রবিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ টা

বঙ্গবন্ধু হত্যা : প্রাসঙ্গিক কিছু ঘটনা

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

বঙ্গবন্ধু হত্যা : প্রাসঙ্গিক কিছু ঘটনা

ক্যালেন্ডারের পাতায় আবার ফিরে এলো বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার ৩২ নম্বর ধানমন্ডি রোডের সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দিনটি। এ দিন জল্লাদ বাহিনী সপরিবারে হত্যা করেছিল বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। বাঙালি এখনো তা ভোলেনি, ভুলতে পারবে না, ভোলা যায় না। দেখতে দেখতে ৪৬ বছর কেটে গেল। আর এ হত্যার ষড়যন্ত্রের নায়করাই ১৫ আগস্টের পর নতুন করে একাত্তর সালের মতো হাজার হাজার বাঙালিকে খুন করেছিল। পদ্মা-মেঘনা-যমুনার জলে সেদিনও লাশ ভেসেছে। বহু মানুষ আবার এপার বাংলায় পালিয়ে এসেছিল। সেদিন বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর বোন শেখ রেহানা।

১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবস। সেদিন সকালেই লালকেল্লা থেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছিলেন। সে ভাষণে তিনি পরোক্ষভাবে ইঙ্গিত করেছিলেন উপমহাদেশে কিছু একটা ঘটতে চলেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী এবং মুজিব হত্যা ষড়যন্ত্রের অন্যতম নায়ক মার্কিন বিদেশ সচিব হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশ সফরে গিয়েছিলেন। ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে নৈশভোজে বঙ্গবন্ধু হত্যাকারী জিয়াউর রহমান ও খন্দকার মোশতাক আহমদ দুই পাশে বসেছিলেন। তখনকার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার সময় জিয়া বলে বসলেন, বাংলাদেশে সামরিক শাসন দরকার। ঘাড় নেড়ে খন্দকার মোশতাক আহমদ তার এ মন্তব্যে সায় দেন। ঘটনাটি আমার শোনা তাজউদ্দীন সাহেবের কাছে। তাজউদ্দীন সাহেব আমায় বলেছিলেন, ‘আমার সেই নৈশভোজে থাকার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু আমায় আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। আমন্ত্রণ জানানো হয়নি মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত কোনো মন্ত্রীকেও। কিন্তু সেদিনের সেই নৈশভোজে উপস্থিত থাকা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা রাতেই আমাকে এবং আরও কয়েকজন মন্ত্রীকেও ফোন করে জানিয়ে দেন জিয়াউর রহমানের সে প্রস্তাব এবং কিসিঞ্জারের সমর্থনের কথা।’

মুজিব বলেছিলেন, ‘আমাগো দাবাইয়া রাখতে পারবা না।’ জিয়াও বোধহয় সমঝাতে লাগলেন, জনগণকে খুব বেশি দিন দাবিয়ে রাখা যায় না। তবু জিয়া জিয়াই, মুজিব নন।

তাহলে কে এই জিয়া? কী তার অতীত? কেমন করেই বা পৌঁছে গেলেন ক্ষমতার মসনদে। আসুন একবার পেছনের ইতিহাসটার দিকে তাকাই।

মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের বয়স যখন আঠারো তখন তিনি যোগ দেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে। ট্রেনিং নেন বিশেষ গোয়েন্দা বিভাগে এবং ১৯৫৯ থেকে ’৬৪ সাল পর্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজ করেন ওই বিভাগে। ’৬৫-এর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি কোম্পানিতে জিয়া ছিলেন খেমকরণ রণাঙ্গনে। মুক্তিযুদ্ধের কয়েক মাস আগে তাকে বদলি করা হয় চট্টগ্রামে, নবগঠিত অষ্টম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টে। তখন তিনি মেজর। অল্প দিনের মধ্যেই দেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়, ’৭১-এ লেফটেন্যান্ট কর্নেল হলেন জিয়া। আর মুক্তি অর্জনের পর যেন তার উল্কার মতো আবির্ভাব। ’৭৩-এর গোড়ায় ব্রিগেডিয়ার, শেষ দিকে অক্টোবরে একেবারে মেজর জেনারেল।

ওই সময় ভারতীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে এক বৈঠকে সৈয়দ নজরুল ইসলাম একটি মজার মন্তব্য করেছিলেন। আমিও সেখানে ছিলাম। নজরুল বলেন, ‘স্বাধীনতার ফসল জনসাধারণ কতটা পেল জানি না তবে ছোট মাপের কিছু লোক আশাতীত উচ্চপদে আসীন হতে পেরেছে। এমন অনেক লোককে ডিসি করা হয়েছে যাদের এসডিও হওয়ারও যোগ্যতা নেই। আবার যারা ডিসি পদের অযোগ্য তারা সব হয়েছে সচিব। তেমনি সামরিক বাহিনীতে যে ছিল সাধারণ সৈনিক সে-ই রাতারাতি দেখি মেজর বনেছে। মেজর হয়ে গেছে মেজর জেনারেল। এ অবস্থায় প্রশাসন টলমল করবে, আশ্চর্য কী? পাকিস্তানি আমলে যে আমলারা সাধারণ মানুষের ওপর চালিয়েছিল শোষণ আর নিপীড়ন, তারাই তো রয়ে গেছে। স্বভাব কি আর সহজে বদলায়। সবকিছু সামলাতে অনেক দিন লাগবে।’ সৈয়দ সাহেবের কথাগুলো যে কত সঠিক, পরবর্তী ঘটনাবলিই তার সাক্ষ্য দেবে।

এ তো গেল জিয়ার পরিচয়। ’৭১ সালে জিয়া ত্রিপুরায় নয় মাস কাটিয়েছিলেন। ভারতীয় জেনারেলদের কাছে শোনা, তিনি সীমান্তের কোনো এলাকাতেই যাননি, আগরতলায় বসে তার ঘনিষ্ঠ সৈনিকদের মাঝেমধ্যে ঢাকায় পাঠাতেন, তার স্ত্রী খালেদা জিয়াকে ত্রিপুরায় আনার জন্য। খালেদা তখন ঢাকায় ক্যান্টনমেন্টে একজন পাকিস্তানি জেনারেলের সঙ্গে থাকতেন। যুদ্ধ শেষে খালেদা জিয়া বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে গিয়ে ধরলেন, কারণ জিয়া তখন তার সঙ্গে থাকতে অস্বীকার করেছিলেন। আমি তখন প্রতিদিনই সন্ধ্যার দিকে খবরের সন্ধানে গণভবনে যেতাম। বঙ্গবন্ধুর খুবই ঘনিষ্ঠ এবং মুজিব-বাহিনীর নেতা তোফায়েল আহমেদ বললেন, পালিয়ে যাবেন না, বড় খবর পাবেন, বসে থাকুন। সন্ধ্যার দিকে দেখলাম শেখ হাসিনার সঙ্গে গণভবনে এলেন খালেদা জিয়া। শেখ হাসিনা তাকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ঘরে ঢুকলেন। বঙ্গবন্ধু তখন তোফায়েল সাহেবকে বললেন জিয়া মিয়াকে ডাকো। ১৫-২০ মিনিটের মধ্যেই জিপ চালিয়ে জিয়া গণভবনে এসে তোফায়েল সাহেবের ঘরে ঢুকলেন। তোফায়েল তাকে বঙ্গবন্ধুর ঘরে নিয়ে গেলেন। বঙ্গবন্ধু জিয়াকে বললেন, ‘জিয়া, তুমি তোমার স্ত্রীকে বাড়িতে নিয়ে যাও।’ জিয়া বললেন, ‘স্যার, তা কী করে সম্ভব? আমার স্ত্রী তো এক পাকিস্তানি জেনারেলের সঙ্গে ঢাকায় ছিল।’ মুজিব বললেন, ‘আমি ওসব বুঝি না। তোমার স্ত্রীকে তুমি নিয়ে যাবে, এ আমার হুকুম।’ এরপর বাধ্য হয়ে জিয়া তার স্ত্রী খালেদাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে দেশি-বিদেশি মুরুব্বিরা খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী করে। প্রধানমন্ত্রী হয়েই তিনি শেখ হাসিনাকে হত্যার ষড়যন্ত্র শুরু করেন। যে হাসিনা নিজে উদ্যোগী হয়ে খালেদাকে তার স্বামীর কাছে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন সেই হাসিনাকেই হত্যার উদ্দেশ্যে খালেদা কুড়িবার ষড়যন্ত্র করেছিলেন এবং হামলা চালিয়েছিলেন। একবার গ্রেনেড হামলায় শেখ হাসিনার কানে গুরুতর চোটও লাগে। খালেদা ছিলেন এমনই অকৃতজ্ঞ ও বেইমান।

মুজিব হত্যার পর দিল্লির ২ নম্বর সফদরজং রোডের কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল তা আগেও বহুবার বলেছি, আরও একবার বলছি। ঘটনার দিন রাতে খবর পেয়েই ইন্দিরা গান্ধী পাগলের মতো করতে থাকেন। চিৎকার করতে থাকেন, ‘মুজিব ভাই নেই, মুজিব ভাই নেই’। বলেন, ‘ক্যাবিনেটে খবর দাও। চিফ অব আর্মি স্টাফকে খবর দাও। বাঙালি মন্ত্রীদের খবর দাও। মুজিব ভাইয়ের দুই মেয়ে জার্মানিতে আছে। ওদের আনার ব্যবস্থা কর।’

ইন্দিরা গান্ধী প্রসঙ্গে একটি কথা বলি। জ্ঞানী জৈল সিং যিনি পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, পরে ইন্দিরা মন্ত্রিসভার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হন এবং পরবর্তীকালে ইন্দিরা গান্ধীরই উদ্যোগ ও ইচ্ছায় দেশের রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন, তাঁর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতার দরুন আমায় তিনি দুটি কথা বলেছিলেন এবং সে কথা দুটি কখনো যেন প্রকাশ্যে না আসে সেই প্রতিশ্রুতি চেয়েছিলেন। আমি তাঁকে কথা দিয়েছিলাম এবং কথা রেখেও ছিলাম। কখনো, কোনো লেখায় সেসব কথার উল্লেখ করিনি। কিন্তু এখন তারা কেউ নেই, আমারও অনেক বয়স হয়েছে, তাই বাংলাদেশের পাঠকদের সে কথাগুলো বলে দিতে চাই। জ্ঞানী জৈল সিং আমায় বলেছিলেন, ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে বলেন, যদি আমার মৃত্যু হয় তবে আমার দুটো ইচ্ছা পূরণ করার ব্যবস্থা করবেন। এক. নেলসন ম্যান্ডেলা এবং শেখ মুজিব ভাইকে ভারতরত্ন দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন। দ্বিতীয়ত, সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় আর যেন কখনো কংগ্রেসে না ঢুকতে পারেন। নেলসন ম্যান্ডেলা ভারতরত্ন হয়েছিলেন, কিন্তু মুজিবুর রহমানকে এ খেতাব দেওয়া হয়নি। আর সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের ব্যাপারেও ইন্দিরার ইচ্ছা পূর্ণতা পায়নি। পি ভি নরসীমা রাও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তাঁকে ধরে সিদ্ধার্থশঙ্কর কংগ্রেসে ঢুকেছিলেন।

সম্প্রতি মুজিবের বড় ছেলে শেখ কামাল এবং মুজিবের স্ত্রী বেগম মুজিবের জন্মদিন পালিত হলো বাংলাদেশের পাশাপাশি কলকাতার বাংলাদেশ হাইকমিশনেও। ৫ আগস্ট ছিল শেখ কামালের জন্মদিন আর ৮ আগস্ট বেগম মুজিবের। বাংলাদেশ হাইকমিশনে ৫ আগস্টের অনুষ্ঠানে আমি উপস্থিত ছিলাম। সেখানে একটি লেখা পাঠিয়েছিলেন উপমহাদেশের বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক, যাঁর একটি গানই বাংলাদেশের স্বাধীনতায় ইন্ধন জুগিয়েছিল (আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি), সেই গাফ্ফার চৌধুরী। তাঁর সেই লেখা দিয়েই আজকের লেখা শেষ করব। তিনি লিখেছেন, ‘যদি পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট দুই বোন হাসিনা ও রেহানা ঢাকায় ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাসায় থাকতেন তাহলে তাঁদেরও যে হত্যা করা হতো তাতে সন্দেহ নেই। বিদেশে থাকায় বেঁচে যাওয়ায় তাঁরা যে হত্যা চক্রান্ত থেকে মুক্ত ছিলেন তা নয়। ঘাতকের বুলেট তাঁদেরও পিছু পিছু ঘুরেছে। এ ক্ষেত্রে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী মাতৃসমা হৃদয় নিয়ে দুই বোনকে দিল্লিতে আশ্রয় দিয়েছেন। নিরাপত্তা দিয়েছেন। বাবার কাছে যে রাজনীতির পাঠ হাসিনা নিতে পারেননি, সে পাঠ তিনি নিয়েছেন জওহরলালকন্যা ইন্দিরার কাছ থেকে। কিন্তু ব্যক্তিত্ব ও সাহস পেয়েছেন বাবা বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকেই।’

লেখক : প্রবীণ সাংবাদিক [ভারত]।