শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৬ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৫ আগস্ট, ২০২১ ২২:৩৩

হায়! রাতের নামাজে কি রবের নৈকট্য লাভ করতে পেরেছি

মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী

হায়! রাতের নামাজে কি রবের নৈকট্য লাভ করতে পেরেছি
Google News

জীবনখাতার পাপগুলোকে তওবার আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে যখন তার কুৎসিত চেহারা দেখি তখন আঁতকে উঠি বারবার, মনে হয় যেন কৃত পাপ কুরে কুরে খাচ্ছে আমাকে। রাতের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে অজানা ভয়। কোনো কাজে শান্তি পাচ্ছি না। কবরের আজাব, আল্লাহর কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর ভয় আমার মনের শান্তি কেড়ে নিয়েছে। ইউটিউব ঘেঁটেছি, ফেসবুকের বিভিন্ন পেজ ঘুরেছি, তবু মনকে কোনোভাবেই শান্ত করতে পারছি না। দংশন করেই চলেছে। পাঠক! যদি এমন কিছু হয়ে থাকে তাহলে উঠে পড়ুন। কিয়ামুল লাইলকে আঁকড়ে ধরুন, এটাই আপনার চিকিৎসা। সুযোগ থাকলে প্রত্যেকেরই এ সালাত আদায় করা উচিত। কিয়ামুল লাইল পাপের আজাব থেকে নিষ্কৃতি দেয়, আল্লাহর নুর দ্বারা অন্তর পরিপূর্ণ করে দেয়। তওবার পর সে পাপগুলো পুনরায় সংঘটিত হওয়া ঠেকাতে কিয়ামুল লাইল ঢালের মতো কাজ করে। রসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা অবশ্যই কিয়ামুল লাইল আদায় করবে। কারণ তা তোমাদের পূর্ববর্তী নেককার লোকদের অভ্যাস ছিল। তোমাদের রবের নৈকট্য লাভের মাধ্যম এটি পাপ থেকে আত্মরক্ষার পথ এবং দেহের রোগব্যাধি দূরকারী।’ তিরমিজি। আল্লাহ তাঁর নবীকে পরম মমতায় নির্দেশ দিয়েছেন, ‘রাতের বেলা সালাতে দাঁড়াও, তবে কিছু সময় ছাড়া। অর্ধেক রাত কিংবা তার চেয়ে কিছু কম কর। অথবা তার ওপর কিছু বাড়িয়ে নাও। আর ধীরেসুস্থে স্পষ্টভাবে কোরআন তিলাওয়াত কর।’ সুরা মুজ্জাম্মিল, আয়াত ২-৪। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘হে নবী! তোমার রব জানেন তুমি কোনো সময় রাতের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ, কোনো সময় অর্ধাংশ এবং কোনো সময় এক-তৃতীয়াংশ ইবাদতে দাঁড়িয়ে কাটিয়ে দাও। তোমার সঙ্গী একদল লোকও এ কাজ করে।’ সুরা মুজ্জাম্মিল, আয়াত ২০। নবুয়তের সূচনা থেকে জীবনের অন্তিম মুহুর্ত পর্যন্ত নবী (সা.) কিয়ামুল লাইল আদায় করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের খালা প্রিয় রসুলের সহধর্মিণী মাইমুনা (রা.)। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর একদিন কৌত‚হল জাগল আল্লাহর রসুলের পুণ্যময় রাত কাটে কীভাবে? কেমন হয় তাঁর গভীর রাতের সালাত? রাত কতটুকু গভীর হলে আল্লাহর সামনে দাঁড়ান তিনি? সময় করে এক রাতে তাঁর কাছে থাকতে হবে। কোনো এক রাতে তা-ই হলো। ইবনে আব্বাস দেখলেন রসুলের ঊর্ধ্বজাগতিক প্রাণরসে জীবন্ত সালাত। যাতে বিনয় ও নম্রতার পূর্ণ বিকাশ ঘটেছে। এ যেন উবুদিয়্যাত ও দাসত্বের চূড়ান্ত প্রকাশ। স্থিরচিত্ত। বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে তিনি এখন আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো। ইবনে আব্বাস এসেছেন রসুলের ইবাদত দেখার জন্য। অংশ নেওয়ার জন্য তাঁর সালাতে। তাই দেরি না করে নবীজির পেছনে এসে দাঁড়ালেন। হাত বেঁধে স্থির হওয়ার আগেই নবীজি রাতের নামাজে তাঁকে টেনে পাশে দাঁড় করালেন। মুহুর্তকাল তাঁর পাশে থাকলেন; কিন্তু কী যেন মনে করে আবার পেছনে সরে গেলেন। ফিরে গেলেন আগের জায়গায়। রাতের সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে ভোর। রসুল রাতের সালাত শেষ করলেন। তাঁর মনে কৌত‚হল জাগল আমি ওকে পাশে দাঁড় করালাম, আর ও পেছনে সরে গেল! জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী ব্যাপার আবদুল্লাহ! আমি তোমাকে পাশে দাঁড় করালাম আর তুমি যে আগের জায়গায় ফিরে গেলে?’ আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বললেন, ‘আপনি আল্লাহর রসুল। শুধু রসুলই নন, শ্রেষ্ঠ রসুল। আর একজন রসুলের পাশাপাশি দাঁড়ানো আমার মতো ছোট মানুষের কি শোভা পায়?’ আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-কে নবীজি বুকে টেনে নিলেন পরম মমতায়। মনের মাধুরী মিশিয়ে হৃদয়ের সবটুকু আবেগ ঢেলে দোয়া করলেন, ‘হে আল্লাহ! তুমি ওর জ্ঞান বাড়িয়ে দাও, গভীরতা দান কর প্রজ্ঞায়।’ সৃষ্টির সেরা মানবের দোয়া পৌঁছে গেল আরশে আজিমে।

পাঠক! এমন ছিল রসুলের রাতের নামাজে প্রেমময়তা। রসুল (সা.) বলেন, ‘জান্নাতে একটি প্রাসাদ রয়েছে যার ভিতর থেকে বাহির এবং বাহির থেকে ভিতর দেখা যাবে।’ তখন জনৈক বেদুইন বললেন, হে আল্লাহর রসুল! এটি কার হবে? তিনি বললেন, ‘এটি হবে তার যে ভালো কথা বলে, অন্যদের আহার করায়, সিয়াম অব্যাহত রাখে এবং রাতে যখন সব মানুষ ঘুমিয়ে থাকে তখন উঠে সালাত আদায় করে।’ তিরমিজি। রসুল (সা.) বলেন, ‘তিন শ্রেণির ব্যক্তিকে আল্লাহ ভালোবাসেন, তাদের দেখে হাসেন এবং খুশি হন। ... (তিন শ্রেণির এক শ্রেণি হলো) সেই ব্যক্তি যার সুন্দরী স্ত্রী এবং নরম বিছানা আছে, কিন্তু সে রাতে সালাতে দাঁড়ায়। আর তাই আল্লাহ বলেন, “সে তার প্রবৃত্তির চাহিদাকে ত্যাগ করেছে এবং আমাকে স্মরণ করেছে। আর সে যদি চাইত ঘুমিয়ে থাকতে পারত”।’ মুসতাদরাক হাকিম। আতা খোরাসানি (রহ.) বলেন, ‘কিয়ামুল লাইল হলো শরীরের জন্য জীবন, কলবের জন্য নুর, দৃষ্টির জন্য আলো, আর অঙ্গপ্রত্যঙ্গের জন্য শক্তি। ব্যক্তি যখন রাতের সালাত আদায় করে সে অন্তর থেকে আনন্দ অনুভব করতে পারে।’ ইবনে আবিদ দুনইয়া। বিশিষ্ট তাবিয়ি সাইদ ইবনুল মুসাইয়ির (রহ.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কিয়ামুল লাইল আদায় করে আল্লাহ তার চেহারায় নুর উদ্ভাসিত করে দেন। তাকে মুসলিমরা ভালোবাসে, যদিও বা তাকে প্রথম দেখে। বলে, “সত্যিই লোকটাকে আমার খুব ভালো লাগে”।’ কিতাবুত তাহাজ্জুদ। রসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রাতের সালাতে ১০টি আয়াত পড়বে তার (নাম) গাফেলদের তালিকায় উঠবে না। যে ব্যক্তি দাঁড়িয়ে ১০০ আয়াত পড়বে তার (নাম) অনুগতদের তালিকায় উঠবে। আর যে ব্যক্তি দাঁড়িয়ে ১ হাজার আয়াত পড়বে তার নাম উঠবে মুকানতিরিন (কিনতার সংগ্রহকারীদের) তালিকায়।’ আবু দাউদ। রসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি রাতের সালাত আদায় করার নিয়ত করে বিছানায় যাবে, এরপর সকাল পর্যন্ত ঘুম তাকে কাবু করে ফেললেও নিয়ত অনুযায়ী সে পূর্ণ পুরস্কার পাবে। তখন তার ঘুম হবে মহামহিম রবের পক্ষ থেকে তার জন্য সদাকাস্বরূপ।’ নাসায়ি। পৃথিবীকে যখন অন্ধকারের চাদর পরিয়ে দেওয়া হয়, পৃথিবী যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখনো মহিমাময় আল্লাহ নিদ্রা যান না। তিনি প্রত্যেকের গভীর রাতের দুঃখ-বেদনা, কষ্ট-যন্ত্রণার কথা শোনেন। তাই আসুন আমরা রাতের নামাজে রবের নৈকট্য লাভ করি।

লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক।