শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২২ নভেম্বর, ২০১৯ ২৩:৫২

রসুলুল্লাহর মাদানি জীবন

মুফতি মহিউদ্দীন কাসেম পেশ ইমাম, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ

আল কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রসুলের মাঝে উত্তম আদর্শ রয়েছে।’ সূরা আহজাব, আয়াত ২১। আর এ আদর্শই মানুষকে দুনিয়া ও আখিরাতে শান্তি, সফলতা এবং মুক্তি দিতে পারে। সুতরাং রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মক্কি জীবন, মাদানি জীবন সবই উম্মতের জন্য অনুসরণীয়। তাঁর এ দুই জীবনের মধ্যে অন্যতম পার্থক্য হলো, মক্কা জন্মস্থান হলেও তিনি ও মুসলমানরা সেখানে ছিলেন দুনিয়াবি শক্তির দিক দিয়ে দুর্বল ও নির্যাতিত। পক্ষান্তরে মাদানি জীবনের প্রথম থেকেই এর চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারণ একদিকে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে ছিলেন জীবন উৎসর্গকারী মুহাজির সাহাবির একটি দল আর তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হলেন অসাধারণ ত্যাগ ও ভ্রাতৃত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী আনসার সাহাবির আরও একটি দল। আর এ দুই দলের পারস্পরিক অসাধারণ আত্মত্যাগ ও অনুপম আদর্শে মাদানি জীবনের শুরু থেকেই পরিবেশটা ছিল মুসলমানদের অনুকূলে। যদিও ইহুদিদের হঠকারিতা ও বিরোধিতার কোনো কমতি ছিল না।

মুহাজির-আনসারদের অসাধারণ আত্মত্যাগ : রসুলুল্লাহ  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় হিজরতের লক্ষ্যে যখন গারে সাওয়ে পৌঁছলেন তখন হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) বললেন, ইয়া রসুলুল্লাহ! এ গুহায় প্রথমে আমি অবতরণ করব যাতে কোনো ক্ষতিকর কিছু থাকলে আমার কিছু হলেও আপনার কিছু না হয়। তিনি গুহায় নেমে সুন্দরভাবে সেখানটা পরিষ্কার করার পর রসুল  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুহায় অবতরণ করেন। গুহার মাঝে যতগুলো ছিদ্র ছিল সবকটি সঙ্গে থাকা একটি কাপড় টুকরা টুকরা করে বন্ধ করতে সক্ষম হলেও একটি ছিদ্র বন্ধ করতে না পেরে নিজের পা দিয়ে ছিদ্রের মুখ বন্ধ করে রাখলেন। তখন ওই গর্তে থাকা সাপ হজরত আবুবকর (রা.)-কে দংশন করলে তিনি কষ্ট সহ্য করতে না পেরে চোখ দিয়ে পানি ঝরাতে শুরু করলেন। রসুল  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, আবুবকর তোমার কী হয়েছে? আবু বকর (রা.) বললেন, আমাকে সাপে দংশন করেছে। তখন রসুল  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের মুখের লালা ওই দংশিত স্থানে লাগিয়ে দিলে ব্যথার উপশম হয়। আরেকটি ঘটনা : রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় পৌঁছে হজরত আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)-এর বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। লোকজনের সাক্ষাতের সুবিধার্থে তিনি ছিলেন নিচতলায়। একদিন রাতে ওপরের তলায় পানি পড়ে গিয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে হজরত আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) শীতের রাতে গায়ের কম্বল দিয়ে ওই পানি পরিষ্কার করেন এবং কম্বল ছাড়াই রাত কাটিয়ে দেন। তবু তিনি রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গায়ে এক ফোঁটা পানি পড়–ক তা সহ্য করেননি। সাহাবায়ে কিরামের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের দৃষ্টান্তও ছিল উল্লেখযোগ্য।

আনসারি সাহাবি সাদ ইবনে রবি (রা.) মুহাজির সাহাবি হজরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)-এর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর তাঁকে বললেন, ‘আপনি আমার অর্ধেক সম্পদ গ্রহণ করুন এবং আমার দুজন স্ত্রী আছেন, আপনার পছন্দ অনুযায়ী একজনকে আমি তালাক দিয়ে দেব। আপনি ইদ্দত শেষে তাকে বিয়ে করে নেবেন।’ সাহাবায়ে কিরাম রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য যেসব আত্মত্যাগ করেছেন সেসব ঘটনার মাঝে এ হলো একেবারেই ছোট দুটি ঘটনা। বোঝানোর উদ্দেশ্য মক্কি জীবনে হোক আর মাদানি জীবনেই হোক সাহাবায়ে কিরাম রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য যেভাবে জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁর অনুসরণ করেছেন আমাদেরও জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁকে অনুসরণ-অনুকরণ করতে হবে। সাহাবায়ে কিরাম নিজেদের ঘরবাড়ি, পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন ক্ষেত্রবিশেষ সব পরিহার করেছেন। কিন্তু রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ, ভালোবাসা, তাঁর সঙ্গ ছাড়েননি। সুতরাং আমাদেরও যত কষ্ট করতে হয় করতে হবে। যত ত্যাগ স্বীকার করতে হয় করতে হবে। যতটা বিসর্জন দিতে হয় দিতে হবে। তার পরও রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুমহান আদর্শ থেকে সরে যাওয়া যাবে না। এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।

 


আপনার মন্তব্য