংলা, তেলুগু, মারাঠী, তামিল, উর্দু, কন্নড়, গুজরাটি, ওড়িয়া, মালয়ালাম ইত্যাদি। রাষ্ট্র ভাষা বলতে যা বোঝায়, তা ভারতে নেই। কেন্দ্রীয় সরকার দুটো ভাষা ব্যবহার করে, আর রাজ্য সরকার সাধারণত রাজ্যের নিজস্ব ভাষা ব্যবহার করে।

তা এই অবস্থায় দেশের সব মানুষের মুখের ভাষা যেন হিন্দি হয়ে ওঠে তার চেষ্টা করছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তিনি বলেছেন, ‘‘হিন্দি ভাষাই ভারতের ঐক্যকে ধরে রাখতে পারে। কারণ, বহু ভাষাভাষীর এই দেশে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ কথা বলেন এই ভাষাতেই। বিশ্বে ভারতের পরিচিতির জন্য একটা নির্দিষ্ট ভাষার খুবই প্রয়োজন। দেশের কোনও ভাষা যদি ভারতের ঐক্য ও সংহতিকে অটুট রাখতে পারে, তবে তা বহুপ্রচলিত হিন্দি ভাষাই।’’ কোনও একটি দিনকে তিনি হিন্দি দিবস হিসেবে ঘোষণা দিয়ে মাতৃভাষার পাশাপাশি হিন্দির ব্যবহার বাড়ানোর জন্য দেশবাসীর কাছে অনুরোধ করেছেন। জানি না, ভাষা নিয়ে হঠাৎ কোথায় এত সমস্যা হলো, যে, হিন্দিকে সবার মুখের ভাষা করা ছাড়া তিনি আর উপায় দেখছেন না।

দক্ষিণ ভারতে হিন্দি ভাষার চর্চা একেবারে নেই বললেই চলে। মানুষ ওখানে নিজের মাতৃভাষায় কথা বলেন, যাঁরা মাতৃভাষাটি জানেন না, তাদের সঙ্গে কথা বলেন ইংরেজিতে। হিন্দি ওঁরা জানেন না, জানলেও বলেন না। কিন্তু জাতীয় শিক্ষানীতির খসড়ায় হিন্দি ভাষা শিক্ষাকে স্কুলে বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করা হয়েছে। তামিলনাড়ুর সবকটি বিরোধী দলই এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে। এমন কী দক্ষিণ ভারতের সরকারি দলের লোকেরাও প্রতিবাদে শামিল হয়েছেন। তামিল নাড়ুর ডিএমকে নেতা স্ট্যালিন বলেছেন ‘প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উচিত অমিত শাহের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেওয়া। না হলে ডিএমকে আর একটি ভাষা আন্দোলনের প্রস্তুতি নেবে। এটা কি ইন্ডিয়া না হিন্দিয়া? ভারতের অর্থ বৈচিত্র্যের মধ্যেই ঐক্য। বিজেপিশাসিত সরকার এটাকে ভেঙে ফেলতে চাইছে ও তার বিরুদ্ধে যেতে চাইছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর মন্তব্য প্রত্যাহার করুন। তামিলনাড়ুর মানুষের রক্তে হিন্দি নেই। আমরা সব সময়েই হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার বিরোধিতা করে এসেছি। রেল, পোস্ট অফিসে নিয়োগ পরীক্ষায় হিন্দির ব্যবহার নিয়েও সরব হয়েছি। আমরা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করছি।’ কর্ণাটকেও তীব্র প্রতিবাদ হচ্ছে, নেতারা বলছেন, ‘আমরা হিন্দি ভাষার বিরুদ্ধে নই, কিন্তু, তা চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে। আজ দেশজুড়ে হিন্দি দিবস পালন করছে কেন্দ্রীয় সরকার। সরকারি ভাষা হিসাবে কবে হিন্দির সঙ্গে কন্নড় ভাষা দিবসও পালিত হবে?’ অন্ধ্র প্রদেশ থেকে প্রতিবাদ আসছে, ‘হিন্দি সব ভারতবাসীর মাতৃভাষা নয়। আপনি কি এ দেশের বহু ভাষার বৈচিত্র্য ও সৌন্দর্যের প্রশংসা করবেন? সংবিধানের ২৯ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রত্যেক ভারতীয়কে পৃথক ভাষা, লিপি ও সংস্কৃতির অধিকার দিয়েছে।’ কেউ কেউ বলছেন, “রাজ্যে রাজ্যে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার ব্যাপারটি আরএসএসের ‘হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্তান’ নীতির অংশ। দেশকে হিন্দি দিয়ে বাঁধার কথা বলছেন, কিন্তু আসলে তা বিভাজনের দিকেই যাবে।”

দক্ষিণ ভারতের আরও একটি রাজ্য কেরালা। কেরালার কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুর একটি কার্টুন নিজের ফেসবুকে পোস্ট করেছেন। জঙ্গলে বাঘ, হাতি, বাজপাখি, শেয়াল, শিম্পাঞ্জি সকলেই হাঁসের ডাক ডাকছে। তা দেখে জলাশয়ে একটি হাঁস আরেকটি হাঁসকে বলছে, আমরা ভাষা-নীতি নিয়ে বাড়াবাড়ি করিনি তো? আরেকটি ময়ূরের কার্টুনও ছড়িয়েছে টুইটারে, যার পেখমের নানা পালকে নানা ভাষার নাম। পাশের ছবিতেই দেখা যাচ্ছে ময়ূরের পেখমে কেবল একটিই পালক, তাতে লেখা ‘হিন্দি’। হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবকে রীতিমতো ব্যঙ্গ করা হচ্ছে টুইটার-ফেসবুকে।

বাঙলায় বরং হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলন কমই হচ্ছে। বাঙালি কি ভালোবাসে নিজের ভাষাকে? আমার অভিজ্ঞতা বলে, অধিকাংশ বাঙালিরই বাংলা ভাষা এবং বাংলা সংস্কৃতি নিয়ে কোনও গৌরব নেই। পূর্ব বাংলায় দেখি বাংলা ভাষা এবং বাংলা সংস্কৃতির ওপর ধর্মের নামে আরবি ভাষা এবং আরবি সংস্কৃতি চাপানোর উৎসব, পশ্চিমবঙ্গে সর্ব ভারতীয় হওয়ার নামে বাংলা ভাষা এবং বাংলা সংস্কৃতির ওপর হিন্দি ভাষা এবং হিন্দি সংস্কৃতি চাপানোর উৎসব। পশ্চিমবঙ্গের গরিব-বাঙালি হিন্দি ভাষা বলে জাতে ওঠেন, ধনী-বাঙালি ইংরেজি ভাষা বলে জাতে ওঠেন। বাংলা ভাষা আমার মতো বোকাসোকা বাংলা ভাষার লেখক কাম পাঠক মধ্যবিত্তরাই আবেগ, ভাষাকে ভালোবেসে যে মানুষ ইউরোপ আমেরিকা ছেড়ে এসেছে। এসে হতবুদ্ধি হয়ে যা দেখছি, তা হলো, কোনও মূর্খ অশিক্ষিত লোক ইংরেজি ভাষা ভালো বলতে পারলেই তাঁকে শিক্ষিত এবং জ্ঞানী বলে ভাবেন পূর্ব, পশ্চিম, দক্ষিণ এবং উত্তর বঙ্গের বাঙালিরা। ইংরেজি- মিডিয়াম -ইস্কুলে পড়া ছেলেমেয়ে বাংলা বলতে না পারলে অভিভাবকেরা খুশিতে বাগ বাগ। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা বাংলা ভাষাকে পা মাড়িয়ে হিন্দি যখন এসে উপস্থিত হবে, স্বাগত জানাবেন বলে বসে আছেন। দিল্লিতে কেরালার কিছু বন্ধু আমার আছে, ওঁরা এখানে বহু বছর চাকরি বাকরি করছেন। আমার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ওঁরা কখনও একটি হিন্দি শব্দও ব্যবহার করেন না। ওঁরা কারও সঙ্গেই তা করেন না, একান্তই জরুরি না হলে। দিল্লিতে আমার কিছু বাঙালি পরিচিত লোক আছেন, আমি তাঁদের সঙ্গে বাংলা বলি, কিন্তু বাংলা বলতে তাঁদের আড়ষ্টতা আমি লক্ষ করি। তাঁরা হিন্দি বলতেই আরাম পান। আর দু ক্লাস পড়াশোনা করেই, ভুল হোক ক্ষতি নেই, ইংরেজি বলতে পারলে, তাঁরাও জানেন, শিক্ষিতের কাতারে কী অনায়াসে চলে যাওয়া যায়। একটি দিনের কথা আমি কখনও ভুলবো না। সম্ভবত ২০০৬ বা ২০০৭ সালের দিকে ঘটেছিল। কলকাতা শহরের সল্টলেকে এক সিনেমায় অতিথিদের জন্য ‘অনুরণন’ নামে একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হয়েছিল। তার আগে একটি আলোচনা সভার অয়োজন করা হয়েছিল। চলচ্চিত্রটি বাংলায়, আলোচক সকলেই বাংলা জানেন, দর্শক সকলে বাঙালি, অথচ আলোচকদের সকলকে ইংরেজিতে আলোচনা করতে হবে। সেই অনুষ্ঠানের নিয়ম আমি ভঙ্গ করেছিলাম। সকলে ইংরেজিতে আলোচনা করলেও আমি বাংলায় করেছি। আলোচক এবং নিয়ন্ত্রক বড় অস্বস্তিতে ভুগছিলেন। আমার বক্তব্য অন্যদের চেয়ে বেশি ভালো, বেশি তথ্যপূর্ণ এবং যুক্তিপূর্ণ হলেও যেহেতু আমি বাংলায় বলেছি, মুহূর্তে আমি ব্রাত্য হয়ে যাই সকলের কাছে। বাংলায় বলেছি বলে অনুষ্ঠানের বক্তাদের জন্য যে লাঞ্চের ব্যবস্থা ছিল, সেখানে আয়োজকেরা আমাকে ডাকেননি। এই ঘটনাতেই কি স্পষ্ট হয় না বাংলার শিক্ষিত শ্রেণি বাংলাকে কতটা ঘৃণা করেন, এবং ইংরেজিকে কতটা ভালোবাসেন!

যতই ভাষা দিবস পালন হোক না কেন, যতই বছর বছর বাংলা বইয়ের মেলা হোক না কেন, বাংলা ভাষার মৃত্যু অবধারিত। ভাষাকে ভালো না বাসলে ভাষা মরে যায়। ভারতবর্ষের কোনও রাজ্যে অনায়াসে হিন্দি এসে পাকা আসন গেড়ে যদি বসতে চায়, সে পশ্চিমবঙ্গ। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যত ব্যবধানই পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের থাকুক না কেন, ভাষাকে ধ্বংস করার ব্যাপারে দু’বাংলাই সমান উদ্যোগী। বাংলা নিয়ে দু’বাংলাতেই মানুষের প্রচন্ড লজ্জা।

লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।


আপনার মন্তব্য