শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১১ মে, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১০ মে, ২০২১ ২৩:১৪

ঈদুল ফিতরের শিক্ষা ও করণীয়

মুফতি মুহাম্মাদ এহছানুল হক মুজাদ্দেদী

ঈদুল ফিতরের শিক্ষা ও করণীয়
Google News

আলহামদুলিল্লাহ। রমজানের রোজা শেষে খুশির ঈদ। বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের এ মহামারীতে ঈদুল ফিতর সমাগত। ঈদুল ফিতর দোয়া কবুলের দিন। ঈদুল ফিতরের রাত দোয়া কবুলের রাত। হজরত আনাস বিন মালিক (রা.) বলেন, ‘প্রতি বছর মুশরিকদের জন্য দুটি দিন ছিল সেদিন তারা আনন্দ-উৎসব করত। রসুল (সা.) যখন মদিনায় আসেন তখন তিনি বলেন, তোমাদের ওই দুটি উৎসবের চেয়ে আরও উত্তম দুটি আনন্দের দিন দেওয়া হলো- ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহা।’ নাসায়ি, আবু দাউদ।

‘ঈদুল ফিতর’ শব্দ দুটি আরবি, যার অর্থ উৎসব, আনন্দ, খুশি, রোজা ভেঙে ফেলা ইত্যাদি। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনা ও ইবাদত-বন্দেগির পর বিশ্ব মুসলিম উম্মাহ শাওয়ালের চাঁদের আগমনে রোজা ভেঙে আল্লাহর বিশেষ শুকরিয়াস্বরূপ যে আনন্দ-উৎসব করে ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় তা-ই ঈদুল ফিতর।

ঈদুল ফিতর সারা বিশ্বের মুসলমানের সর্বজনীন আনন্দ-উৎসব। নানা প্রতিকূলতা, দুঃখ-বেদনা সব ভুলে ঈদের দিন মানুষ সবার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিলিত হয়। ঈদগাহ সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও ভালোবাসার বন্ধনে সবাইকে নতুন করে আবদ্ধ করে। ঈদ এমন এক নির্মল আনন্দের আয়োজন যেখানে মানুষ আত্মশুদ্ধির আনন্দে পরস্পরে প্রেমের বন্ধনে ঐক্যবদ্ধ হয় এবং আনন্দ ভাগাভাগি করে। রমজানের সিয়াম সাধনার মাধ্যমে নিজেদের অতীত জীবনের সব পাপ থেকে মুক্ত হতে পারার পবিত্র অনুভূতি ধারণ করেই পরিপূর্ণতা লাভ করে ঈদুল ফিতরের খুশি। ঈদুল ফিতরের নামাজ ওয়াজিব। অতিরিক্ত ছয় তাকবিরের সঙ্গে এ নামাজ আদায় করতে হয়। ইমামের খুতবা শোনা সুন্নত।

‘রমজানের শেষ দিন সূর্যাস্তের পর অর্থাৎ ঈদের রাত থেকে শুরু করে ঈদের নামাজ আদায় পর্যন্ত তাকবির পাঠ করা। তাকবিরের শব্দগুলো হচ্ছে- আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ। পুরুষের জন্য উচ্চৈঃস্বরে তাকবির বলা সুন্নত। মহিলারা নিঃশব্দে তাকবির বলবেন।’ মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা। ‘ঈদের দিন হেঁটে ঈদগাহে আসা-যাওয়া সুন্নত।’ ইবনু মাজাহ।

নামাজের জন্য ঈদগাহের দিকে রওনা হওয়ার আগে তিনটি, পাঁচটি বিজোড়সংখ্যক খেজুর খাওয়া সুন্নত। হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, ‘প্রিয় নবী (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন সকালে না খেয়ে ঈদগাহে রওনা করতেন না আর তিনি বিজোড়সংখ্যক খেজুর খেতেন।’ বুখারি।

ঈদের দিন সুন্নত হলো গোসল করে, সুন্দর পোশাক পরিধান করে, আতর সুগন্ধি মেখে, মিষ্টি খাবার খেয়ে, সুসজ্জিত হয়ে ঈদগাহ অভিমুখে রওনা হওয়া।

ঈদের মাঠে হেঁটে যাওয়া এবং ভিন্ন পথে ফিরে আসা সুন্নত। হজরত জাবির (রা.) বর্ণনা করেন, ‘মহানবী (সা.) ঈদের দিন এক পথে ঈদগাহে যেতেন অন্য পথে বাড়ি ফিরতেন।’ বুখারি। ঈদুল ফিতরের দিনে অন্যতম প্রধান করণীয় হচ্ছে ফিতরা প্রদান। ‘নর-নারী, ছোট-বড়, স্বাধীন-গোলাম সবার ওপর ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব।’ বুখারি, মুসলিম।

এদিন মেহমানদারি করা, দান-সদকা করা, সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলা উত্তম। হজরত যুবায়ের ইবনে নুফায়র থেকে বর্ণিত, ‘সাহাবিরা যখন ঈদের দিনে দেখা করতেন তখন একে অন্যকে বলতেন, তাকাব্বাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা।’ ফাতহুল বারি।

মুসলিম মিল্লাত নানা দল ও মতে বিশ্বাসী হওয়ায় তাদের মধ্যে পারস্পরিক মায়া-মমতা ও ভালোবাসা, সহানুভূতি ও সহমর্মিতা ক্রমে হ্রাস পাচ্ছে। বৃদ্ধি পাচ্ছে পারস্পরিক ঘৃণা, হিংসা-বিদ্বেষ ও কলহ-বিবাদ। ঈদুল ফিতর যাবতীয় হিংসা-দ্বেষ ও কলহ-বিবাদ ভুলে গিয়ে ঐক্য ও সংহতির বন্ধন সুদৃঢ় করতে শিক্ষা দেয়। সবাই দল ও মত নির্বিশেষে ঈদগাহে সমবেত হয়। একই কাতারে দাঁড়িয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঈদুল ফিতরের ওয়াজিব নামাজ আদায় করে। ঈদের নামাজের এ মহামিলন থেকে মুসলমানরা ‘একই উম্মাহ’ হিসেবে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার শিক্ষা লাভ করে থাকে। ঈদগাহে মহামিলনের মধ্য দিয়ে আল্লাহ ও রসুল (সা.)-এর প্রেমে উদ্বুদ্ধ হওয়াই ঈদুল ফিতরের অন্যতম প্রধান শিক্ষা।

পরিশেষে আমরা বলতে পারি, করোনাভাইরাসের এ মহামারীতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রত্যেক মুসলিমকে ঈদুল ফিতরের এ দিনটির মতো বছরের প্রতিটি দিন নেক আমল এবং হাসি-খুশির মাধ্যমে অতিবাহিত করার চেষ্টা করা উচিত। এ দিনের মতোই সারা বছর ইমান-আমল-তাকওয়ার জীবনযাপনের অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া উচিত। আল্লাহ আমাদের সবাইকে ঈদুল ফিতরের গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষা অনুধাবন করে সে মোতাবেক আমল করার তৌফিক দান করুন। দূর হোক হিংসা-বিদ্বেষ অনাচার-পাপাচার। ঈদ আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক বিশ্বময়।

 

লেখক : বেতার ও টিভির ইসলামবিষয়ক উপস্থাপক খতিব,

মণিপুর বাইতুল আশরাফ (মাইকওয়ালা) জামে মসজিদ মিরপুর, ঢাকা।