মঙ্গলবার, ২৯ জুন, ২০২১ ০০:০০ টা

ভুল বানানের ছড়াছড়ি

তপন কুমার ঘোষ

ভুল বানানের ছড়াছড়ি

আজকের দুনিয়ায় সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব অস্বীকার করার জো নেই। যোগাযোগের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছে এটি। তবে দুঃখজনক হলো, যার যা খুশি তা-ই লিখছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। সম্পাদনা করার কেউ নেই। সত্যের পাশাপাশি ‘ফেক নিউজ’ বা মিথ্যা তথ্য প্রচারের মাধ্যম হয়ে উঠেছে এটি। সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এটা যে কতটা বিপজ্জনক তার প্রমাণ সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আমরা পেয়েছি। আজকের আলোচনা সোশ্যাল মিডিয়ার অন্য একটি দিক নিয়ে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুল বানানের ছড়াছড়ি। যার যেমন খুশি তেমন বানান লিখছেন। বানান-সচেতন মানুষের চোখে এটা বড্ড লাগে। সাইনবোর্ড ও ব্যানারেও ভুল বানান প্রায়ই চোখে পড়ে। সাইনবোর্ডে বিজয় ‘সরণি’র স্থলে লেখা হয়েছে বিজয় ‘স্মরণী’। ব্যানারে ‘শ্রদ্ধাঞ্জলি’র জায়গায় লেখা হয়েছে ‘শ্রদ্ধাঞ্জলী’। জাতীয় পরিচয়পত্রে নামের বানান বিভ্রাটের কারণে ভোগান্তি পোহাচ্ছেন অনেকে। প্রতিটি মানুষের কাছে তার নিজের নামটি খুবই প্রিয়। নিজ নামের বানানে গরমিল থাকলে তা অস্বস্তির কারণ হয়।

লেখালেখি করতে গিয়ে কোনো কোনো শব্দের বানান নিয়ে খটকা লাগে। সমস্যা ই-কার ও ঈ-কার নিয়ে। ন ও ণ নিয়েও সমস্যা আছে। একসময় প্রচলিত অনেক বানান বর্তমানে অপ্রচলিত। আমাদের ছেলেবেলায় আমরা যেসব বানান শিখেছিলাম তার অনেক কিছু বর্তমানে অচল। তবে বানান নিয়ে মতপার্থক্য আছে।

স্কুলজীবনে পরীক্ষার উত্তরপত্রে ভুল বানানের জন্য নম্বর কাটা হতো। ক্লাসে বানান ভুল করলে শুদ্ধ বানান দশবার করে লিখতে হতো। স্যার বকুনি দিতেন, ‘এত দিনেও তোদের ণত্ব-ষত্ব জ্ঞান হলো না!’ উদাহরণ দিয়ে বোঝাতেন, বানান পার্থক্যের কারণে কীভাবে শব্দের অর্থ ভিন্ন হয়। ‘ভুল’ শব্দটি লিখতে গিয়ে অনেকেই ভূল (ঊ-কার) লিখত। ‘ভুল লিখিতে কখনও করিও না ভুল’- এ লাইনটি দশবার লেখানো হতো। তখনকার দিনে শ্রেণিকক্ষে বেতের ব্যবহার ছিল। ইংরেজির স্যার ছিলেন বদমেজাজি। বারবার একই ভুল করলে বেত ব্যবহার করতে কখনো ভুল করতেন না।

ইদানীং ‘ড়’-এর স্থলে ভুলক্রমে ‘র’-এর ব্যবহার খুব চোখে পড়ে। ঘর থেকে বেরিয়ে ‘পড়লাম’কে লেখা হয়েছে ‘পরলাম’। বই ‘পড়া’র জায়গায় লেখা হয়েছে বই ‘পরা’। মনে ‘পড়ে’ লিখতে গিয়ে লেখা হয়েছে মনে ‘পরে’। প্রতিযোগী ঈ-কার। কিন্তু ‘প্রতিযোগিতা’ লিখতে গিয়ে অনেক সময় ভুল করে লেখা হয় ‘প্রতিযোগীতা’। ‘শোকগাথা’ লিখতে গিয়ে অনেকে ভুলক্রমে গ-এর ওপর চন্দ্রবিন্দু যোগ করে লেখেন ‘শোকগাঁথা’। আশীর্বাদ বানানে সচরাচর ভুল হয়। ভুলক্রমে লেখা হয় আর্শীবাদ। ‘লক্ষণীয়’ লিখতে গিয়ে অনেক সময় য-ফলা যোগ করে লেখা হয় ‘লক্ষ্যণীয়’। আমাদের স্কুলের হেড স্যার বিমল চরণ চক্রবর্তী মহাশয় সাবধান করে দিতেন, ‘বিদ্বান’ লিখতে গিয়ে কখনো আবার ভুল করে ‘বিদ্যান’ লিখে ফেল না। সেই কবেকার কথা। আজও মনে গেঁথে আছে। সেসব নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় অজপাড়াগাঁর সিঙ্গাশোলপুর কে পি ইনস্টিটিউশন তৎকালীন নড়াইল মহকুমার একটি নামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি পায়।

কিংবদন্তি, কৌতূহল, গ্রহণ, গণনা, ন্যূনতম, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিবন্ধী, প্রণাম, প্রার্থনা, বুদ্ধিজীবী, মুখ্য, মুহূর্ত, মুমূর্ষু, শূন্য, সপক্ষে, সাক্ষী প্রভৃতি শব্দ লিখতে গিয়ে প্রায়ই আমরা বানান ভুল করি। সব বানান ভুল যে অজ্ঞতাপ্রসূত তা নয়, অনেক ক্ষেত্রে অবহেলাজনিত। একটু সতর্ক হলে যা এড়ানো যায়। অনেকে গা করেন না। ভুল কার না হয়! কোনো মানুষই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। সামান্য বানান ভুলে কিচ্ছু যায় আসে না। এসব যুক্তি তুলে ধরেন। এটা যেমন সত্যি, তেমনিই সত্যি ভুল বানানের আধিক্য লেখার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। লেখক সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা দেয়। ছাপার অক্ষরে কিছু লেখা থাকলে অনেকেই এটাকে সঠিক বলে ধরে নেয়। ভুল বানান দেখে অন্যরা ভুল শিখছে। সমস্যাটা এখানেই।

আজও আমরা উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। এ ব্যাপারে সীমাবদ্ধতাগুলো সবারই জানা। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও বাংলা ভাষা ব্যবহারে আমাদের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। অনেক সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড ইংরেজিতে লেখা।

কেউ কেউ আবার ফেসবুক মেসেঞ্জারে মন্তব্য করতে গিয়ে ইংরেজি হরফে বাংলা লেখেন। এটা পাঠোদ্ধার করা কঠিন। এত কষ্ট করে কে আর এসব পড়ে! এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাংলা বানান নিয়ে যথেচ্ছাচার। বানানের এমন হাল দেখে অনেকেই চিন্তিত। ফেসবুকের ‘কমেন্ট’ বক্সে দেদার অশ্লীল, কুরুচিকর মন্তব্য। একেবারে বিতিকিচ্ছি অবস্থা। এভাবে পদে পদে বাংলা ভাষার মর্যাদা নষ্ট করছি আমরা। বাংলা ভাষার প্রতি সমাজের একাংশের এ অশ্রদ্ধা নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে সচেতন মহলে।

ভাষা পরিবর্তনশীল। সময়ের ব্যবধানে শব্দের বানানে পরিবর্তন ঘটে। বাংলা বানানের সমতাবিধান ও প্রমিতকরণের ক্ষেত্রে দুই বাংলায় অনেক কাজ হয়েছে। বাংলাদেশে ভাষা ও সাহিত্যের জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলা একাডেমি বাংলা বানানবিধি প্রণয়ন করেছে। আমাদের দেশে ‘বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’ (পরিমার্জিত সংস্করণ ২০১২) ব্যাপকভাবে মেনে চলা হয়। আমি বানানবিশারদ নই। শুদ্ধ বানান চর্চায় আগ্রহী মাত্র। বানান নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে আমার এ ক্ষুদ্র প্রয়াস।

 

লেখক : পরিচালক, পরিচালনা পর্ষদ, বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন।

এই রকম আরও টপিক