বৃহস্পতিবার, ১ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ টা

আমার বাবা জহুর আহম্মদ চৌধুরী

হেলাল উদ্দিন চৌধুরী (তুফান)

আমার বাবা জহুর আহম্মদ চৌধুরী

১ জুলাই আমার পিতা মরহুম জহুর আহম্মদ চৌধুরীর ৪৬ তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭৪ সালের ১ জুলাই ঢাকা পিজি হাসপাতালে ৬৯ বছরে পরলোকগমন করেন।

আমার বয়স যখন ১৪ বছর তখন আমার পিতার মৃত্যু হয়। এ কিশোর বয়সে আমার শিশু ও কৈশোর থেকে কিশোর বয়সে পিতার কর্মকান্ডের অনেক স্মৃতি ও ইতিহাস সম্পর্কে আমার ক্ষুদ্র পরিসীমায় লেখার চেষ্টা করছি।

মুুসলিম লীগ, আওয়ামী মুসলিম লীগ এবং পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। সারা জীবন গণমানুষের জন্য কাজ করে গেছেন। আমার স্মৃতিতে আমি আমার পিতাকে একজন পুত্র হিসেবে খুব একটা কাছে পাইনি। জীবনে উনাকে কখনো পর পর সাত দিন দেখার সুযোগ হয়নি। ষাটের দশকে আমার জন্মের পর উনি ছয় দফা, ১১ দফা এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে বার বার কারাবরণ করেছেন। পুত্র হিসেবে, আদর যত্ন পাওয়ার সুযোগ কখনো হয়নি।

সারা জীবন ন্যায় নীতি ও সততার সঙ্গে নিজ পেশা রাজনীতিকে ধারণ করেছেন তিনি। রাজনীতির ব্যাখ্যায় রাজনীতি বলতে যা বুঝায় তিনি সেই আদর্শই ধারণ করতেন। আমার স্মৃতিতে কিছু ঘটনা আমার স্পষ্ট মনে আছে।

৭ মার্চ ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক বক্তব্যে ঘোষণা দিলেন- ২৮ তারিখে কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করার জন্য। আমার বাবা ঢাকার জনসভা থেকে ফিরে আসার পর আমার মরহুম মাতা বেগম ডা. নুরুন নাহার জহুর, আমার বাবাকে জিজ্ঞেস করলেন- বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন, কিন্তু ২৮ তারিখে যে সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তা কীভাবে বাস্তবায়ন হবে? সারা দেশতো এখন অচল! আমার মা তৎকালীন সরকারি চাকরিতে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবার পরিকল্পনা দফতর চট্টগ্রামের মেডিকেল অফিসারের দায়িত্বে ছিলেন। আমার মায়ের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার জন্য তিনি বঙ্গবন্ধুকে ফোন দিলেন। তিনি চট্টগ্রামের বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালককে ডেকে ব্যবস্থা নিতে বলেন। এবং প্রত্যেক সরকারি অফিসে বেতন পাঠানোর জন্য শহর আওয়ামী লীগের সভাপতির সিল ও স্বাক্ষরসংবলিত একটি কাগজ বাংলাদেশ ব্যাংক চট্টগ্রামে পাঠিয়ে বেতন প্রদানের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এবং বাংলাদেশ ব্যাংক চট্টগ্রাম আমার পিতা জহুর আহম্মদ চৌধুরীর আদেশ অনুযায়ী বেতনের টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। এবং ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের পর সারা বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কর্তৃক নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে প্রশাসন পরিচালিত হয়।

৭০ সালের নির্বাচনের পর সারা দেশে তুমুল আন্দোলনে উত্তপ্ত চট্টগ্রামসহ সারা বাংলাদেশ। শহর আওয়ামী লীগের প্রতিদিনের কর্মসূচি পালনের জন্য তৎকালীন কিছু অবাঙালি ব্যবসায়ী আমার বাবার কাছে অর্থ সাহায্য দিতে আমাদের দামপাড়া বাসায় আসে। আমার বাবা ওইসব ব্যবসায়ীকে রাস্তায় বাড়ির বাইরে অপেক্ষা করতে বলেন। বাসায় দলীয় কর্মীদের সঙ্গে কাজ শেষ করে বাইরে গিয়ে ওই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দেখা করেন। সবাই চট্টগ্রাম শহরের জুবলি রোডের অবাঙালি বোররা কমিউনিটির ব্যবসায়ী ও ব্যবসায়ী নেতা। এখনো ওইসব ব্যবসায়ীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জুবলি রোডে চালু আছে। উনারা বাবার হাতে আন্দোলনের জন্য অর্থ সহযোগিতা করেন এবং আন্দোলনে উনাদের সমর্থন ব্যক্ত করেন। পরে ওইসব ব্যবসায়ী চলে যাওয়ার পর আওয়ামী লীগের এক কর্মী আমার বাবাকে জিজ্ঞাসা করেন, উনাদের বাসার ভিতরে ডাকা হয়নি কেন! চা খাওয়ানো হয়নি কেন!? আমার বাবা জবাবে বলেন, ‘যার কাজ যেটা, তাকে মানায় সে কাজে’ অর্থাৎ আমি রাজনীতিবিদ উনারা ব্যবসায়ী আমার সঙ্গে উনাদের সম্পর্ক সীমিত আমি ব্যবসায়ী না। ব্যবসায়ীরা বিচার বিবেচনা করে আমাদের আন্দোলন সফল করার জন্য অর্থ সাহায্য দিচ্ছে, আমরা সাফল্য অর্জন করলে দেশ পরিচালনায় ব্যবসায়ীদের সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী সাহায্য সহযোগিতা করব, এর বেশি নয়। যত বড় ব্যবসায়ী হোক সে যেই হোক যত অর্থ সাহায্য করুক তাকে তার অবস্থান থেকে করতে হবে। কোনো ব্যক্তিস্বার্থ অর্জন বা দলের পদে শেয়ার দেওয়ার জন্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সম্পর্ক নয়। আমি নেতা হিসেবে চট্টগ্রামে সব ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিকে তাদের অসুবিধা বা কষ্টের সময় সাহায্য করে যাচ্ছি। এবং ভবিষ্যতে এদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য করে যাব। তবে ব্যবসায়ী ব্যবসা করবে রাজনীতিবিদ রাজনীতি করবে। রাজনীতিতে বা দলে অর্থের বিনিময়ে কোনো পদ বা ছাড় নয়, এ ধরনের মনোভাব ও আদর্শ নিয়ে আমার বাবা এদেশে রাজনীতি করেছেন। আমি বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ বা আদর্শ নিয়ে সমালোচনা করব না, কিন্তু আশা করব বাংলাদেশে আগামীতে রাজনীতিবিদদের রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হবে। ৬০-এর দশকে ছয় দফা, ১১ দফা এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় চট্টগ্রাম শহরে আওয়ামী লীগের সব কর্মসূচি, জনসভা এবং মিটিং মিছিলের সাফল্যের জন্য নেপথ্যে চট্টগ্রামের কয়েকজন ব্যবসায়ী ও কিছু অবাঙালি ব্যবসায়ী ও শিল্পপতির আর্থিক সহযোগিতা এ দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

বাঙালি ব্যবসায়ী ও শিল্পপতির মধ্যে অন্যতম মরহুম ইউসুফ মিয়া (বুলবুল ইউসুফ) মরাদের বাবা ইউসুফ টেক্সটাইলের মালিক এবং আগ্রাবাদের মরহুম সোলতান আহম্মদ (সোলতান মিয়া/কালা সোলতান) এ দুই ব্যবসায়ী বঙ্গবন্ধু এবং আমার বাবার খুবই কাছের লোক ছিলেন। দেশ বিভাগের আগে থেকেই মরহুম হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অনুুসারী এ ব্যবসায়ীগণ চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের সঙ্গে সারা জীবন ছায়ার মতো সহযোগিতা করে গেছেন কোনো পদ বা পদবি ধারণ না করে।

লেখক : মরহুম জহুর আহম্মদ চৌধুরীর পুত্র।