শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৮ অক্টোবর, ২০২০ ২২:৫০

করোনায় জহুরুল ইসলাম মেডিকেলের ভূমিকা

মনোজ রায়

করোনায় জহুরুল ইসলাম মেডিকেলের ভূমিকা

পেছনে ফেলে এসেছি ২৫ বছর বা সিকি শতাব্দী। এদেশের বিশেষত বাঙালির এক গর্বের ধন, সফল ব্যবসায়ী, সমাজসেবী ও সৃজনশীল শিল্পোদ্যোক্তা দানবীর জহুরুল ইসলামের ২৫তম প্রয়াণ দিবস ১৯ অক্টোবর। সাধারণ থেকে কীভাবে অসাধারণ হয়ে ওঠা যায় অথবা সৃষ্টিকর্তা কাউকে কর্মজীবনে সাফল্য দিলে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্য কী হওয়া উচিত তার একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায় এ মানুষটির জীবন থেকে। দীর্ঘ জীবন পাননি তিনি। মাত্র ৬৭ বছর বয়সে চলে গেছেন না ফেরার দেশে।

অপরিণত বয়সে তাঁর এ চলে যাওয়া- শুধু কি ক্ষতি তাঁর পরিবারের? না, সবচেয়ে বড় সত্য হলো এ ক্ষতি গোটা সমাজের ও দেশের। তাই তো এ চলে যাওয়াকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে পারি না। এ স্বল্প সময়ের জীবনে কত অসাধ্য সাধন তিনি করেছেন তার ফিরিস্তি দিতে গেলে প্রবন্ধটি হবে নাতিদীর্ঘ। সারা বিশ্ব এখন মহাবিপর্যয়ে। কভিড-১৯ এর মহামারীতে ক্ষতবিক্ষত ও বিধ্বস্ত। ১১ লাখেরও বেশি মানুষ এ মরণ ব্যাধিতে এরই মাঝে প্রাণ হারিয়েছেন।

কোটি কোটি মানুষ হারিয়েছে কর্ম, মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে কত মানুষ তার সঠিক পরিসংখ্যান বোধকরি কারও জানা নেই। এ কঠিন দুঃসময়ে সারা পৃথিবীর মতো আমাদের প্রিয় স্বদেশভূমির প্রতিটি মানুষও অসহনীয় অবস্থার মুখোমুখি। বিশ্বের শক্তিধর ও সম্পদশালী দেশগুলোও যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখন আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের অবস্থা কী হতে পারে তা ব্যাখ্যা করে বলার অবকাশ নেই। সীমিত সম্পদ সত্ত্বেও দেশের সরকার দেশবাসীর পাশে দাঁড়ানোর প্রয়াস নিয়েছে। কভিড আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে কত চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন আমরা সবাই তা জানি। এ প্রসঙ্গে একটি কথা উল্লেখ করতে চাই। করোনার ভয়াবহ থাবায় যখন দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা যখন সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে, রাজধানীসহ দেশের বড় বড় শহরে নানা অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত মানুষ যখন ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা পেতে দিগ্বিদিক ছুটে বেড়িয়েছেন, তখন প্রয়াত জহুরুল ইসলামের অন্যতম সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল শতভাগ নিষ্ঠা ও মমতা দিয়ে সব ধরনের রোগীর চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রেখেছে। কভিডের ভয়াবহ আগ্রাসনের এ সময়ে এ হাসপাতালে রোগীর চাপ অন্য যে কোনো সময় থেকে বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও কর্মচারীরা রোগীদের প্রতি তাদের দায়িত্ব পালনে সামান্যতম শৈথিল্য দেখিয়েছেন বলে শোনা যায়নি।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অতিশয় সচেতন থেকে রোগীদের সেবা প্রদানের বিষয়টি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মীরা যে কোনো ধরনের রোগীকে সেবা প্রদানের যে শপথ উচ্চারণ করে এ পেশায় যোগ দিয়েছেন সেই শপথ সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালনে সচেষ্ট রয়েছেন।

মাত্র ৬৭ বছর বয়সের জীবনে আলহাজ জহুরুল ইসলাম গড়ে তুলেছিলেন নানা ধরনের শিল্প কারখানা। পাট থেকে পাটজাত দ্রব্য উৎপাদন করে বিদেশে রপ্তানি করেছেন। চিকিৎসাসেবার স্বার্থে গড়ে তুলেছেন ওষুধ শিল্প। গভীর নলকূপ বসিয়ে মাটির বুক চিরে পানি তুলে এনে সবুজে সবুজময় করে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার কাজসহ কৃষিজাত পণ্য, পোলট্রি শিল্প- কঠিন কাজ তিনি করে গেছেন।

দেশের প্রথম আবাস তৈরির নিখুঁত কারিগর ছিলেন তিনি। হাউজিং ব্যবসার পথিকৃৎ বলা হয় তাঁকে। হাজার হাজার মানুষ এসব প্রতিষ্ঠানে তাঁদের শ্রম ও মেধার ব্যবহার ঘটিয়ে সৃষ্টি করেছেন নতুন নতুন ইতিহাস।

প্রয়াত জহুরুল ইসলাম ছিলেন এ শিল্প ও কৃষি বিপ্লবের সেনাপতি। নানাবিধ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পাশাপাশি তাঁর প্রিয় জন্মভূমি কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর উপজেলার ভাগলপুর গ্রামে গড়ে তুলেছেন একটি অত্যাধুনিক হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ। দেশি-বিদেশি কত শিক্ষার্থী এ প্রতিষ্ঠান থেকে স্নাতক হয়ে মানবসেবায় নিয়োজিত করেছেন নিজেদের। বেসরকারি পর্যায়ে স্থাপিত চিকিৎসা শিক্ষা ও সেবা প্রতিষ্ঠানের তালিকার প্রথম কাতারে স্থান দখল করে আছে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই। প্রায় তিন দশক অতিক্রম করছে এ প্রতিষ্ঠান। দেশবাসী, বিশেষ করে তাঁর জন্মভূমির মানুষ মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে- মরহুম জহুরুল ইসলামের সব সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছে এ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। এ প্রতিষ্ঠানের আয় থেকে কখনো তার পরিবার অর্থ নেয় না, ঘাটতি হলে অন্য প্রতিষ্ঠানের আয় থেকে জোগান দেয়। মানবতার সেবায় তাঁর এ অসামান্য অবদান তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে অনির্দিষ্টকাল। দায়িত্ববোধ, স্বদেশের দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রাম এবং সর্বোপরি একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভূমিকা তিনি পালন করেছেন। কথা ও কাজের মাধ্যমে বারবার প্রমাণ করেছেন যে, তিনি এ মাটির একজন অপরাজেয় কারিগর।

২৫তম প্রয়াণ দিবসে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে আমার বারবারই মনে হচ্ছে, এমন মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন যত বেশি মানুষ জন্ম নেবে, সমাজে অবহেলিত ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল মানুষের বেঁচে থাকা ও জীবনমান উন্নয়নের তত বেশি সম্ভাবনা তৈরি হবে।

আমার শেষ জিজ্ঞাসা- দেশ, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি তাঁর যে অবদান- রাষ্ট্র কি তার যথাযথ স্বীকৃতি দিয়েছে? একটি রাষ্ট্রীয় পদকও কি জুটতে পারত না তাঁর ভাগ্যে।  তারপরেও সাহস করে দ্বিধাহীন চিত্তে বলা যায়, দেশের মানুষের হৃদয়ে তিনি চির জাগ্রত আছেন এবং থাকবেন তাঁর মানব প্রেমের জন্য।

            লেখক : সাংবাদিক।


আপনার মন্তব্য