শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ২১ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২০ মার্চ, ২০২১ ২৩:০১

টিকা নিয়ে হরেক মজার কাহিনি

সাইফুর রহমান

টিকা নিয়ে হরেক মজার কাহিনি

যদিও কলেরা, পোলিও, ওলাওঠা, বসন্ত প্রভৃতি মহামারী ভারতবর্ষের এ অঞ্চলগুলোয় দাপিয়ে বেড়িয়েছে দীর্ঘদিন। কিন্তু সত্যিকার অর্থে মহামারীর বড় ধরনের আঘাতের কথা যদি বলতে হয় তবে সেটা ছিল ১৮৯৮ সালের প্লেগ। এ প্লেগ মহামারীর মধ্যেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তাঁর ভাইপো অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বামী বিবেকানন্দ ও তাঁর সহসন্ন্যাসীরা সেবা করেছিলেন পীড়িতদের। ভগিনী নিবেদিতা মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ব্যাধিগ্রস্তদের মৃত্যুমুখ থেকে বাঁচিয়ে তুলতে। সে কথা আমি আমার গত কিস্তির লেখা ‘মানুষের জন্য মানুষ’-এ বিস্তারিত লিখেছি। ১৮৯৮ সালের প্লেগ রোগটি আসলে শুরু হয়েছিল মুম্বাই শহরে এবং ক্রমে এর ঢেউ আছড়ে পড়ে এ বাংলায়। পরে তা মহামারী আকার ধারণ করে। এ মহামারীর বিশদ বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছেন বাংলা সাহিত্যের যশস্বী লেখক প্রেমাঙ্কুর আতর্থী তাঁর ‘মহাস্থবির জাতক’ গ্রন্থে। সমকালীন পাঠকের অনেকেরই হয়তো অজানা কী এক অসামান্য উপন্যাস এ ‘মহাস্থবির জাতক’। প্রবীণ পাঠককুলের মধ্যেও কেউ কেউ হয়তো বিস্মৃত হয়েছেন এ গ্রন্থটি সম্পর্কে। প্রায় ৭০০ পৃষ্ঠার বিশাল এ উপন্যাসখানার প্রকাশকাল ১৯৪৫-৪৭। সেকালে উপন্যাসখানা এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে সে সময়কার লেখক অনেকের হৃদয়েই সেটা গভীরভাবে রেখাপাত করেছিল। বর্তমান সময়ের কিংবদন্তিতুল্য সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় কথা প্রসঙ্গে একদিন আমাকে বলেছিলেন, কৈশোরে এ উপন্যাসটি পড়ে তিনি নাকি দারুণভাবে আলোড়িত হয়েছিলেন। ওটা তখন ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল কোনো একটি পত্রিকায়। সে সময় তিনি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন পরবর্তী কিস্তি পড়ার জন্য। সে সময়কার মহামারীর বিশদ বর্ণনা প্রেমাঙ্কুর আতর্থী লিপিবদ্ধ করেছেন তাঁর ‘মহাস্থবির জাতক’ উপন্যাসটিতে। যে সময়ের কথা লেখক লিখেছেন সে সময় তিনি বালকমাত্র। কিন্তু স্মৃতি থেকে তিনি যে বর্ণনা দিয়েছেন তা ভয়াবহ। মহাস্থবিরের ভাষ্যানুযায়ী প্লেগ ঠেকাতে সে সময় করপোরেশন থেকে বিনামূল্যে টিকা প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, টিকার জন্য জনসাধারণের কোনো পয়সা খরচ করতে না হলেও সহজে কেউ টিকা নিতে চাইত না। বর্তমান সময়ে করোনার টিকা নিতে যে সাড়া জেগেছে সে সময়ের অবস্থা ছিল বিপরীত। সে সময় গুজব রটেছিল- প্লেগ থেকে বাঁচার টিকা নিলে অচিরেই নাকি মানুষের মৃত্যু ঘটবে। এর ফলে যা ঘটার তা-ই ঘটে। রোগটি দ্রুত বিস্তার লাভ করে চারদিকে। সেকালে শিক্ষাদীক্ষা, জ্ঞানবিজ্ঞানে হিন্দু ও মুসলমানের চেয়ে এগিয়ে ছিল ব্রাহ্মসমাজ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাজা রামমোহন রায় প্রভৃতি আলোকিত মানুষ ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের প্রতিভূ। ফলে দেখা গেল ব্রাহ্মধর্মাবলম্বী মানুষজনই সর্বপ্রথম টিকা নিতে এগিয়ে আসেন। করোনা রোগটির প্রাদুর্ভাব শুরু হয়েছিল প্রায় ১৪ মাস আগে। তখন পৃথিবীর তাবৎ লোক কায়মনোবাক্যে শুধু কামনা করত কবে আবিষ্কৃৃত হবে একটি কার্যকর টিকা। টিকার জন্য মানুষের হাহুতাশের কোনো সীমা-পরিসীমা ছিল না। অথচ বছরখানেক পরে যখন একটি দুটি নয়, পরপর বেশ কটি টিকা আবিষ্কৃত হলো তখন দেখা গেল অনেকের মধ্যেই টিকা নেওয়ার প্রতি রয়েছে কিছুটা অনীহা ও আস্থার অভাব। যেহেতু আমার কিছুটা ইতিহাসচর্চা আছে সেজন্য আমি জানি, নতুন যে কোনো জিনিসের প্রতিই মানুষের ঈষৎ ভয় ও অনীহা কাজ করে আর সব সময়। সে কারণেই আমি বিখ্যাত লেখক প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর ‘মহাস্থবির জাতক’ উপন্যাসটি থেকে ১৮৯৮ সালে মানুষের টিকা নেওয়ার ঘটনাটি এখানে তুলে ধরেছি। তবে আমার কেন জানি মনে হচ্ছে ১০০ বছরের বেশি সময় পরও বেশির ভাগ মানুষের মানসিকতায় আসলে তেমন একটা পরিবর্তন হয়নি। এজন্য দরকার ব্যাপক প্রচার। করোনার টিকা আবিষ্কার মানব জাতির জন্য এক বিরাট সাফল্য। যে কোনো একটি টিকা আবিষ্কার বেশ কিছুটা সময়সাপেক্ষ। একটি টিকা সাধারণত দু-তিন বছরের আগে তৈরি করা বেশ দুরূহ। কোনো কোনো টিকা আবিষ্কারে তো ১০-২০ বছরও লেগে যায়। কিন্তু কভিড-১৯-এর ক্ষেত্রে বছর ঘোরার আগেই ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ভালো করে শেষ হতে না হতেই টিকা তৈরি। বর্তমানে বাংলাদেশে যে টিকাটি দেওয়া হচ্ছে তার নাম অ্যাস্ট্রাজেনেকা আর এর আবিষ্কারক অক্সফোর্ডের বিজ্ঞানী ড. সারাহ গিলবার্ট। সারাহর নেতৃত্বে অক্সফোর্ডের একদল বিজ্ঞানী জানুয়ারিতেই ভ্যাকসিন তৈরির কাজ শুরু করেছিলেন। সারাহ ও তাঁর দলের সংক্রমণজনিত রোগের ভ্যাকসিন তৈরির অভিজ্ঞতা রয়েছে। বিশেষ করে এ টিকা আবিষ্কারের আগে ইবোলা রোগের টিকাও তিনিই আবিষ্কার করেছিলেন। করোনার যেসব টিকা আবিষ্কার হয়েছে তার মধ্যে অক্সফোর্ডের টিকাটি অন্যতম নিরাপদ বলেও ভাবা হয়। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ব্রিটিশ সরকার ও ব্রিটেনের কয়েকটি দাতব্য সংস্থার অর্থায়নে ২০০৫ সালে গড়ে তোলা হয় জেনার ইনস্টিটিউট। উদ্দেশ্য, সংক্রমণজনিত রোগ নিয়ে গবেষণা আর টিকা তৈরি। এডওয়ার্ড জেনারকে বলা হয় ভ্যাকসিনের জনক। প্রায় ২০০ বছর আগে গুটিবসন্তের টিকার অন্যতম আবিষ্কারক ছিলেন বিজ্ঞানী জেনার।

এ মুহূর্তে আমার আরেক প্রাতঃস্মরণীয় বিজ্ঞানীর নাম মনে পড়ছে যিনি দুটি টিকা আবিষ্কার করে লাখ লাখ মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। উনিশ শতকের শেষ ভাগে ওয়ালডেমার মোরডেকাই হাফকিন প্যারিস ও ভারতবর্ষে গবেষণা চালিয়ে কলেরা ও প্লেগ রোগের প্রথম ভ্যাকসিন তৈরি করেছিলেন কিন্তু দুঃখের বিষয় বসন্ত রোগের টিকা আবিষ্কারক ডা. এডওয়ার্ড জেনার কিংবা তার পরে পোলিও রোগের ভ্যাকসিন আবিষ্কারক জোনাস সাল্কর মতো ওয়ালডেমার হাফকিন ভারতে কিংবা ইউরোপে তেমন একটা পরিচিতি পাননি। দীর্ঘদিন কলেরার জীবাণু নিয়ে কাজ করা বিজ্ঞানী হাফকিন প্যারিসে গিনিপিগের ওপর পরীক্ষায় সাফল্যের পর খরগোশ ও কবুতরের ওপর একই ধরনের পরীক্ষা চালান। এর পরও সম্পূর্ণরূপে সন্তুষ্ট হলেন না হাফকিন। ১৮৯২ সালের ১৮ জুলাই ইনজেকশনের মাধ্যমে নিজের দেহে সেই ভ্যাকসিন প্রয়োগ করেন তিনি। এ কাজ করতে গিয়ে তিনি প্রায় মরতে বসেছিলেন বলা চলে। সম্ভবত ডোজের পরিমাণ বেশি হয়ে গিয়েছিল। প্রচন্ড জ্বর নিয়ে বেশ কয়েক দিন শয্যাশায়ী ছিলেন। পরে অবশ্য সেরে ওঠেন।

যুগে যুগে নানা ধরনের টিকা আবিষ্কারের ফলে কোটি কোটি মানুষের জীবন রক্ষা পেয়েছে, এ কথা যেমন সত্য তেমনি ভুল টিকা আবিষ্কার কিংবা প্রয়োগের ফলে নিশ্চিত মৃত্যু ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শত সহস্র সাধারণ মানুষ। বড় ধরনের টিকা বিপর্যয়ের ইতিহাস পাওয়া যায় আমেরিকায়, ১৯৭৬ সালে। সে সময় সোয়াইন ফ্লু বিস্তার রোধে যে টিকা দেওয়া হয়েছিল তা ছিল ত্রুটিযুক্ত। সে সময় প্রায় সাড়ে ৪ কোটি লোককে টিকা দেওয়া হয়েছিল। তার মধ্যে ৪৫০ জন ‘গুইলাইন ব্যারে সিনড্রোম’ (Guillain-Barre Syndrome)-এ আক্রান্ত হয়েছিলেন। অনেকে হয়তো ভাবছেন এ গুইলাইন ব্যারে সিনড্রোম আবার কী বস্তু! এটা হলো এমন এক রোগ যা একজন মানুষের নার্ভ সিস্টেমকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়। ফলে সোয়াইন ফ্লু টিকা নেওয়া মানুষগুলো পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়েছিল। প্রতি এক লাখ রোগীর মধ্যে একজন করে এ রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। এর আগেও যে টিকা বিপর্যয়ের কথা জানা যায় তা হলো ‘দ্য কাটার ইনসিডেন্ট’। পোলিও এ টিকাটি তৈরি হয়েছিল ক্যালিফোর্নিয়ার কাটার ল্যাবরেটরিতে। ১৯৫৫ সালের এপ্রিলে আমেরিকার পশ্চিম ও মধ্য পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় ২ লাখ শিশুকে এ কাটার পোলিও টিকা দেওয়া হয়। কিন্তু এ টিকাটি এতটাই ত্রুটিযুক্ত ছিল যে এ ২ লাখ শিশুর মধ্যে ৪০ হাজার শিশু পোলিওতে আক্রান্ত হয়েছিল। ২ শতাধিক শিশু পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয় ও ১০ শিশু মৃত্যুবরণ করে। এ ছাড়া এই তো সেদিন ২০০৯ সালে হিনি নামের একটি ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা প্রয়োগের ফলে বেশ কিছু রোগীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে তারা পরে নারকোলেপসিতে আক্রান্ত হয়েছে। নারকোলেপসি অর্থ হচ্ছে সময়-অসময়ে নিদ্রাভাব কিংবা ঝিমুনি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, টিকা শুধু ত্রুটিমুক্ত হওয়াটাই যথেষ্ট নয়, এর সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণও পর্যাপ্ত গুরুত্ব বহন করে। তা না হলে যে কোনো সময় যে কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। হাফকিনের কথা আমি আগেই বলেছি যিনি কলেরা ও প্লেগের দুটি রোগের টিকা আবিষ্কার করেছিলেন। তো হয়েছে কী, সেই হাফকিন মহাশয়ের টিকা নেওয়ার পর ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যের মালকোয়াল গ্রামে ১৯০২ সালের মার্চে ১৯ জন  ধনুষ্টঙ্কারে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারান। যেসব সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায় তা থেকে জানা যায় যে পারেল গবেষণাগারে ৪১ দিন আগে তৈরি একটি বিশেষ বোতলের ভ্যাকসিন নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এ বিষয়ে ভারত সরকার একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। তারা দেখতে পায় বোতল শুদ্ধি করার জন্য কার্বলিক অ্যাসিড ব্যবহার না করে তাপ প্রয়োগের মাধ্যমে তা বিশুদ্ধ করা হয়েছিল। আর এটা করা হয়েছিল মি. হাফকিনের নির্দেশে। কারণ এভাবে বেশিসংখ্যক বোতল দ্রুততম সময়ে বিশুদ্ধ করা যেত। এ তাপমাত্রা প্রয়োগের পদ্ধতি তার দুই বছর আগে অর্থাৎ ১৯০০ সাল থেকেই বিশ্বখ্যাত লুই পাস্তুর ইনস্টিটিউটে ব্যবহার হয়ে আসছিল। কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের তা অজানা ছিল। তদন্তের পর মি. হাফকিনকে প্লেগ গবেষণাগারের প্রধানের পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং ভারতীয় সিভিল সার্ভিস থেকে তাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়। পরবর্তীকালে প্রতিবেদনের দলিল-দস্তাবেজ ঘাঁটাঘাঁটি করে লন্ডনের কিংস কলেজের অধ্যাপক ডব্লিউ জে সিম্পসন ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালে লেখা এক চিঠিতে যুক্তি তুলে ধরেন যে ভ্যাকসিনের বোতলটি পারেল গবেষণাগারে নষ্ট হয়নি। সেটি নষ্ট হয়েছিল পাঞ্জাবের সেই গ্রামে যেখানে টিকা কর্মসূচি চলছিল।

টিকা গ্রহণকারী জনসাধারণের মধ্যে আরও কয়েকটি বিষয়ে বেশ ধন্দ রয়েছে। কারণ কোনো টিকা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানই স্পষ্ট করে বলছে না তাদের এ টিকাগুলো আসলে কতটা সময় কার্যকর থাকবে। ছয় মাস, এক বছর, দুই বছর। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান বলছে কমপক্ষে এ টিকা ছয় মাসের জন্য কার্যকর হবে আর এজন্যই বোধহয় আমার এক বন্ধু পরিহাস করে আমাকে একদিন বললেন, তাহলে কি আমরা এখন টিকা পকেটে নিয়ে ঘুরব। এ পর্যন্ত আবিষ্কৃৃত চারটি টিকা বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকা, ফাইজার বায়োএনটেক, মডার্না টিকা ও সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি নোভাভ্যাক্সের টিকা। কিন্তু তাদের মধ্যে কেউই জোর গলায় বলছে না যে এটা শতভাগ কার্যকর। কেউ বলছে ৯০% আবার কেউ বলছে ৯৫% কার্যকর।

বিশ শতকের মাঝামাঝি জোনাস সাল্ক আবিষ্কার করে ফেললেন পোলিওর টিকা। মানবসভ্যতায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের সে এক যুগান্তকারী অবদান। সাল্ককে যখন জিজ্ঞেস করা হলো, টিকাটির পেটেন্ট কার? উত্তরে সাল্ক বলেছিলেন, জনগণের। অর্থাৎ কোনো পেটেন্ট নেই। সূর্যের কি পেটেন্ট নেওয়া সম্ভব? ফোর্বস ম্যাগাজিনের ২০১২ সালের এক নিবন্ধে হিসাব কষে দেখানো হয়েছে, পোলিও টিকার পেটেন্ট না নিয়ে সাল্ক হারিয়েছেন প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার!

টিকা আতঙ্কের আরেকটি প্রধান কারণ ‘সুচভীতি’ যেটাকে ইংরেজিতে নিডেল ফোবিয়া বলে। বাংলাদেশেও কারও কারও মধ্যে সুচ আতঙ্ক প্রকটভাবে কাজ করে। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনার কথা মনে পড়ল। ঘটনাটি পশ্চিমবঙ্গের একজন বিশিষ্ট লেখক সচ্চিদানন্দ দত্ত রায়ের লেখা ‘পুরানো বালাম চালের ভাত’ গ্রন্থটিতে আমি পড়েছিলাম বেশ কিছু বছর আগে। লেখকের আদিবাড়ি বরিশাল জেলায়। তিনি লিখেছেন, মনে আছে, একবার এত বেশি ইলিশ মাছ উঠতে লাগল যে ইলিশ মাছই লোকজনের প্রধান খাদ্য হয়ে উঠল। ফলে পেট ছেড়ে দিল। কলেরায় মানুষের অবস্থা করুণ। খবর পেয়ে থানা (হিজলা) থেকে ইনস্পেক্টর সাহেব সাইকেলে পাইক পেয়াদা নিয়ে বাজারে ঢোল শহরত দিয়ে ইলিশ মাছ বিক্রি কয়েকদিনের জন্য বন্ধ করে দিলেন আর বাজারের সব মাছ মাটিতে পুঁতে দিলেন। কলেরার ইঞ্জেকশন দিতে আরম্ভ হতেই লোকজনের ইলিশ কেনায় ভাটা পড়ল। কেউ ‘টুঁ’ শব্দটি করলেন না, সবাই মেনে নিলেন। সুচের ফোঁড় না ইলিশ? ফোঁড়ের ভয়ই জয়ী হলো।

হাস্যকর হলেও সত্য, পশ্চিমা দেশগুলোতেও এ সুচভীতি মানুষের সংখ্যা অনেক। একটি জরিপে দেখা গেছে, আমেরিকার ১০ শতাংশ মানুষ সুচভীতি আতঙ্কে ভোগেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য হলো, এ সংখ্যা আরও অধিক। আপনাদের মধ্যে অনেকেই হয়তো হলিউডের বিখ্যাত অভিনেতা জাকি চ্যানকে চেনেন। তো হয়েছে কী, একবার অভিনয়ের অংশ হিসেবে স্টান করতে গিয়ে তার একটি আঙুল ভেঙে যায়। ভাঙা আঙুল ঠিক করতে হাত অবশ করা প্রয়োজন আর সেজন্য ডাক্তার যে-ই না জাকি চ্যানের শরীরে ইনজেকশন পুশ করতে উদ্যত হলেন অমনি জাকি চ্যান ভয়ে কুঁকড়ে বললেন, দাঁড়ান ইনজেকশন দিতে হবে না। আমি নিজেই ভেঙে উল্টে যাওয়া আঙুল স্বস্থানে ফিরিয়ে আনছি। এই বলে ভেঙে যাওয়া আঙুলটি মুঠো করে ধরে সজোরে ঘুরিয়ে স্বস্থানে ফিরিয়ে আনলেন।

উল্টে যাওয়া আঙুল স্বস্থানে ফিরিয়ে আনাতে তার কী পরিমাণ ব্যথা হওয়ার কথা একটু ভেবে দেখুন তো। তার পরও সুইয়ের অল্প একটু ব্যথা সহ্য করার মতো ক্ষমতাও তার নেই। তবে এর উল্টোচিত্রও আছে। সাঁওতাল কিংবা যে কোনো আদিবাসী ইনজেকশন নেওয়ার সময় ব্যথা না পেলে নাকি তারা মনে করে সে ওষুধের কোনো কার্যক্ষমতা নেই। ১৯৭৩ সালে আমার শ্বশুর সদ্য ডাক্তারি পাস করে সিলেটের জাফলং অঞ্চলে বদলি হয়েছেন। সেখানে অনেক সাঁওতালের বাস। আমার শ্বশুরের এমন হাতযশ যে তিনি ইনজেকশন পুশ করলে কেউ ব্যথা পায় না। একদিন এক সাঁওতাল মহিলা আমার শ্বশুরকে বলল, আপনার ওষুধের মনে হয় কোনো কার্যক্ষমতা নেই। আমার শ্বশুর অবাক হয়ে বললেন, আপনার কেন মনে হলো যে আমার ইনজেকশনে কার্যক্ষমতা নেই? তখন সেই সাঁওতাল মহিলাটি বললেন, আপনি যখন ইনজেকশন দেন একটু ব্যথাও পাই না। অথচ আপনার অমুক ডাক্তার বন্ধু যখন ইনজেকশন দেয় প্রচন্ড ব্যথা পাই আর তাতেই মনে হয় যেন তার ইনজেকশন বেশি কার্যকর। সাঁওতাল ওই মহিলার কথা শুনে আমার শ্বশুর সাহেবের আক্কেল গুড়ুম। বলে কী মেয়েটি! একদিন কাছে পেয়ে আমার শ্বশুর যখন তার সেই সতীর্থ ডাক্তার বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলেন- কীরে! ইনজেকশন দিতে গিয়ে রোগী ব্যথা পায় কী করে? আমার শ্বশুরের সেই বন্ধুটি তখন বলল, কী করব হুমায়ুন! ইনজেকশন দিতে গিয়ে ব্যথা না পেলে ওরা মনে করে যে এ ওষুধের কোনো কার্যকারিতা নেই। সেজন্য ইনজেকশন দেওয়ার আগে সুচের ডগাটি মেঝেতে ঘঁষে খানিকটা অমসৃণ করে নিই। এ কথা শুনে আমার শ্বশুর তো বিস্ময়ে একেবারে থ। আমার ধারণা, বাঙালির চেয়ে সাঁওতাল, খাসিয়া, মগ, মুরং প্রভৃতি উপজাতি বেশি সচেতন, কারণ যে বছর মি. হাফকিন কলকাতার বস্তিতে তার টিকার সফল পরীক্ষা চালিয়ে দিলেন, তার পরের বছর আসামের চা বাগানের মালিকরা তাকে আমন্ত্রণ জানান সেখানে গিয়ে বাগানের শ্রমিকদের ওপর তার ভ্যাকসিন প্রয়োগ করতে। তিনি সেখানে হাজার হাজার শ্রমিককে টিকা দেন।

টিকাদানে উৎসাহিত করার জন্য দেশের স্বনামধন্য ব্যক্তিদের টিকা দেওয়ার ছবি টেলিভিশন ও সোশ্যাল যোগাযোগমাধ্যমে বেশ ফলাও করে প্রচার হচ্ছে। এটি বেশ ভালো টেকনিক। সেকালে মি. হাফকিনও একই কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। তিনি ব্রিটিশ শ্বেতাঙ্গ ডাক্তারদের বাদ দিয়ে কলকাতার সব বড় বড় স্থানীয় লোকজন যেমন ডা. চৌধুরী, ডা. ঘোষ, ডা. চ্যাটার্জি এবং ডা. দত্তদের মতো ভারতীয়দের সঙ্গে নিয়ে কাজ করতেন। তিনি আরও একটা কৌশল অবলম্বন করলেন তা হলো, তার উদ্ভাবিত টিকা জনসমক্ষে তিনি নিজের দেহে প্রয়োগ করতেন। উদ্দেশ্য এটা দেখানো যে এটা নিরাপদ। ভারতীয় ডাক্তারদের সঙ্গে নিয়ে তিনি দিনরাত বস্তিতে বস্তিতে ঘুরতেন। বস্তির মজদুররা কাজে বেরোনোর আগে তিনি তাদের টিকা দিতেন। সন্ধ্যায় ঘরে ফেরার সময়ও লোকজন দেখতে পেত মি. হাফকিন তেলের বাতি জ্বালিয়ে বস্তিতে এক মনে কাজ করে যাচ্ছেন।

লেখক : গল্পকার ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী।

ই-মেইল :  [email protected]