শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২২ নভেম্বর, ২০১৯ ২৩:৫০

পুলিশের কাছে দোষ স্বীকার করলে কী হয়

অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক

পুলিশের কাছে দোষ স্বীকার করলে কী হয়

একটি সংগৃহীত আইনি কৌতুক দিয়েই লেখাটি শুরু করি। জাতিসংঘের একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে বাংলাদেশের একজন পুলিশ কর্মকর্তা যোগ দেন। তার সঙ্গে সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স আর ব্রিটেনের একজন করে পুলিশ কর্মকর্তাও যোগ দেন। তাদের প্রশিক্ষণের একটি অংশ ছিল আমাজান বনে। এ বনের মধ্যে কয়েকটি হরিণের বাচ্চা ছেড়ে দেওয়া হয়। কর্মকর্তাদের বলা হয়, এই বাচ্চাগুলোকে খুঁজে বের করে আনতে হবে। সময় দেওয়া হবে এক দিন। তবে এর বেশি সময় লাগলেও হরিণের বাচ্চা ছাড়া খালি হাতে ফেরা যাবে না। সুইজারল্যান্ডের পুলিশ কর্মকর্তা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই হরিণের বাচ্চা উদ্ধার করে ফিরলেন। ফ্রান্সের পুলিশ হরিণের বাচ্চা নিয়ে হাজির হন তিন দিন পর। ব্রিটেনের কর্মকর্তা সাত দিন পর। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তা ১৫ দিন পর। কিন্তু বাংলাদেশের পুলিশ কর্মকর্তার কোনো খোঁজ নেই। প্রশিক্ষকরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। এক মাস পর ব্রাজিলের বিভিন্ন শহর থেকে ঘুরেফিরে একটি ছাগলের বাচ্চা নিয়ে হাজির হলেন বাংলাদেশি পুলিশ কর্মকর্তা। প্রশিক্ষকরা প্রশ্ন করলেন, ছাগলের বাচ্চা নিয়ে এলেন কেন? জবাবে পুলিশ কর্মকর্তা বললেন, কে বলেছে এটা ছাগলের বাচ্চা। একে রিমান্ডে দিন। দেখবেন পরদিন এটা নিজেই স্বীকার করবে যে সে একটা হরিণের বাচ্চা। কাজেই রিমান্ডে পুলিশ গ্রেফতার ব্যক্তিকে কীভাবে হেফাজত করে তা ভুক্তভোগী ছাড়া অন্য কারও বোঝা কঠিন। শুনলেই গা শিউরে ওঠার মতো সেই হেফাজতের বর্ণনা। রাজনীতির পজিশন-অপজিশনের অনেকেই সেই হেফাজতের ভুক্তভোগী। স্বাধীনতার পর রিমান্ডের নানা বীভৎস ও ভয়ঙ্কর পর্বের স্বাদ নিতে হয়েছে  অনেক রাজনীতিককেই। ১৮৯৮ সালের মান্ধাতা আমলের ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪, ১৬৪ ও ১৬৭-এর বহুবিধ ও যত্রতত্র ব্যবহার জনমনে বিতৃষ্ণার জন্ম দিয়েছে। এমনকি অনেকে বলেও ফেলেন যে, দৈত্যতন্ত্র ক্রমান্বয়ে গণতন্ত্রকে রাহুগ্রাসে নিপতিত করছে। মুলা চুরির অভিযোগে গ্রেফতারকৃতকেও রিমান্ডে নেওয়ার ক্ষমতা আছে পুলিশের। এ ক্ষেত্রে পুলিশের ক্ষমতা অবারিত। ৫৪ ধারায় গ্রেফতার এমনকি আদালতে আত্মসমর্পণকারীকে রিমান্ডে নেওয়ার ক্ষমতাও চর্চা করছে পুলিশ। আদালতে ডিমান্ড আবেদন করলেই ম্যাজিস্ট্রেট রিমান্ড দিতে অনেকটা বাধ্য। পুলিশের ডিমান্ডে মঞ্জুর রিমান্ডের কমান্ডিংও থাকে পুলিশেরই হাতে। যদিও ম্যাজিস্ট্রেটের কোনো আসামিকে পুলিশ রিমান্ডে দেওয়া না দেওয়ার ক্ষমতা দুটোই আছে। তবে রিমান্ডে দেওয়ার ক্ষমতা যত বেশি, না দেওয়ার ক্ষমতা তত নয়। এ ক্ষেত্রে পুলিশের ডিমান্ডই বেশি কার্যকর। বলা যায়, এ কাজে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা পুলিশের। বরাবরই পুলিশের এ নিরঙ্কুশ ক্ষমতার বেনিফিট নেয় ক্ষমতাসীনরা, প্রভাবশালীরা। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাউকে প্লেট চুরি, ঘড়ি চুরি, মোবাইল ফোন চুরির মতো মামলা দিয়ে গ্রেফতারের পর পরই নেওয়া হয় রিমান্ডে। মামলা আসল উদ্দেশ্য নয়। আসল উদ্দেশ্য রিমান্ডে নিয়ে নাস্তানাবুদ করা। সোজা কথায় ধোলাই দেওয়া। এর প্রক্রিয়া হচ্ছে প্রথমে মামলা সাজানো। এরপর বিদ্যুৎগতিতে গ্রেফতার-নাজেহাল, ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চালান। সেখান থেকে পুলিশ রিমান্ডে। আসামিপক্ষ নামজাদা উকিল-ব্যারিস্টার দিয়েও এ রিমান্ড ঠেকাতে পারে না। কারণ রিমান্ড ঠেকানোর আইনি কোনো শক্ত বিধান নেই বললেই চলে। রিমান্ডে নেওয়ার জন্য পুলিশের সপক্ষে যত সহজতর আইনি বিধান আছে; রিমান্ডে না নেওয়ার জন্য আসামিপক্ষে তা নেই। স্মরণ করতে পারেন না রিমান্ডে তার ওপর কী নিপীড়ন চলেছিল। এমনিতেই পুলিশ অত্যন্ত ক্ষমতাধর! প্রকাশ্যে, গোপন স্থানে বা থানার লকআপে যে কোনো স্থানে যে কোনো সময় কাউকে আচ্ছামতো ধোলাই দেওয়ার ক্ষমতা পুলিশের আছে। এ ক্ষমতা পুলিশ অহরহই চর্চা করছে। আর রিমান্ড হচ্ছে অনেকটা আইনগতভাবে নির্যাতনের পর্ব। প্রচলিত কোনো আইনেই রিমান্ডে নির্যাতন অপরাধ হিসেবে গণ্য নয়। কম্বল থেরাপি (কম্বল পেঁচিয়ে পেটানো), বস্তা থেরাপি (বস্তায় পুরে পেটানো-আছড়ানো), বাদুড়ধোলাই (উল্টো করে ঝুলিয়ে পেটানো), ড্যান্সিং টর্চার (বৈদ্যুতিক শক), পায়ুপথে লাঠি বা গরম ডিম ঢোকানো, পেনিস থেরাপি ইত্যাদি ধরনের রোমহর্ষক নিপীড়নে হেফাজত করা হয় সেখানে। আর রিমান্ডের আসামিটি নারী হলে হেফাজতের নমুনা হয় আরও জঘন্য-অকথ্য। সুস্থ-স্বাভাবিক কোনো নারীর পক্ষে রিমান্ডের সেই বর্ণনা বাইরের কারও কাছে বলার মতো নয়। অবশ্য সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদের সাবেক স্ত্রী বিদিশা পুলিশ রিমান্ডে নির্যাতনের কিঞ্চিত বর্ণনা প্রকাশ করেছিলেন। পাঠক! এবার আসল কথায় আসি। পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি আইনে কতটুকু, কখন গ্রহণযোগ্য তা নিয়েই মূলত আমার এ লেখা। সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ২৪ ধারা মোতাবেক ‘কোনো প্রলোভন, ভীতি প্রদর্শন বা সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে স্বীকারোক্তি আদায় করা হলে তা অপ্রাসঙ্গিক বলে বিবেচিত হবে। দোষ স্বীকার অবশ্যই স্বেচ্ছাকৃত ও বিনা ভয়ভীতিতে হতে হবে।’ সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ২৫ ও ২৬ ধারা মোতাবেক ‘কোনো অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি পুলিশ কর্মকর্তার কাছে বা পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন অবস্থায় দোষ স্বীকার করলে এটি তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যাবে না।’ এ ধারার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, অসহায় অভিযুক্তকে পুলিশের হাত থেকে রক্ষা করা। পুলিশ যাতে বেআইনিভাবে কাউকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দিতে না পারে সেজন্য এই ধারা রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। যে কোনো পদবিরই পুলিশ অফিসার হোন না কেন তার সামনে স্বীকারোক্তি আইনে অপ্রাসঙ্গিক। সাক্ষ্য আইনের ২৪ ধারা অনুযায়ী, স্বীকারোক্তি সব সময় নিজেকে জড়িত করে প্রদান করতে হবে। নিজেকে জড়িত না করে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দিলে তা স্বীকারোক্তি হিসেবে গণ্য হবে না।

এখন এই স্বীকারোক্তি ২৪ ধারা অনুসারে অপ্রাসঙ্গিক প্রমাণ করতে হলে আদালত যুক্তিসংগত বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। যেমন কার কাছে দোষ স্বীকার করা হয়েছে, কোন সময় ও কোন স্থানে দোষ স্বীকার করা হয়েছে, কী পরিস্থিতির ওপর দোষ স্বীকার করা হয়েছে, এসব বিষয় আদালত ভালোভাবে খুঁটিয়ে দেখবে। এটা স¤পূর্ণ আদালতের এখতিয়ার।

লেখক : সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী।


আপনার মন্তব্য