শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১২ এপ্রিল, ২০২১ ২৩:০৭

তাঁর কাছে অনেক শেখার ছিল

অধ্যাপক ডা. অরূপরতন চৌধুরী

তাঁর কাছে অনেক শেখার ছিল
Google News

করোনার এ মহামারীতে সারা বিশ্ব কঠিন এক বাস্তবতার মধ্যে অতিবাহিত করছে। বাংলাদেশে যখন আমরা দ্বিতীয় ঢেউয়ে সংক্রমিত হয়ে দিনে সর্বোচ্চ ৭৭ জন মৃত্যুবরণ দেখছি, তেমনই একটি সময় আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছেন অনেক গুণী শিল্পী। এর মধ্যে আমাদের স্বাধীন বাংলা বেতারের নমিতা ঘোষ, ইন্দ্রমোহন রাজবংশীর মৃত্যুতে চোখের পানি মুছতেই না মুছতে আরেক জনপ্রিয় রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী মিতা হক চলে গেলেন রবিবার ভোর ৬টা ২০ মিনিটে। বয়স হয়েছিল ৫৯। মিতা দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগছিলেন, সেই সঙ্গে চলছিল ডায়ালাইসিস। এর মধ্যে করোনা পজিটিভ হয়েও সেরে উঠেছিলেন। ১৯৬২ সালে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন মিতা হক। প্রথমে তাঁর চাচা ওয়াহিদুল হক পরে ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন ও সন্জীদা খাতুনের কাছে গানের তালিম নেন। ১৯৭৭ সাল থেকে তিনি নিয়মিত বেতার ও টেলিভিশনে গান গান। ২০১৬ সালে শিল্পকলা পদক লাভ করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৬তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে মিতা হক বাংলা একাডেমি রবীন্দ্র পুরস্কার লাভ করেন। সংগীতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ২০২০ সালে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদক লাভ করেন।

১৯৭৪ সালে বার্লিনে আন্তর্জাতিক যুব ফেস্টিভ্যালে অংশগ্রহণ ছাড়াও দেশ ও দেশের বাইরে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মিতা অংশগ্রহণ করেন। দীর্ঘদিন যাবৎ ছায়ানটে রবীন্দ্রসংগীতে শিক্ষকতাও করেছেন। একসময় ছায়ানটে রবীন্দ্রসংগীত বিভাগের প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ‘সুরতীর্থ’ নামে একটি সংগীত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের সহসভাপতি ছিলেন। এককভাবে মুক্তি পাওয়া মোট ২৪টি গানের অ্যালবাম তাঁর মুক্তি লাভ করেছে।

আমার মায়ের (বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মঞ্জুশ্রী চৌধুরী) প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর দিনে তাঁকে গান গাইতে আমন্ত্রণ জানানোর সঙ্গে সঙ্গে সম্মতি দিলেন, গান গাইলেন। আমি বললাম, ‘মিতা! তোমার কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ, তুমি একবার বলাতেই চলে এলে গান গাইতে।’ মিতা আমাকে বলল, ‘অরূপদা! এমন গুণীজনের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে শ্রদ্ধা জানানোর মতো বড় আর কী হতে পারে।’ সেদিনই আমি তাঁকে চিনেছি কত উঁচু মনের একজন প্রকৃত শিল্পী তিনি।

তাঁকে কখনো সে রকমভাবে এতগুলো টিভি চ্যানেলে অন্যদের মতো গান গাইতে দেখিনি। হয়তো তাঁকে ডেকে নিয়ে গান গাওয়ানোর মতো আগ্রহ কেউ দেখায়নি। তবে তাঁর মতো একজন গুণী শিল্পীকে সবকটি চ্যানেল গান গাওয়ালে যে তাদের নিজেদেরই সম্মান বাড়ত, তা বোঝার মতো মানসিকতা হয়তো তৈরি হয়নি এ দেশে। প্রয়োজন ছিল এ রকম গুণী শিল্পীর গান আরও বেশি প্রচার করা, যাতে নতুন প্রজন্ম তাঁকে চিনতে পারে, বুঝতে পারে। কারণ তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছুই শেখার ছিল। একজন শিল্পীর মধ্যে যেসব গুণ থাকা একান্ত প্রয়োজন মিতা হকের মধ্যে তার সবই ছিল। একজন নম্র, বিনয়ী, নিরহংকার গুণী শিল্পী ছিলেন মিতা হক। আমাদের প্রজন্মের শিল্পীদের কাছে মিতা হক একজন রোল মডেল। সংগীত পরিবেশনা এবং সেই সঙ্গে কণ্ঠের সুর ও মাধুর্য রবীন্দ্রসংগীত গায়কীর এক অদ্ভুত মিশ্রণ ছিল। মিতা হকের মৃত্যুতে আমাদের রবীন্দ্রসংগীত অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এলো, এ রকম আর একজন শিল্পী আমরা আর ফিরে পাব কিনা জানি না। তিনি কখনো আত্মপ্রচারে বিশ্বাস করতেন না। একজন শিল্পীর গুণ, প্রতিভা যে তাকে জনগণের কাছে আপন করে জনপ্রিয় করতে পারে মিতা হক তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এমনই একজন গুণী শিল্পীর জীবনাবসান বাংলাদেশে সংগীতাঙ্গনের জন্য বিরাট ক্ষতি। বিশেষভাবে রবীন্দ্রসংগীতের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী।

 

লেখক : একুশে পদকপ্রাপ্ত শব্দসৈনিক স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র।