শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৭ এপ্রিল, ২০২১ ২২:৪০

রোজা ছিল সব নবী রসুলের আমলেই

আল্লামা মাহ্‌মূদুল হাসান

রোজা ছিল সব নবী রসুলের আমলেই

কোনো বিষয়ে জ্ঞানলাভের জন্য এর ঐতিহাসিক পটভূমি পর্যালোচনা করা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আগে ছিল না এমন কোনো বিষয় গ্রহণের ব্যাপারে মানুষের মধ্যে একটা স্বভাবজাত ইতস্ততা বা আড়ষ্টতা রয়েছে। তা দূরীকরণের উদ্দেশ্যে তাকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ঐতিহাসিক মূল্যায়ন যাচাই করে দেখতে হয়। রমজানের পরিপ্রেক্ষিতেও এ সত্যটি উপলব্ধি করা যায়। তাই মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন রমজানের ঐতিহাসিক পটভূমির প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হলো, যেমন তোমাদের পূর্বসূরিদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল।’ এ আয়াতে আগে সব শরিয়তেই রোজা ফরজ ছিল বলে ঘোষণা করা হয়েছে। একটি হাদিসেও এ কথাটি বর্ণিত হয়েছে।

আগের শরিয়তসমূহে রোজা কোন ধরনের বা কত দিনের ছিল, কোন মাস অথবা নির্দিষ্ট সময় নির্ধারিত ছিল কি না এ সম্পর্কে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা মুশকিল। হজরত আলুসির মতে হজরত আদমের প্রতিও রোজার হুকুম ছিল, কিন্তু সে রোজার বিস্তৃত বর্ণনা আমাদের জানা নেই। অন্য তাফসির-বিশারদরাও এ ধরনের মত পোষণ করেছেন। এ সম্পর্কে ভারত স্বাধীনতা আন্দোলনের মহান নেতা আরিফ বিল্লাহ শায়খুল হিন্দ আল্লামা মাহমুদুল হাসান (রহ.) উপরোক্ত আয়াতের তাফসিরে বলেন, ‘রোজার হুকুম যথারীতি হজরত আদমের (আ.) যুগ থেকে শুরু করে অদ্যাবধি বিদ্যমান রয়েছে।’ হজরত নুহ (আ.)-এর যুগে বিস্তৃত শরিয়ত অবতীর্ণ হয়। তাঁর আগেও শরিয়ত ছিল। কিন্তু পৃথিবীর তখন প্রথম যুগ, তাই সে যুগে শরিয়তের বিষয়াদির অহি ছিল অত্যন্ত সীমিত। সে যুগে বেশির ভাগই ছিল পৃথিবী গড়ার প্রয়োজনীয় নির্দেশাবলি-সংক্রান্ত অহি। আর এ প্রশ্নে হজরত নুহ (আ.)-এর যুগ ছিল একেবারেই স্বতন্ত্র। এ যুগ থেকেই শুরু হয় খোদাদ্রোহিতা ও অহির আদেশের অমান্যতা। হজরত নুহ (আ.)-কে লক্ষ্য করেই আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘যারা ইমান এনেছে, তারা ছাড়া আর কেউ ইমান আনবে না।’ তখন হজরত নুহ (আ.) অতিষ্ঠ হয়ে আল্লাহর দরবারে মুনাজাত করেছিলেন, ‘হে আমার রব! পৃথিবীর বুকে কোন কাফিরের ঘর যেন অবশিষ্ট না থাকে।’ হাশরের ময়দানে শাফায়াতের জন্য উম্মতরা সর্বপ্রথম হজরত নুহ (আ.)-এর কাছে গমন করবে। হজরত নুহ (আ.)-কে পৃথিবীর বুকে সর্বপ্রথম রসুল হিসেবে ঘোষণা করে বলা হয়েছে, ‘আপনি বিশ্ববাসীর মাঝে শরিয়ত বর্ণনাকারী প্রথম রসুল।’ আল্লামা ইবনে কাছির স্বীয় প্রসিদ্ধ তফসিরে লিখেছেন, হজরত জেহাক বলেছেন হজরত নুহর যুগ থেকে প্রতি মাসেই তিনটি রোজা পালন করার হুকুম ছিল এবং এ হুকুম বিশ্বনবীর (সা.) যুগ পর্যন্ত বহাল ছিল। এরপর যখন রমজানে রোজা পালনের হুকুম হলো তখন থেকে প্রতি মাসে তিনটি রোজা পালনের হুকুম রহিত হলো। এ বর্ণনা দ্বারা সুস্পষ্ট বোঝা যায়, হজরত নুহ (আ.)-এর যুগেও রোজার বিধান চালু ছিল। যখন আল্লাহ হজরত মুসা (আ.)-কে তুর পর্বতে ডেকে তাওরাত প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিলেন তখন আল্লাহ হজরত মুসাকে সেখানে ৩০ রাত অবস্থানের নির্দেশ দিলেন। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘এবং স্মরণ কর ওই সময়কে যখন আমি মুসার জন্য ৩০ রাত নির্ধারণ করেছিলাম এবং আরও ১০ দ্বারা তা পূর্ণ করেছিলাম। এভাবে তার প্রতিপালকের নির্ধারিত ৪০ রাত পূর্ণ হয়।’ হজরত ইবনে আব্বাসের মতে হজরত মুসা (আ.) জিলকদের ৩০ দিন ও জিলহজে প্রথম ১০ দিন রোজা পালন করে আল্লাহর দরবারে হাজির হন এবং তাওরাত লাভ করেন। এ বর্ণনা দ্বারা বোঝা যায়, হজরত মুসা (আ.)-এর যুগেও রোজার হুকুম ছিল। হজরত ইবনে আমরকে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোজা পালনের আদেশ এভাবে করেছিলেন, ‘আল্লাহর কাছে যে রোজা উত্তম সে রোজা রাখ। আর সে রোজা হলো যা দাউদ রেখেছেন। তিনি এক দিন রোজা রাখতেন আর এক দিন ইফতার করতেন।’ এ হাদিস থেকে হজরত দাউদ (আ.)-এর যুগের রোজার সন্ধান পাওয়া যায়। বাইবেলে ‘দার’ বাদশাহের যুগে বায়তুল ইলের বাসিন্দা ও বনি ইয়াহুদাদের প্রতি রোজা রাখার হুকুমের কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। এমনিভাবে ইতিহাস পর্যালোচনা করলে সব শরিয়তেই রোজার সন্ধান পাওয়া যায়। বস্তুত ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সব জাতির মধ্যেই রোজা পালনের বিধান ছিল।

আত্মশুদ্ধির তাগিদে আদিকাল থেকেই বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণ-গোত্র ও ধর্মাবলম্বীর মধ্যে রোজার প্রথা প্রচলন ছিল। চীনারা একাধারে কয়েক সপ্তাহ রোজা রাখত। পারসিক ও হিন্দুদের মধ্যেও ছিল রোজার প্রচলন।

লেখক : আমির, আল হাইআতুল উলয়া ও বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ।